রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৫০১ টি বাণী - 501 Bengali quotes by Rabindranath Tagore

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাণী 

• পুরুষের জীবনে চার আশ্রমের চার অধিদেবতা। বাল্যে মা, যৌবনে স্ত্রী, প্রৌঢ়ে কন্যা, পুত্রবধূ; বার্ধক্যে নাতনী, নাতবউ। এমনি করে মেয়েদের মধ্যে দিয়েই পুরুষ আপনার পূর্ণতা পায়। পথ আমারে পথ দেখাবে জেনেছি এই সার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাণী

• মুক্তি? ওরে মুক্তি কোথায় পাবি

মুক্তি কোথায় আছে।

আপিনি প্রভু সৃষ্টি বাঁধন পরে

বাঁধা সবার কাছে।

• পৃথিবীতে যথাসম্ভব স্বাধীনতা পাইতে গেলেই নিজেকে অধীন করিতে হয়।

• যাহার হৃদয়ে যত সৌন্দর্য বিরাজ করিতেছে সে তত সৌন্দর্য উপভোগ করিতে পারে। সৌন্দর্যের সহিত তাহার নিজের ঐক্য যতই সে বুঝিতে পারে ততই সে আনন্দ লাভ করে আমি যে এত ফুল ভালোবাসি তাহার কারণ আর কিছু নয়, ফুলের সহিত আমার হৃদয়ের গূঢ় একটি ঐক্য আছে—আমার মনে হয়ও একই কথা, যে সৌন্দর্য ফুল হইয়া ফুটিয়াছে, সেই সৌন্দর্যই অবস্থাভেদে আমার হৃদয় হইয়া বিকশিত হইয়াছে।

•মানুষের মধ্যেই ভগবানের সত্যকার প্রকাশ, তেমনি দেশের মধ্যে। • ফুলের মধ্যে যে আনন্দ সে প্রধানত ফলের প্রত্যাশার আনন্দ, এটা অত্যন্ত মোটা কথা। বিশ্বসৃষ্টিতে দেখতে পাই সৃষ্টিতেই আনন্দ, হওয়াটাই চরম কথা। তার ফুলেও আছে হওয়া, ফলেও আছে হওয়া। ফুলটা হল উপায় আর ফলটা হল উদ্দেশ্য, তাই বলে উভয়ের মধ্যে মূল্যের কোনো ভেদ দেখতে পাইনে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাণী

•মানবের মধ্যে দেবতার প্রকাশ সংসারের মধ্যে দেবতার প্রতিষ্ঠা, আমাদের প্রতি মুহূর্তের সুখ-দুঃখের মধ্যে দেবতার সঞ্চার, ইহাই - নব হিন্দুধর্মের মর্মকথা হইয়া উঠল।

• আশা করিবার অধিকারই মানুষের শক্তিকে প্রবল করিয়া তোলে। আমি আছি, এইটেই হচ্ছে সৃষ্টির ভাষা

• আমি আছি , এইটেই হচ্ছে সৃৃষ্টির ভাষা । 

• অন্ধকারে লুকিয়ে আপন মনে,

কাহারে তুই পূজিস সংগোপনে,

নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে

দেবতা নাই ঘরে।

• প্রেমই উৎসবের দেবতা—মিলনই তাঁহার সজীব সচেতন মন্দির। সত্যকে যেদিন প্রত্যক্ষ দেখবে সেই দিনই উৎসব।

• নারীপ্রকৃতি আপনার স্থিতিতে প্রতিষ্ঠা। সার্থকতার সন্ধানে তাকে দুর্গম পথে ছুটতে হয় না। জীবপ্রকৃতির একটা বিশেষ অভিপ্রায়তার মধ্যে চরম পরিণতি পেয়েছে। সে জীবধাত্রী, জীবপালিনী; তার সম্বন্ধে প্রকৃতির কোনো দ্বিধা নেই। প্রাণসৃষ্টি, প্রাণপালনও প্রাণতোষণের বিচিত্র ঐশ্বর্য তার দেহ মনে পর্যাপ্ত। এই প্রাণসৃষ্টি বিভাগে পুরুষের প্রয়োজন অত্যন্ত; এইজেন্যে প্রকৃতির একটা প্রবল তাগিদ থেকে পুরুষ মুক্ত। প্রাণের ক্ষেত্রে ছুটি পেয়েছে বলেই চিত্তক্ষেত্রে সে আপন সৃষ্টিকার্যের পত্তন করতে পারলে। সাহিত্যে, কলায়, বিজ্ঞানে, দর্শনে, ধর্মে, বিধিব্যবস্থায় মিলিয়ে থাকে। যাকে আমরা সভ্যতা বলি সে হল প্রাণপ্রকৃতির পলাতক ছেলে পুরুষের সৃষ্টি।

•চোখে দেখিস, প্রাণে কানা

হিয়ার মাঝে দেখ্‌ না ধরে ভুবনখানা ।

• আমরা সাধারণ পনেরো-আনা, আমরা নিজেদের যেন হেয় বলিয়া না জ্ঞান করি। আমরা সংসারের গতি। পৃথিবীতে মানুষের হৃদয়ে আমাজের জীবনস্বত্ব আমার কিছুতেই দখল রাখি না, আঁকড়িয়া থাকি না, আমরা চলিয়া যাই। সংসারের সমস্ত কলগান আমাদের দ্বার ধ্বনিত, সমস্ত ছায়ালোক আমাদের উপরই স্পন্দমান। আমরা যে হাসি, কাঁদি, ভালোবাসি, বন্ধুর সঙ্গে অকারণ খেলা করি, স্বজনের সঙ্গে অনাবশ্যক আলাপ করি, দিনের অধিকাংশ খেলা করি, দিনের অধিকাংশ সময়েই চারিপাশের লোকের সহিত উদ্দেশ্যহীনভাবে যাপন করি, তারপরে ধুম করিয়া ছেলের বিবাহ দিয়া তাহাকে আপিসে প্রবেশ করাইয়া পৃথিবীতে কোনো খ্যাতি না রাখিয়া মরিয়া-পুড়িয়া ছাই হইয়া যাই—আমরা বিপুল সংসারের বিচিত্র তরঙ্গলীলার অঙ্গ, আমাদের ছোটখাটো হাসি-কৌতুকেই সমস্ত জন প্রবাহ ঝলমল করিতেছে। আমাদের ছোটখাটো আলাপে বিলাপে সমস্ত সমাজ মুখরিত।


• ফন্দি জিনিসটা খুব ভালো যদি তার মধ্যে নিজে আটকা না পড়া যায়।

• অন্য খরচের চেয়ে বাজে খরচেই মানুষকে যথার্থ চেনা যায়। কারণ মানুষ ব্যয় করে বাঁধা নিয়ম অনুসারে, অপব্যয় করে নিজের খেয়ালে। বাজে কথাতেই মানুষ আপনাকে ধরা দেয় ।

• বিশ্বকে আমরা জানি, তার কারণ বিশ্বে সত্যের আবির্ভাব। বিশ্বে আমাদের তৃপ্তি, তার কারণ বিশ্ব আনন্দের প্রকাশ ।

• বল, বুদ্ধি ও ঐশ্বর্য মানুষ্যত্বের একটা অঙ্গ হইতে পারে, কিন্তু শন্তি, সমাঞ্জস্য এবং মঙ্গলও কি তদপেক্ষা উচ্চতর অঙ্গ নহে। ভালো জিনিসগুলিকে ঘেঁষাঘেঁষি করে রাখা তাদের অপমান করা—সে যেন সতী স্ত্রীকে সতীনের ঘর করতে দেওয়ার মতো। মনের জীবন মননক্রিয়া এবং সেই জীবনেই মনুষ্যত্ব

• মৃত্যু সবচেয়ে নিশ্চিত—জীবনের সব গতিস্রোতের চরম সমুদ্র, সব ভালোমন্দের নিঃশেষ সমন্বয় তার মধ্যে।

