লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জীবনী ও তাঁর আশ্চর্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাহিনী

 লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জীবনী 

leonardo va vincci biography


‘এই আবিষ্কারগুলির মৌলিকত্বে আমার ন্যায্য অধিকার ।' - লিওনার্দো দা ভিঞ্চি

নাসা তীক্ষ্ণ, মােটা ভূরুতে চোখের পাতার এক-চতুর্থাংশ ঢাকা, চুলের ঢল ও দাড়ির ঢেউ মিলেমিশে একাকার। নিজের হাতে স্বপ্রতিকৃতি স্কেচ করেছেন। সামগ্রিকভাবে এক বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের উপস্থিতি। সময়টা এত পুরােনাে যে চড় চড় করে বিস্ময় বাড়ে। 

পাঁচশ বছর আগেকার কথা। সময়টা তাে তখন ছবিরই। সাড়া তুলতে পারলে যশ ও অর্থ দুই-ই মেলে। দ্য ভিঞি জীবনের একটা সময়ে তা পেয়েছেন। আবার পরবর্তীকালে নানা অভিঘাতে তিতিবিরক্ত হয়ে নিজেকে একজন বঞ্চিত অপমানিত চূর্ণ স্রষ্টা বলে মনে করেছেন। বিষােদগার করেছেন অনেক তাবড় প্রতিষ্ঠিত দিকপালদের বিরুদ্ধে। 

তার কিছু আগে শিল্পীরা ছবি আঁকতে শুরু করেছেন প্রকৃতির স্বাভাবিক পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে যা এতদিন প্রায় অলভ্য ছিল। ছবিতে স্বাভাবিকত্ব এনে মানুষের চোখ ও মনকে অবিষ্ট করে রাখবার এই যে অনায়াস দক্ষতা, দ্য ভিঞ্চির ভিতর তার ব্যপক স্ফুরণ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এই বিষয়ে দ্য ভিঞ্চিকে যদি পথিকৃত ভাবি, ভুল করা হবে। বরং সেই শিরােপাটা এনে বসিয়ে দেওয়া যায় তার অগ্রজ শিল্পী সাঁতােবত্তিচেলির মাথায়। 

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতন বহুমুখী প্রতিভা মানুষের ইতিহাসে দ্বিতীয় কেউ নেই। তিনি যুগপৎ সিভিল ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি তুখােড় স্থপতি। তার মতন পদার্থবিদ কোটিতে গুটি মেলে না। তিনি গণিতের বাঘা বাঘা জটিলতার সহজ সমাধান করে গেছেন। প্রাণীজগতের যে সব গূঢ়তত্ত্বের কথা লিওনার্দো বলে গেছেন, তাবৎ জীববিজ্ঞানীদের কাছে তা ধ্রুব সত্য। তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ যুদ্ধাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের একজন। লিওনার্দোর চেয়ে বড় মাপের চিত্রকর আর কেউ জন্মেছেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। 

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জন্ম ১৫ই এপ্রিল, ১৪৫২, ইতালিতে ফ্লোরেন্সের কাছাকাছি ভিঞি নামক অভিজাত এলাকায়। স্থান ভিঞির নামটাকে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের প্রত্যেকের পারিবারিক পরিচিতির সঙ্গে। বাল্যকাল থেকেই দ্য ভিঞি ভাবুক প্রকৃতির। কবিতা লেখেন না। কিন্তু ছবি আঁকেন। মৌলিকত্ব আছে। ফ্লোরেন্সের শাসক তখন মেদিচিরা। তিনি নিজেকে শিল্প ও সংস্কৃতির রক্ষক বলে মনে করতেন। দ্য ভিঞ্চিকে তিনি তাঁর রাজসভার সদস্য করে নেন। রাজসভা থেকে অর্থ ও সম্মান—দুই-ই ছিল তৃপ্তিদায়ক। দ্য ভিঞি সৃষ্টিশীল কর্মে মগ্ন হয়ে। থাকেন। সৃষ্টিশীল কর্ম মানে কেবল মাত্র চিত্রাঙ্কনে নয়, বরং ছবি আঁকার চেয়ে