• শিখিবার কালে, বাড়িয়া উঠিবার সময়ে প্রকৃতির সহায়তা নিতান্তই চাই । 

• আনন্দ যে রূপ ধরেছে এই তো হল রস।




• চিন্তা শক্তি এবং কল্পনাশক্তি জীবনযাত্রা নির্বাহের পক্ষে দুইটি অত্যাবশ্যক শক্তি, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। অর্থাৎ যদি মানুষের মতো মানুষ হতে হয় তবে ঐ দুটা পদার্থ জীবন হইতে বাদ দিলে চলে না। অতএব বাল্যকাল হইতে চিন্তা ও কল্পনার চর্চা না করিলে কাজের সময় যে তাহাকে হাতের কাছে পাওয়া যাহবে না, একা অতি পুরাতন। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষায় সে পথ একপ্রকার রূদ্ধ।

• বইয়ের ভিতরে দিয়া জানাকেই আমরা পাণ্ডিত্য বলিয়া গর্ব করি। জগৎকে আমরা মন দিয়া ছুই না, বই দিয়া ছুই।

• বহুবিধ বিষয় পাঠের ব্যবস্থা করিলেই যে শিক্ষায় লাভের অঙ্ক অগ্রসর হয় তাহা নহে, মানুষ যে বাড়ে ‘স’ ন মেধায়ান বহুনা শ্রুতেন। যেখানে নিভৃতে তপস্যা হয় সেইখানেই আমরা শিখিতে পারি। যেখানে গোপনে ত্যাগ, যেখানে একান্তে সাধনা, সেইখানেই আমরা শক্তিলাভ করি। যেখানে সম্পূর্ণভাবে দান সেইখানেই সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ সম্ভবপর। যেখানে অধ্যাপকগণ জ্ঞানের চর্চায় স্বয়ং প্রবৃত্ত সেইখানেই ছাত্রগণ বিদ্যাকে প্রত্যক্ষ দেখিতে পায়। বাহিরে বিশ্বপ্রকৃতির আবির্ভাব যেখানে বাধাহীন অন্তরে সেইখানেই মন সম্পূর্ণ বিকশিত। ব্রহ্মচার্যের সাধনায় চরিত্র যেখানে সুস্থ এবং আত্মবশ,ধর্মশিক্ষা সেইখানে সরল ও স্বাভাবিক।




• বই পড়াটা যে শিক্ষার একটি সুবিধাজনক সহায়মাত্র তাহা আর আমাদের মনে হয় না, আমার বই পড়াটাকেই শিক্ষার একমাত্র উপায় বলিয়া ঠিক করিয়া বসিয়া আছি।

• স্বাধীন চলাফেরার জন্য অনেকখানি স্থান রাখা আবশ্যক, নতুবা আমাদের স্বাস্থ্য এবং আনন্দের ব্যাঘাত হয়। শিক্ষা সম্বন্ধেও এ কথা খাটে। যতটুকু কেবলমাত্র শিক্ষা, অর্থাৎ অত্যাবশ্যক, তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে একান্ত নিবদ্ধ রাখিলে কখনোই তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না। অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না—বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেকটা পরিমাণে বালকই থাকিয়া যায়।

• ভাবের সহিত ভাষা, শিক্ষার সহিত জীবন কেবল একত্র করিয়া দাও । আমাদের স্কুল-কলেজও তপস্যা আছে, কিন্তু সে মানের তপস্যা, জ্ঞানের তপস্যা, বোধের তপস্যা নয়। বোধের তপস্যার বাধা হচ্ছে রিপুর বাধা। প্রবৃত্তি অসংযত হয়ে উঠলে চিত্তের সাম্য থাকে না, সুতরাং বোধ বিকৃত হয়ে যায়। কামনার জিনিসকে আমারা শ্রেয় দেখি; সে জিনিসটা সত্যই শ্রেয় বলে নয়, আমাদের কামনা আছে বলেই। লোভের জিনিসকে আমরা বড় দেখি, সে জিনিস সত্যই বড় বলে নয়; আমাদের লোভ আছে বলেই এই জন্য ব্রহ্মচার্যের সংযমের দ্বারা বোধশক্তিকে বাধামুক্ত করবার শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক।

• আমাদের শিক্ষার মধ্যে এমন একটি সম্পদ থাকা চাই যা কেবল আমাদের তথ্য দেয় না, সত্য দেয়, যা কেবল ইন্ধন দেয় না, অগ্নি দেয়।

• জীবনের কোনো লক্ষ্য নাই অথচ শিক্ষা অছে, ইহার কোন অর্থই নাই ।

• সকল বড় দেশেই বিদ্যাশিক্ষার নিম্নতর লক্ষ্য ব্যবহারিক সুযোগ লাভ, উচ্চতর লক্ষ্য মানবজীবনের পূর্ণতা সাধন

• প্রাকৃতিক জগতেও যেমন মানবজগতেও তেমনি, সম্পূর্ণ সাম্য উদ্যমকে স্তব্ধ করে দেয়, বুদ্ধিকে অলস করে। অপরপক্ষে অতিবন্ধুরতাও দোষের

• মন প্রকৃতির আর্শি নহে, সাহিত্যও প্রকৃতিও আর্শি নহে। মন প্রকৃতিক জিনিসকে মানসিক করিয়া লয়, সাহিত্য সেই মানসিক জিনিসকে সাহিত্যিক করিয়া তোলে।

• বিশুদ্ধ সাহিত্য অপ্রয়োজনীয়; তার যে রস অহেতুক। মানুষ সেই দায়মুক্ত বৃহৎ অবকাশের ক্ষেত্রে কল্পনার সোনার কাঠি-ছোঁওয়া সামগ্রীকে জাগ্রত করতে জানে আপন সত্তায়। তার সেই অনুভবে অর্থাৎ আপনারই বিশেষ উপলব্ধিতে তার আনন্দ। এই আনন্দ দেওয়া ছাড়া সাহিত্যের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে জানিনে। • যে প্রকাশ চেষ্টার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে আপন প্রয়োজনের রূপকে নয়, বিশুবদ্ধ আনন্দরূপকে ব্যক্ত করা, সেই চেষ্টারই সাহিত্যগত ফলকে আমি রস-সাহিত্য নাম দিয়েছি।

• সহিত্য শিল্পকে যারা কৃত্রিম বলে অবজ্ঞা করে তারা সত্যকে জানে না। বস্তুত, প্রত্যাহিক মানুষ তা নানা জোড়াতালি লাগা আবরণে, নানা বিকারে কৃত্রিম, সে চিরকালের পরিপূর্ণতার আসন পেয়েছে সাহিত্যের তপোবনে, ধ্যানের সম্পদে সাহিত্য যখন অক্লান্ত শক্তিমান থাকে তখন সে চিরন্তনকেই নূতন করিয়া প্রকাশ করতে পারে। এই তার কাজ। একেই বলে ওরিজিন্যালিটি।

• জগতের সকলের চেয়ে অরক্ষিত অসহায় জীব হল সাহিত্য রচয়িতা। মৃদুস্বভাব হরিণ পালিয়ে বাঁচে। কিন্ত কবি ধরা পড়ে ছাপা অক্ষরের কালো জালটায়।

• দেখতে কেমন হবে? চেহারাটি বেশ ছিপছিপে, মাটির সঙ্গে অতি অল্প সম্পর্ক, যেন সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতেব।' অর্থাৎ যাকে দেখে মনে হবে অতি ক্ষীণবল—অস্তিত্বটুকু, কেবলমাত্র—অথচ ওইটুকুর মধ্যে যে এত লীলা, এত বল, এত কৌতুক তা দেখে পলকে পলকে আশ্চর্য বোধ হবে।

• কথা উঠেছে সাহিত্য বিচারে বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতি শ্রদ্ধেয় কিনা। এ প্রশ্নের উত্তর দেবার পূর্বে আলোচ্য এই—কী সংগ্রহ করার জন্য এই বিশ্লেষণ। আলোচ্য সাহিত্যের উপাদান-অংশগুলি? আমি বলি সেটা অত্যাবশ্যক নয়, কারণ উপাদানকে একত্র করার দ্বারা সৃষ্টি হয় না। সমগ্র সৃষ্টি আপন সমস্ত অংশের চেয়ে অনেক বেশি। সেই বেশিটকু পরিমাণগত নয়। তাকে মাপা যায় না, ওজন করা যায় না, সেটা হল রূপরহস্য, সকল সৃষ্টির মূলে প্রচ্ছন্ন। প্রত্যেক সৃষ্টির মধ্যে সেটাই হল অদ্বৈত, বহুর মধ্যে সে ব্যাপ্ত অথচ বছর দ্বারা তার পরিমাপ হয় না। সে সকল অর্থাৎ তার মধ্যে সমস্ত অংশ আছে, তবু সে নিষ্কল, তাকে অংশে খণ্ডিত করলেই সে থাকে না। অতএব সাহিত্যে সমগ্রকে সমগ্রকে দৃষ্টি দিয়েই দেখতে হবে।

• স্ত্রী হবে কেমন? রোজ এক একপাতা ওল্টাবে আর এক-একটা নতুন চ্যাপ্টার বেরোবে।

• আমদের সাহিত্যে স্ত্রীলোক যে প্রাধান্য লাভ করিয়াছে তাহার প্রধান কারণ, আমাদের দেশের স্ত্রীলোক আমাদের দেশের পুরুষের অপেক্ষা অনেক শ্রেষ্ঠ।

• অধিকাংশ লোকে স্ত্রীকে বিবাহমাত্র করে, পায় না, এবং জানেও না যে পায় নাই, তাহদের স্ত্রীর কাছেই আমৃত্যুকাল এ খবর ধরা পড়ে না।

• স্ত্রীলোক স্তুতিবাদে বিশেষ আনন্দ লাভ করে। কেবল অহংকার পরিতৃপ্তির জন্য নহে; তাহাতে সে আপনার জীবনের সার্থকতা অনুভব করে।

• আগুনের পরশমণি

ছোঁয়াও প্রাণে

এ জীবন পুণ্য করো

দহন-দানে।

• মানুষের অধিকার চেয়ে নিতে হবে না, অধিকার সৃষ্টি করতে হবে। • অভ্যাসে যে মনকে পেয়ে বসে সে মনের মতগুলো মনন থেকে বিযুক্ত হয়ে যায়, অর্থাৎ চিত্তধারার সঙ্গে চিন্তিত বিষয়ের সম্বন্ধ শিথিল হয়।

• আর্ট আমাদের মনে বাস্তবের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, আমাদের সত্তার সঙ্গে তার নিবিড়সম্বন্ধ স্থাপন করে গভীর আনন্দের চেতনা এনে দেয়।

• সমাজে সর্বসাধারণের প্রচলিত ব্যবহার রীতিকে আচার বলে। কোনো কোনো দেশে এই আচার ব্যক্তিগত অভিরুচির স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্যকে সম্পূর্ণ চাপ দিয়ে রাখে। সেখানে মানুষ হয় ওঠে পুতুল। আনন্দের দেবতাকে উপলব্ধি করলে আর ভয় নেই। কারণ, এই আনন্দের দেবতাই যে ‘আরো’—এই তো সকলকে ছাড়িয়ে যায় যা কিছু পেয়েছি, বুঝেছি, তার চেয়ে তিনি আরো, যা পাইনি, হারিয়েছি তার চেয়েও তিনি আরো, তিনি ধনের চেয়ে অরো, আরামের চেয়ে আরো। তাইতো সেই ‘আরো’র পূজায় ‘আরো’র উৎসবে মানুষ আনন্দে বলছে, ‘আমার ধন নাও, প্রাণ নাও, সম্মান নাও।' অন্তরে এবং বাহিরে মানুষের এই যে ‘আরো’কে জানা এ বড় আরামের জানা নয়।

• বিজ্ঞান যেসব ঘটনার কার্য কারণ সম্পর্কে বিশ্বাস করে, তারা সবাই প্রাকৃতিক, ইন্দ্রজাল মনে করে এই সম্পর্কগুলো অতিলৌকিক, অতিপ্রাকৃতিক, রহস্যময়, অদৃশ্য, আত্মিক শক্তির (Spiritualistic forces) পারস্পরিক সম্পর্ক। আবার, বাঞ্ছিত কয়টি উৎপন্ন করার বা অবাঞ্ছিত কার্য নিবারণ বা প্রতিরোধ করার জন্য বিজ্ঞানে যেসব পদ্ধতি অবলম্বনের নির্দেশ দেয় সেগুলিও ইন্দ্রজাল নির্দেশিত উপায় বা পন্থার থেকে মৌলিক পার্থক্য সম্পন্ন

• কর্ম যখন বিষয়কর্ম না হয়, তখন সেই কর্ম মানুষকে দূরের স্বাদ দেয়, দূরের বাঁশি বাজায় ।

• কবিদিগকে আর কিছুই করিতে হইবে না, তাঁহার কেবল সৌন্দর্য ফুটাইতে থাকুন,—জাগতের সর্বত্র যে সৌন্দর্য আছে তাহা তাঁহাদের হৃদয়ের আলোকে পরিস্ফুট ও উজ্জ্বল হইয়া আমাদের চোখে পড়িতে থাকুক, তবেই আমাদের প্রেম জাগিয়া উঠিবে, প্রেম বিশ্বব্যাপী হইয়া পড়িবে।

• কর্ম করিতে করিতেই শত বৎসর বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করবে। যাঁরা আত্মার আনন্দকে প্রচুর উপলব্ধি করেছেন এ হচ্ছে তাঁদেরই বাণী । যাঁরা আত্মাকে পরিপূর্ণ করে জেনেছেন তাঁরা কোনোদিন দুর্বল মুহ্যমানভাবে বলেন না—জীবন দুঃখময় এবং কর্ম কেবলই বন্ধন । কর্মকেই চরম মনে করে তার মধ্যে ডুবে থাকলে মানুষ কর্মকে নিয়ে আত্মশক্তির গর্ব উপলব্ধি করে। কিন্তু কর্মের ভিতরকার সত্যকে যখন আমরা দেখি তখন কর্মের চেয়ে বহু গুণে বড় জিনিসটাকে দেখি । মানুষ যতই কর্ম করছে, ততই সে আপনার ভিতরকার অদৃশ্যকে দৃশ্য করে তুলছে, ততই সে আপনার সুদূরবর্তী অনাগতকে এগিয়ে নিয়ে আসছে। এই উপায়ে মানুষ আপনাকে কেবল স্পষ্ট করে তুলছে—মানুষ আপনার নানা কর্মের মধ্যে, রাষ্ট্রের মধ্যে, সমাজের মধ্যে আপনাকেই নানা দিক থেকে দেখতে পাচ্ছে।

• উলঙ্গতার একটা সুবিধা, তাহার মধ্যে প্রতিযোগিতা নাই। কিন্তু কাপড় ধরাইলেই শখের মাত্রা, আড়ম্বরের আয়োজন, রেষারেষি করিয়া বাড়িয়া চলিতে থাকে। শিশুর নবনীত কোমল সুন্দর দেহ ধনভিমান প্রকাশের উপলক্ষ হইয়া ওঠে, ভদ্রতার বোঝা অকারণে অপরিমিত হইতে থাকে।

• কৃষির মধ্যে দিয়ে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য স্থাপন করেছে। পৃথিবীর গর্ভে যে জননশক্তি প্রচ্ছন্ন ছিল সেই শক্তিকে আহ্বান করেছে। সিদ্ধির পথে চলা দৌড়ে, সুন্দরের পথে চলা ধীরে। আধুনিককালে সিদ্ধির লোভ প্রকাণ্ড, প্রবল, তাই আধুনিক কালের বাহনের বেগ কেবলই বেড়ে যাচ্ছে। যা কিছু গভীরভাবে নেবার যোগ্য, দৃষ্টি তাকে গ্রহণ করে না,স্পর্শ করেই চলে যায়।