বেশি সময় দিচ্ছেন স্থাপত্য, যন্ত্র ও বিজ্ঞান চর্চায়, রাজসভাতেও তিনি বিজ্ঞান নিয়ে আলােচনায় বিতর্কের ঝড় তুললেন। তার সমালােচনা করবার ভঙ্গীটি ছিল চাঁছাছােলা। যাঁদের এতকাল মানুষ প্রণম্য করে রেখেছে, তাদেরই অনেক ভ্রান্তি ও ক্ষুদ্রতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে শুরু করলেন। ফলে মেদিচিরা সমেত সকল ক্ষমতাবানরাই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ওপর চটে লাল। প্রাণভয়ে দ্য ভিঞ্চি ফ্লোরেন্স ছেড়ে পালালেন। এসে ঢুকলেন মিলানে। মিলানের শাসক কাউন্ট লুদোভিচো ফোর্জাকে তিনি যে চিঠি লিখেছিলেন, তার বঙ্গানুবাদটা এই রকম : ..... 

মিলানের শক্তি ও সমৃদ্ধিবর্ধনে আপনার যে দুর্লভ নেতৃত্ব, আমি তার অনুগত হয়ে থাকতে চাই। আমি অবশ্যই কোনও মনসবদারি তালুকদারি দাবি করছি না। আমার প্রত্যাশা কেবল স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা। কারণ, আমার রয়েছে এমন বহুমুখী প্রতিভা ও ব্যুৎপত্তি, যাকে কাজে লাগিয়ে আপনার মতাে অনন্য বীর অচিরে গােটা ইতালিকে পদানত করবেন। আমিই এই যুগের শ্রেষ্ঠ যন্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানী। আমি যে সমস্ত আয়ুধ নির্মাণ করেছি, তা নিমেষে যুদ্ধের রং বদলে দিতে পারে। আমি একটা বিশেষ ধরনের সেতু আবিষ্কার করেছি। এই সেতু অত্যন্ত হালকা হওয়া সত্বেও খুব মজবুত। সৈন্যরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় এটা বহন করে নিয়ে যেতে পারবে। পাহাড়ি নদী পার হবার পক্ষে এই সেতু খুবই উপযােগী।

কেবল তাই নয়, ওই সেতু আগুনে পােড়ে না, অস্ত্রাঘাতে খণ্ড-বিখণ্ড হয় না, অনেক ওজনদার বস্তুকে বুক পেতে ধরে রাখতে পারে। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।.....আমি এক দুরন্ত বারুদের গেলা বানিয়েছি, যা নিক্ষেপ করে আমাদের গােলন্দাজরা প্রতিপক্ষের বড় বড় মিনার ও সেতুকে পলকে গুঁড়িয়ে দিতে পারবে। ....আমি একটি বিশেষ ধরণের হালকা কামান আবিষ্কার করেছি। এই কামানের সাহায্যে অনবরত বড় বড় পাথরের খণ্ডকে বহুদূর নিক্ষেপ করা যাবে.....দ্য ভিঞ্চির এই চিঠি পেয়ে এবং তার সত্যতা যাচাই করে ফোর্জা এই বিরল প্রতিভাকে তাঁর রাজসভায় স্থান দিলেন। দ্য ভিঞ্চি সেখানে গিয়ে একদিকে যেমন তার বিখ্যাত ছবিগুলি আঁকলেন, অন্যদিকে তেমনি বহু নতুন ধরনের অস্ত্র ও যন্ত্রপাতিও নির্মাণ করে দিলেন।

কিন্তু ফোর্জা ছিলেন যুদ্ধবাজ লােক। ফলে একদিন তার পতন ঘটে। দ্য ভিঞ্চি আবার পালালেন। এরপর তিনি কখনও থপতির কাজ করেছেন, কখনও বা হয়েছেন মহামান্য পােপের টাকশালের বড় অফিসার। মনে শান্তি ছিল না, যেহেতু তিনি তাঁর প্রতিভা অনুযায়ী মান্যতা পাননি।

শেষে একদিন অসুথ শরীর নিয়ে নিজের সমস্ত ছবিগুলি সহ ইতালি ছেড়ে জলপথে পাড়ি জমালেন ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে। সেই দিনটা ছিল ৩রা অক্টোবর, ১৫১৭ খৃষ্টাব্দ। ২রা মে, ১৫১৯ খৃষ্টাব্দ, বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাদের অন্যতম লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি দক্ষিণ ফ্রান্সের ক্লস ল্স নামক স্থানে অন্তিম শ্বাস ত্যাগ করেন। 



লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জীবনী ও তাঁর আশ্চর্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাহিনী  লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জীবনী ও তাঁর আশ্চর্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাহিনী Reviewed by WisdomApps on সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২১ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.