• ছায়াচত্রির প্রধান জিনিসটা হল দৃশ্যের গতিপ্রবাহ সুরে চলমান ধারায় সংগীত যেমন বিনা বাক্যেই আপন মাহাত্ম্য লাভ করতে পারে, তেমনি রূপে চলৎ প্রবাহ কেন স্বতন্ত্র রসসৃষ্টি রূপে উন্মোচিত হবে না।

• রীতিমতো ভালো চিঠি লেখা দুরূহ কাজ....। চিঠিতে এমন সকল আভাস ইঙ্গিত ফলাতে হয়—কেবল ভাবের চিকিমিকিগুলি মাত্ৰ যে, সে প্রায় কবিতা লেখার সামিল বল্লেই হয়।

• চিঠির সহিত্যে ধরা দেয় লেখকের কাছ ঘেঁষা জগতের দৈনিক ছায়া-প্রতিচ্ছায়া, তার ক্ষণিক হাওয়ার মর্জি; আর তার সঙ্গে প্রধানত মিলিয়ে থাকে সদা প্রত্যক্ষ সংসার পথের চলতি ঘটনা নিয়ে আলাপ প্রতি-আলাপ । ...যারা ভালো চিঠি লেখে তারা মনের জানালার ধারে বসে লেখে, আলাপ করে যায় তার কোনা ভয় নেই, বেগেও নেই, স্রোত আছে।

• চিঠিপত্রে আমরা যে কেবল প্রত্যক্ষ আলাপের অভাব দূর করি তা নয়, ওর মধ্যে আরও একটু রস আছে যা প্রত্যক্ষ দেখাশোনায় নেই । .....চিঠিতে মানুষকে দেখবার এবং পাবার জন্য আরো একটি নতুন ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

• স্বাধীন চিন্তা যেখানে আছে সেখানে বুদ্ধির ভিন্নতা অনুসারে উদ্দেশ্যের ভিন্নতা জন্মাইয়াই থাকে।


• বিশ্বজগৎ আমারে মাগিলে

কে মোর আত্মপর ।

আমার বিধাতা আমাতে জাগিলে

কোথায় আমার ঘর।

• আর কেনো দান দানই নহে, শক্তিদানই একমাত্র দান ।

• টাকার মধ্যে এই ঐশ্বর্য আছে কোনখানে। যেখানে সে আমার একান্ত প্রয়োজনকে উত্তীর্ণ হয়ে যায়, যেখানে সে আমার পকেটের মধ্যে প্রচ্ছন্ন নয়, যেখানে তার সমস্ত রশ্মিই আমার কৃষ্ণবর্ণ অহংটার দ্বারা সম্পূর্ণ শোষিত না হয়ে যাচ্ছে, সেইখানেই তাঁর মধ্যে অশেষের আবির্ভাব এবং এই অশেষই নানা রূপে প্রকাশমান।

• দানের সঙ্গে শ্রদ্ধা বা প্রেম মিলিলে তবেই তাহা সুন্দর ও সমগ্র হয়।

• পৃথিবীতে যেখানে এসে তুমি থামবে সেইখানে হতেই তোমার ধ্বংস আরম্ভ হবে। কারণ তুমিই কেবল একলা থামবে, আর কেউ থামবে না।

• নতুনকে দেখতে হলে, মনকে একটু বিশেষকরে বাতি জ্বালাতে হয় । পুরোনোকে দেখতে হলে ভালো করে চোখ মেলাতেই হয় না। সেইজন্যে নতুনকে যত শীঘ্র পার দেখে নিয়ে, মন আপনার অতিরিক্ত বাতিগুলি নিভিয়ে ফেল। খরচ বাঁচাতে চায়, মনোযোগকে উসকে রাখতে চায় না।

• নরকেও সুন্দর আছে, কিন্তু সুন্দরকে কেউ সেখানে বুঝতেই পারে না, নরকবাসীর সবচেয়ে বড় সাজা তাই ।

• নদী দেশকে দেয় জল, দেয় ফল, কিন্তু সবচেয়ে বড় তার দান, দেশকে সে দেয় গতি। দূরের সঙ্গে, বাহিরের সঙ্গে সম্বন্ধ শাখায়িত করে নদী, স্থাবরের মর্মের মধ্যে নিয়ে আসে প্রাণের চলৎপ্রবাহ

• শুষ্কতা রিক্ততার মরুপথে কিছু না খেয়ে, কিছু না পেয়েও, আমাদের চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে সে কেবল নিষ্ঠা—তার এমনি শক্ত প্রাণ যে নিন্দা গ্লানির ভিতর থেকে, কাঁটাগুল্মের মধ্য থেকেও, সে নিজের খাদ্য সংগ্রহ করে নিতে পারে। যখন মরুবায়ুতে মৃত্যুময় ঝঞ্ঝা উন্মত্তের মতো ছুটে আসে, তখন সে ধুলোর উপর মাথা সম্পূর্ণ নত করে ঝড়কে মাথার উপর দিয়ে চলে যেতে দেয়। তার মতো এমন ধীর-সহিষ্ণু এমন অধ্যবসায়ী কে আছে?

• বৃহৎ নিয়মে ক্ষুদ্র কাজ অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু সেই নিয়ম যদি বৃহৎ না হইত তবে তাহার দ্বারা ক্ষুদ্র কাজটুকুও অনুষ্ঠিত হইতে পারিত না। একটি পাকা আপেল ফল যে পৃথিবীতে খসিয়া পড়িবে তাহার জন্য চরাচর ব্যাপী ভারাকর্ষণ শক্তির আবশ্যক—একটি ক্ষুদ্র পালের নৌকা চলিবে কিন্তু পৃথিবী বেষ্টনকারী বাতাস-চাই। তেমনি সংসারের ক্ষুদ্র কাজ চালাইতে হইবে এইজন্য অনন্ত প্রতিষ্ঠিত ধর্মনীতির আবশ্যক।

• ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতার প্রাণশক্তি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত। সাধরণের কল্যাণভার যেখানেই পুঞ্জিত হয়, সেইখানেই দেশের মর্মস্থান। সেইখানে আঘাত করিলেই সমস্ত দেশ সাংঘাতিকরূপে আহত হয় । বিলাতে রাজশক্তি যদি বিপর্যস্ত হয় তবে সমস্ত দেশের বিনাশ উপস্থিত হয়। এই জন্যেই যুরোপে পলিট্রিক্স এত অধিক গুরুতর ব্যাপার। আমাদের দেশে সমাজ যদি পঙ্গু হয়, তবেই যথার্থভাবে দেশের সংকটাবস্থা উপস্থিত হয়।

• পুত্রের মধ্যে পিতা নিজেকই উপলব্ধি করে, সেই উপলব্ধিতেই আনন্দ।

• পাওয়া কাকে বলে যে মানুষ জানে না, ছোঁওয়াকেই সে পাওয়া মনে করে।

• হে অনন্ত সমুদ্র, এ পারও তোমার, ও পারও তোমার। কিন্তু, একটা পারকে যখন আমার পার বলি তখন ও পারের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটে। তখন সে আপনার সম্পূর্ণতার অনুভব হতে ভ্রষ্ট হয়, ও- পারের জন্য ভিতরে ভিতরে কেবলই তার প্রাণ কাঁদতে থাকে। আমার পারের আমিটি তোমার পারের তুমির বিরহে বিরহিণী। পার হবার জন্য তাই এত ডাকাডাকি।

• এইটে আমার ঘর বলে আমি লোকটা দিনরাত্রি খেটে মরছি। যতক্ষণ না বলতে পারছে—এইটে তোমারও ঘর ততক্ষণ তার যে কত দাহ কত বন্ধন, কত ক্ষতি তার সীমা নেই—ততক্ষণ ঘরের কাজ করতে করতে তার অন্তরাত্মা কেঁদে গাইতে থাকে, ‘হরি আমায় পার করো।' যখন সে আমার ঘরকে তোমারই ঘর করে তুলতে পারে তখন সে ঘরের মধ্যে থেকে পার হয়ে যায়।

• প্রাণ জিনিসটা অপূর্ণতার মধ্যে পূর্ণতার ব্যঞ্জনা। প্রাণের একটা রঙ আছে। তা ইন্দ্ৰধনু গাঁঠ হইতে চুরি করা লাল, নীল সবুজ, হলদে প্রভৃতি কোনো বিশেষ রঙ নয়, তা কোমলতার রঙ।

• বাতাসে সত্যের যে প্রভাব ভেসে বেড়ায় তা দূরের থেকেই আসুক বা নিকটের থেকে, তাকে সর্বাগ্রে অনুভব করে এবং স্বীকার করে প্রতিভাসসম্পন্ন চিত্ত; যারা নিষ্প্রতিভ তারাই সেটাকে ঠেকাতে চায় এবং যেহেতু তারা দলে ভারী এবং তাদের অসারতা ঘুচাতে অনেক দেরী হয়, এই কারণেই প্রতিভার ভাগ্যে দীর্ঘকাল দুঃখভোগ থাকে।

• বান্দিদশা শুধু তো কারা প্রাচীরের মধ্যে নয়।

মানুষের অধিকার সংক্ষেপ করাই তো বন্ধন ।

• প্রাণ কেবল শরীরের নয়। মনেরও প্রাণ আছে। মনের মধ্যেও চেষ্টা আছে। মন চলছে, মন বাড়ছে, মনের ভাঙাগড়া পরিবর্তন হচ্ছে। এই স্পন্দিত তরঙ্গিত মন কখনোই কেবল আমার ক্ষুদ্র বেড়াটির মধ্যে আবদ্ধ নয়।

• বিপদে মোরে রক্ষা করো

এ নহে মোর প্রার্থনা।

বিপদে আমি না যেন করি ভয়।

• ব্রহ্মচর্য পালনের দ্বারা ধর্ম সম্বন্ধে সুরুচিকে স্বাভাবিক করিয়া দেওয়া হয়। উপদেশ দেওয়া নহে, শক্তি দেওয়া হয়। নীতিকথাকেই বাহ্য ভূষণের মতো জীবনের ওপর চাপাইয়া দেওয়া নহে, জীবনকেই ধর্মের সঙ্গে গড়িয়া তোলা এবং এইরূপে ধর্মকে বিরুদ্ধ পক্ষে দাঁড় না করাইয়া তাহাকে অন্তরঙ্গ করিয়া দেওয়া হয়। ....শুধু এই ব্রহ্মচর্য পালন নয়, তাহার সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির আনুকূল্য থাকা চাই।

• মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।

• বাংলা ভাষা বাংলা ব্যাকরণের নিয়মে চলে এবং সে ব্যাকরণ সম্পূর্ণরূপে সংস্কৃত ব্যাকরণের দ্বারা শাসিত নহে।

• ভাবুক লোক মাত্রেই অনুভব করিয়াছেন যে, আমরা মাঝে মাঝে এক প্রকার বিষণ্ণ সুখের ভাব উপভোগ করি, তাহা কোমল বিষাদ, অপ্রখর সুখ। তাহা আর কিছ নয়, সীমা হইতে অসীমের প্রতি নেত্রপাত মাত্ৰ ৷

• হে ভারত, নৃপতিরে শিখায়েছ তুমি

ত্যজিতে মুকুট দণ্ড সিংহাসন ভূমি,

ধরিতে দরিদ্রবেশ শিখায়েছ বীরে

ধর্মযুদ্ধে পদে পদে ক্ষমিতে অরিরে।

• সৌন্দর্যমূর্তিই মঙ্গলের পূর্ণমূর্তি এবং মঙ্গলমূর্তিই সৌন্দর্যের পূর্ণস্বরূপ। ভুল করিবার স্বাধীনতা থাকিলে তবেই সত্যকে পাইবার স্বাধীনতা থাকে। নিখুঁত হইবার আশায় যদি নিরঙ্কুশ নির্জীব হইতে হয়, তার চেয়ে না হয় ভুলই করিলাম।

• যাকে সুন্দর বলি তার কোঠা সংকীর্ণ, যাকে মনোহর বলি তা বহু দূর প্রসারিত।  

• দেব-দানবকে সমুদ্র মন্থন করতে হয়েছিল তবে অমৃত জেগেছিল, যে অমৃত সমস্তর মধ্যে ছড়ানো ছিল। কর্মের মন্থনদণ্ডের নিয়ত তাড়নায় আমাদের মধ্যে যে শক্তি ছড়িয়ে আছে তাকে আমরা ব্যক্ত আকরে পাব, তাতেই আমাদের জাতীয় ব্যক্তিত্ব অমর হয়ে উঠবে, আমাদের চিন্তা বাক্য এবং কর্ম সুনির্দিষ্টতা পেতে থাকবে।

• দর্পণে যাহারে দেখি সেই আমি ছায়া,

তারে লয়ে গর্ব করি অপূর্ব এ মায়া।

•  যে মানুষ আপনার আত্মার মধ্যে অন্যের আত্মাকে ও অন্যের আত্মার মধ্যে আপনার আত্মাকে জানে, সেই জানে সত্যকে।

• ভেদের দ্বারা বহুর জন্ম কিন্তু মিলের দ্বারা বহুর রক্ষা।

• জগতে আমাদের প্রত্যেকেরই একটি বিশেষ স্থান আছে। আমরা প্রত্যেকেই এক একটি বিশেষ ‘আমি’।

• অরণ্য ভারতবর্ষের দ্বারা বিলুপ্ত হয়নি, ভারতবর্ষের দ্বারা সার্থক হয়েছিল, যা বর্বরের আবাস ছিল তাই ঋষির তপোবন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

• যতই অপব্যয় হয় মানুষের অন্ধতা ততই বেড়ে ওঠে তখন পথের চেয়ে বিপথের প্রতিই মানুষের শ্রদ্ধা বেশি হয়।

• সুশৃঙ্খল অবসর সে তো প্রাণপণ পরিশ্রমের ফল আর উচ্ছৃঙ্খল জড়ত্ব অলসের অনায়সলদ্ধ অধিকার।

• বাইরের পদার্থের যোগে কোনো বিশেষ রঙে বিশেষ রসে বিশেষ রূপে আপনাকেই বোধ করাকে বলে অনুভব করা।

• মানুষের জাগরণ সহজ নয় বলেই তার মূল্য যে এত বেশি। এই জাগরণের জন্য যুগ যুগ যে অপেক্ষা করতে হয়।

• হে অতীত, তুমি ভুবনে ভুবনে

কাজ করে যাও গোপনে গোপনে,

মুখর দিনের চপলতা মাঝে

স্থির হয়ে তুমি রও।

• জনতা না থাকলে নির্জনতার স্বাদ মরে যায়।

• চোখের ছবিতে মন আপনার ছবি জুড়িয়া দেয় তবে সে ছবি মানুষের কাছে সম্পূর্ণ হইয়া ওঠে।

• হয় তপস্যা করো, নয় তপস্যার আড়ম্বর ছাড়ো।

• ছুটি কি এতই সহজে দেওয়া যায়। ছুটি কি একটা জিনিস। ছুটি যে ফাঁকা।

• ত্যাগ জিনিসটা শূন্যতা নয়, তা অধিকারের পূর্ণতা।

• মানুষকে দুঃখ দিয়া ঈশ্বর মানুষকে সার্থক করিয়াছেন; তাহাতে নিজের পূর্ণশক্তি অনুভব করিবার অধিকারী করিয়াছেন।

• মানুষ দুঃখ পায় দুঃখকে মানিয়া লইবার জন্য নয়, কিন্তু নূতন শক্তিতে নূতন নূতন রাস্তা বাহির করিবার জন্য। এমনি করিয়াই মানুষের এত উন্নতি হইয়াছে।


• যা কিছু নিয়ে মন চিন্তা করতে বাধ্য হয়, কিছুতেই ছাড় পায় না, তাকেই বলে দুশ্চিন্তা । 

• য়ুরোপিয় সভ্যতা প্রথম থেকেই নগরে সংহত হবার পথ খুঁজেছে। নগরে মানুষের সুযোগ হয় বড়, সম্বন্ধ হয় খাটো। নগর অতিবৃহৎ, মানুষ সেখানে বিক্ষিপ্ত, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য একান্ত, প্রতিযোগিতার মন্থন প্রবল। ঐশ্বর্য সেখানে ধনী-নির্ধনের বিভাগকে বাড়িয়ে তোলে এবং চ্যারিটির দ্বারা যেটুকু যোগসাধন হয় তাতে সান্ত্বনা নেই, সন্মান নেই । • সায়ান্সেই বলো আর অর্টই বলো নিরাসক্ত মনই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ বাহন, য়ুরোপ সায়ান্সেই সেটা পেয়েছে, কিন্তু সাহিত্যে পায়নি।

• মহত্বকে পদে পদে নিন্দার কাঁটা মাড়াইয়া চলিতে হয়। ইহাতে যে হার মানে, বীরের সম্প্রতি সে লাভ করে না। পৃথিবীতে নিন্দা দোষীকে সংশোধন করিবার জন্য আছে তাহা নহে, মহত্বকে গৌরব দেওয়া তাহার একটা মস্ত কাজ।

•মৃত্যুর দিন ঘনিয়ে আসছে আর আমাদের মনে ভয় জেগে উঠছে যে, পরকালে গিয়ে বুঝি এখানকার কাজের হিসাব দিতে হবে। না, সে ভয় একেবারেই সত্য নয়। তিনি যে কোনোদিন আমাদের শাস্তি দেবেন তা নয়। তিনি এমনি করে অপেক্ষা করে থাকবেন। তিনি কুঁড়ির দিকে চোখ মেলে থাকবেন কবে সেই কুঁড়ি ফুটবে। যতক্ষণ কুঁড়ি না ফুটছে ততক্ষণ তাঁর পূজার অর্ঘ্য ভরছেনা, তারই জন্য তিনি যুগ-যুগান্তর ধরে অপেক্ষা করে রয়েছেন।


rabindra nath tagore bani


• অতিরিক্ত বাহ্যসুখপ্রিয়তাকেই বিলাসিতা বলে, তেমনি অতিরিক্ত বাহ্যপবিত্রতা-প্রিয়তাকে আধ্যাত্মিক বিলাসিতা বলে।

• হে অন্তর্যামী। আমার বাহিরের আমার গোচর অগোচর যত কিছু পাপ যত কিছু অপরাধ এই কারণেই অসহ্য যে আমি তাহার দ্বারা সমস্ত মানুষকেই বাঞ্চনা করিতেছি, আমার যে সকল বন্ধন সমস্ত মানুষেরই মুক্তির অন্তরায়; আমার নিজের নিজত্বের চেয়ে যে বড় মহত্ব আমার ওপর তুমি অর্পণ করিয়াছ, আমার সমস্ত পাপ তাহাকেই স্পর্শ করিতেছে, এইজন্যই পাপ এত নিদারুণ, এত ঘৃণ্য; তাহাকে আমার যত গোপনই করি তাহা গোপনের নহে, কোন্ একটি সুগভীর যোগের ভিতর দিয়া তাহা সমস্ত মানুষকে আঘাত করিতেছে, সমস্ত মানুষের তপস্যাকেই ম্লান করিয়া দিতেছে।

• দুই পক্ষের সততায় তবেই বিবাহবন্ধন সত্য। সুরে-বাঁধা এসরাজের কোনো মানেই থাকে না যদি বাজাবার হাতটা হয় বেসুরো

• পুরুষকে বশ করবার শক্তি আমার হাতে আছে একথা মনে করেই কি নারীর সুখ, না তাতেই নারীর কল্যাণ? ভক্তির মধ্যে সেই গর্বকে ভাসিয়া দিয়ে তবেই তার রক্ষা।



• এক বই হইতে আর এক বই উৎপন্ন হইতেছে, এক কাব্যগ্রন্থ হইতে আর এক কাব্যগ্রন্থের জন্ম, একজনের মত মুখে মুখে সহস্র লোকের মত হইয়া, দাঁড়াইতেছে, অনুরকরণ হইতে অনুকরণের প্রবাহ চলিয়াছে—এমনি করিয়া পুঁথি ও কথার অরণ্য মানুষের চারিদিকে নিবিড় হইয়া উঠিতেছে। প্রাকৃতিক জগতের সঙ্গে ইহার সম্বন্ধ ক্রমশই দূরে চলিয়া যাইতেছে। মানুষের অনেকগুলি মনের ভাব উৎপন্ন হইতেছে যাহা কেবল পুঁথির সৃষ্টি। এই সকল বাস্তবতাবর্জিত ভাবগুলা ভূতের মতো মানুষকে পাইয়া বসে।

• জ্ঞানে এবং ভোগে এবং কর্মে ব্রহ্মকে স্বীকার করিলেই তাঁহাকে সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করা হয়। সেই রূপ সর্বাঙ্গীণভাবে ব্ৰহ্মকে উপলব্ধি করিবার একমাত্র স্থান এই সংসার—আমাদের এই কর্মক্ষেত্র, ইহাই আমাদের ধর্মক্ষেত্র, ইহাই ব্রহ্মের মন্দির ।

• ভগবান আমাদের দিতেই পারেন, কিন্তু নিতে যে হয় নিজের গুণে। 

• ভক্তিতে মানুষকে সমান হবার বাধা দেয় না। ভক্তিতে মানুষকে ওপরের দিকে তুলে সমান করতে চায়।

• অস্থানে ভক্তি করিবার একটা মহৎ পাপ এই যে, যিনি যথার্থ পূজ্য, অযোগ্য পাত্রদের সহিত তাঁহাকে একাসনভুক্ত করিয়া দেওয়া হয়। নিশিদিন ভরসা রাখিস, ওরে মন হবেই হবে।

• বিধাতার রাজ্যে ভালো জিনিস অল্প হয় বলেই তা ভালো, নইলে সে নিজেরই ভিড়ের ঠেলায় হয়ে যেত মাঝারি।



• যা আমার ভালো লাগে তাই আর একজনের ভালো লাগে না, এই নিয়েই পৃথিবীতে যত রক্তপাত।

• সাধারণকেই অসাধরণ করে আবিষ্কার করে ভালোবাসা।

• পুরুষের ভালোবাসাই মেয়েদের বল, তাহাদের জীবন ব্যবসায়ের মূলধন।

• ভালোবাসা ব্যতীত ভক্তি হতেই পারে না। ভক্তি হতে যদি ভালোবাসা উঠাইয়া লওয়া যায় তাবে শুদ্ধ কেবল শাসনভয় মাত্র অবশিষ্ট থাকে।

• শুধু চোখের দৃষ্টি নহে, তাহার পিছনে মনের দৃষ্টি যোগ না দিলে সৌন্দর্যকে বড় করিয়া দেখা যায় না। এই মনের দৃষ্টি লাভ করা বিশেষ শিক্ষার কর্ম।

• মানুষের মন যখন অত্যন্ত জোরে কিছু একটাতে গিয়া ঠেকে তখন আপনিই তার শরীরের সমস্ত প্রয়োজন কমিয়া যায়। সেইজন্যই দুঃখে কিংবা বড় আনন্দে মানুষের ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকে না। ভালোবাসাই হচ্ছে পূর্ণতা, তার যা আকাঙ্খা সে তো দরিদ্রের কাঙালপনা নয়, দেবতা যখন তাঁর ভক্তকে ভালোবাসেন তখনই আসেন ভক্তের দ্বারে ভিক্ষা চাইতে।

• যাঁর আত্মা বড়, তিনিই মহাত্মা! ... মহাত্মা তিনিই সকলের সুখ-দুঃখ যিনি আপনার করে নিয়েছেন, সকলের ভালোকে যিনি আপনার ভালো বলে জানেন ।

• বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয় অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ।

• নীচের তলটা হঠাৎ উপরেরতলা হয়ে ওঠাকে বলে প্রলয়। ভূমিকম্পে মাটির মধ্যে সেই চেষ্টাতেই তো বিভীষিকা। যা বারবার প্রচ্ছন্ন আছে তাই প্রকাশ হবার সময়টাই যুগান্তরের সময়।

• নিরুদ্যমই প্রকৃত মৃত্যু।

• মোহ জিনিসটা থাকে অতীতকে আর ভবিষ্যৎকে জড়িয়ে। বর্তমানকে পথ ভোলাবার ওস্তাদ হচ্ছে তারা।



• রসের ওজন আয়তনে নয়। সমস্ত গাছ একদিকে, একটি ফুল একদিকে, তবু ওজন ঠিক থাকে। অসীম অন্ধকার একদিকে, একটি তারা একদিকে, তাতেও ওজনের ভুল হয় না। ভেবে দেখুন এ সংসারের বিরহের সরোবর চারদিকে ছলছল করছে, মিলনপদ্মটি তারই বুকের একটি দুর্লভ ধন।

• যা সত্য তাই আমাদের আনন্দ দেয়, আর যা আনন্দ দেয় তাই সুন্দর। শিক্ষার মধ্যে বিশ্বের আনন্দ সুর ক্রমে লাগিতেছে—সেখানে বাঁশের জায়গা ক্রমেই বাঁশি দখল করিল।

• চারদিকে সত্যের রহস্য মূক হয়ে আছে।

• সাহিত্যের চিত্রশালায় যেখানে জীবনশিল্পীর নৈপুণ্য উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সেখানে মৃত্যুর প্রবেশদ্বার রুদ্ধ।

• ফ্যাশন হল মুখোস, স্টাইল হল মুখশ্রী।

• সুন্দরের জবাব সুন্দরই পায়। অসুন্দর যখন জবাব ছিনিয়ে নিতে চায় বীণার তার বাজে না, ছিঁড়ে যায় ।

• প্রত্যেক মানুষের পক্ষে মানুষ হওয়া প্রথম দরকার। অর্থাৎ, মানুষের সঙ্গে মানুষের যে লক্ষ লক্ষ সম্পর্ক সূত্র আছে, যার দ্বারা প্রতিনিয়ত আমরা শিকড়ের মতো বিচিত্র রসাকর্ষণ করছি, সেইগুলোর জীবনীশক্তি বাড়িয়ে তোলা, তা নূতন নূতন ক্ষমতা আবিষ্কার করা, চিরস্থায়ী মনুষ্যত্বের সঙ্গে আমদের ঘনিষ্ঠ যোগসাধন করে ক্ষুদ্র মানুষকে বৃহৎ করে তোলা—সাহিত্য এমনি করে আমাদের মানুষ করেছে।

• যাত্রা করবার মানেই মনের মধ্যে চলার বেগ সঞ্চার করা।

• আমাদের অন্তরের মধ্যে যে রাজা আছেন তাকে শ্রদ্ধা করি না বলেই তো তাঁর রাজত্ব তিনি চালাতে পারছেন না।



• ভাষার একটা প্রকাশ মননের দিকে এবং জ্ঞানের তথ্যসংগ্রহের দিকে, অর্থাৎ বিজ্ঞানে, তত্বজ্ঞানে, ইতিহাসে, আর একটা প্রকাশ ভাবের বাহনরূপে, রসসৃষ্টিতে। এই শোষোক্ত ভাষাকেই বিশেষ করে বলা যায় সাহিত্যের ভাষা।

• রাজা সবারে দেন মান,

সে মান আপনি ফিরে পান।

• নেই যে রে ভয় ত্রিভুবনে, ভয় শুধু তোর নিজের মনে। মিলনের মধ্যে যে সত্য তাহা কেবল বিজ্ঞান নহে, তাহা আনন্দ, তাহা রসস্বরূপ,তাহা প্রেম। তাহা আংশিক নহে, তাহা সমগ্র; কারণ তাহা কেবল বুদ্ধি নহে, তাহা হৃদয়কেও পূর্ণ করে।

• প্রেমের মধ্যে ভয় না থাকলে তার রস হালকা হয়ে যায়

• মানুষ বই হইয়া উঠিবার চেষ্টা করিলে তাহাতে মানুষের স্বাদ নষ্ট হইয়া যায়।

• প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে মানুষের জ্ঞানের সহযোগিতা আছ, বিজ্ঞান ইহাই প্রমাণ করে। প্রকৃতির নিয়মের সাহায্যেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের অধীনতা কাটাইয়া মানুষ আপনা ধর্ম-বিবেকের স্বাধীন নির্বাচনের গৌরব লাভ করিতে পারে, ইহাই বিজ্ঞানের শিক্ষা।

• ধর্মবক্তৃতায় যদি ক্ষণকালের জন্য মনকে একটু ভিজায় কিন্তু তাহা গড়াইয়া চলিয়া যায়—মধ্যাহ্নের পিপাসায়, গৃহদাহের দুর্বিপাকে তাহাকে খুঁজিয়া পাই না। তা ছাড়া মন জিনিসটা কতকটা জলের মতো, তাহাকে কেবল একদিকে চাপিয়া ধরিলেই ধরা যায় না, তাহাকে সকল দিক দিয়া ঘিরিয়া ধরিতে হয়।

• দৈনই বল, অজ্ঞাতাই বল, মৃঢ়তাই বল, মনুষ্যচরিত্রে ভয়ের মতো ছোট আর কিছুই নাই। ভয় নাই বলিয়া সে লোক মিথ্যা অহংকারও করে, অন্তত তাহার লজ্জা আছে, এই সদ্‌গুণটারও প্রমাণ হয়। নরনারীর প্রেমের এই যে একটি মোহিনীশক্তি আছে, যে শক্তি বলে সে মুহূর্তের মধ্যে জগতের সমস্ত চন্দ্রসূর্যতারা পুষ্পকানন নদনদীকে একসূত্রে টানিয়া মধুরভাবে উজ্জ্বলভাবে আপনার চতুর্দিকে সাজাইয়া আনে, যে প্রেমের শক্তি আকস্মিক অনির্বচনীয় আবির্ভাবের দ্বারা এতদিনকার বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত উপেক্ষিত বিশ্বজগৎকে চক্ষের পলকে সম্পূর্ণরূপে কৃতার্থ করিয়া তোলে—সেই শক্তিকে যুগে যুগে দেশে দেশে মনুষ্য অধ্যাত্মশক্তির রূপক বলিয়া অনুভব ও বর্ণনা করিয়াছে।

• আনন্দের চেয়ে দুঃখের বন্ধন দৃঢ়তর।


• শাস্তি পরের নিকট হইতে অপরাধের প্রতিফল, প্রায়শ্চিত্ত নিজের দ্বার অপরাধের সংশোধন।

• আমাদের প্রার্থনা সকল সময়ে সত্য হয় না, অনেক সময়ে মুখের কথা হয়—কারণ চারিদিকে অসত্যের দ্বারা পরিবৃত হয়ে থাকি বলে আমাদের বাণীতে সত্যের তেজ পৌঁছায় না।

• এমন দুঃখ আছে যাকে ভোলার মতো দুঃখ আর নেই। 

• সমস্ত পৃথিবীর সঙ্গে দেনাপাওনা করিয়া তবে আমরা মানুষ হইতে পারিব।

• আত্মা যেদিন অমৃতের জন্য কেঁদে ওঠে তখন সর্বপ্রথমেই বলে, ‘অসতো মা সদ্‌গময়'—আমার জীবনকে, আমার চিত্তকে, সমস্ত উচ্ছৃঙ্খল, অসত্য হতে সত্যে বেঁধে ফেলো-অমৃতের কথা তার পরে আমাদেরও প্রতিদিন সেই প্রার্থনাই করতে হবে।

• বিরাম কাজেরই অঙ্গ এক সাথে গাঁথা নয়নের অংশ যে নয়নের পাতা

• জ্ঞান যাহা জানে তাহা প্রকৃত জানাই নয়, প্রেম যাহা জানে তাহাই যথার্থ জানা।

• ভোগের ফুলের মাঝখানে একটি কীট আছে, যে কীট আমি, এই অসত্য আমি—সে ফুলে ফল ধরে না ।

অধীনতা জিনিসটা যে কতো বড় মহিমান্বিতা বৈষ্ণবধর্মে সেইটে দেখিয়েছে। অদ্ভুত সাহসের সঙ্গে অসংকোচে বলেছে, ভগবান জীবের কাছে নিজেকে বাঁধা রেখেছেন—সেই পরম গৌরবের ওপরেই জীবের অস্তিত্ব। আমাদের পরম অভিমান এই যে, তিনি আমাদের ছেড়ে থাকতে পারেননি—এই বন্ধনটি তিনি মেনেছেন- নইলে আমরা আছি কী করে?

• অবকাশ হচ্ছে বিরাটের সিংহাসন। অসীম অবকাশের মধ্যে বিশ্বের প্রতিষ্ঠা।

• মানুষ আপনার সত্যের অনুভবে সত্যকে সর্বত্র দেখছে, আপনার জ্ঞানের আলোকে জ্ঞানকে সর্বত্র জানছে। তেমনি আপনার আনন্দের মধ্যে মানুষ অনন্তের পরিচয় পেয়েছে। তারই থেকে বলছে : ‘অনন্তং ব্ৰহ্ম’

• কোথা সেই পরিচয় ? আমাদের মধ্যে অনন্ত সেখানেই যেখানে আমরা আপনাকে দান করে আনন্দ পাই। দানের দ্বার যেখানে আমাদের কেবলমাত্র ক্ষতি সেইখানেই আমাদের দারিদ্র্য, আমাদের সীমা, সেখানে আমরা কৃপণ। কিন্তু দানই যেখানে লাভ, ত্যাগই যেখানে পুরস্কার, সেখানেই আমরা আমাদের ঐশ্বর্যকে জানি, আমাদের অনন্তকে পাই।

• অবকাশ পদার্থটা হচ্ছে সময়ধন-সংসারী এই ধনটাকে নিজের ঘরসংসারের চিন্তায় ও কাজে লাগায়, আর কুঁড়ে যে সে কোনো কাজেই লাগায় না। আমার অবকাশের অনেকটা অংশ আমি কুঁড়েমিতেই খাটাই, বাইরে থেকে কেউ কেউ এমন সন্দেহ করে। এ কথাটা জানে না যে কুড়োমিটাই আমার কাজের প্রধান অংশ নয়, বস্তুত সেটাই তার গৌণ, যতটা তার ফাঁক ততটাই তার মুখ্য অংশ। ওই ফাঁকটাই রসে ভরতি হয় পোড়া চিনেমাটি উপলক্ষ মাত্ৰ মরার পরে অল্প লোকই অমর হইয়া থাকেন। সেইজন্যে পৃথিবীটা বাসযোগ্য হইয়াছে।

• সুবৃহৎ অনাবরণের মধ্যে অশ্লীলতা নেই। এইজন্যে শেকসপিয়র অশ্লীল নয়, রামায়ণ, মহাভারত অশ্লীল নয়। কিন্তু ভারতচন্দ্র অশ্লীল, জোলা অশ্লীল, কেননা তা কেবলমাত্র আংশিক অনাবরণ।

• ‘আমার জন্যই সমস্ত এবং আমি কাহার জন্যও নহি'। এ অবস্থায় যথেষ্ট অহংকার আছে, কিন্তু পরিতৃপ্তি কিছুই নাই।



• ইচ্ছার এই যে স্বাভাবিক ধর্ম যে অন্য ইচ্ছা সে চায়, কেবল জোরের ওপর তার আনন্দ নেই।

• যাহা তথ্য হিসাবে মিথ্যা অথবা অতিরঞ্জিত, যাহা কেবল স্থানীয় বিশ্বাসরূপে প্রচলিত তাহার মধ্যে অনেক ঐতিহাসিক সত্য পাওয়া যায়। কারণ ইতিহাস কেবলমাত্র তথ্যের ইতিহাস নহে, তাহা মানবমনের ইতিহাস, বিশ্বাসের ইতহাস ।

• কাল ছিল ডাল খালি

আজ ফুলে যায় ভরে,

বল্ দেখি তুই মালি

হয় সে কেমন করে ?

• অযোগ্য লোককে উচ্চপদে বসানো তাহকে অপদস্থ করিবারই উপায় ৷

• ঈর্ষা জিনিসটার মধ্যে একটি সত্য আছে, সে হচ্ছে এই যে, যা-কিছু সুখের সেটি সকলের পাওয়া উচিত ছিল।

• উপকরণের বাহুল্য দ্বারা মানুষ আত্মার সুসম্পূর্ণ ঐক্য-উপলব্ধি থেকে বঞ্চিত হয়। তার অধিকাংশ চিন্তা চেষ্টা খণ্ডিতভাবে বহুল সঞ্চয়ের মধ্যে বাহিরে বিক্ষিপ্ত হতে থাকে।

• ঈশ্বরের ইচ্ছার মধ্যে ব্যস্ততা নাই কিন্তু অমোঘতা আছে।

• সৃষ্টির দ্বারাই উপলব্ধি সত্য হয়।

• বর্ষা ঋতুটা বিশেষভাবে কবির ঋতু। কেননা কবি গীতার উপদেশকে ছাড়াইয়া গেছে। তাহার কর্মেও অধিকার নাই, ফলেও অধিকার নাই, তাহার অধিকার ছুটিতে—কর্ম হইতে ছুটি, ফল হইতে ছুটি।

• কবিতা উভচর, ছবির মধ্যেও চলে, গানের মধেও ওড়ে। কেননা কবিতার উপকরণ হচ্ছে ভাষা। ভাষার একটি দিকে অর্থ, আর একটি দিকে সুর। এই অর্থের যোগে ছবি গড়ে ওঠে, সুরের যোগে গান। যিনি প্রাণের মধ্যে প্রবেশ করিয়া কবি হইয়াছেন তিনি সহজে কথার কবি, সহজ ভাবের কবি।

• যেখানে চিত্তের সত্য উদ্‌বোধন হয়, সেখানে সত্যকর্ম আপনি প্রকাশ পায়।


• সীমার মাঝে অসীম তুমি

বাজাও আপন সুর,

আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ

তাই এত মধুর।

• ধর্ম সেই সঙ্গীতশালা যেখানে পিতা তাহার পুত্রকে গান শিখাইতেছেন,

• পরমাত্মা হইতে আত্মায় সুর সঞ্চারিত হইতেছে। তারই দীক্ষার দরকার যার মুক্তির দরকার।

• মানুষের যে শ্রেষ্ঠরূপ যে মঙ্গলরূপ তাহা এই নামদেহটির দ্বারাই আপনাকে চিহ্নিত করে। এই নামকরণের মধ্যে সমস্ত মানব সমাজের একটি আশা আছে, একটি আর্শীবাদ আছে—এই নামিটি যেন নষ্ট না হয়, ম্লান না হয়, এই নামটি যেন ধন্য হয়, এই নামটি যেন মাধুর্যে ও পবিত্রতায় মানুষের হৃদয়ের মধ্যে অমরতা লাভ করে। যখন ইহার রূপের দেহটি একদিন বিদায় লইবে তখনও ইহার নামের দেহটি মানব সমাজের মর্মস্থানটিতে যেন উজ্জ্বল হইয়া বিরাজ করে।

• যা পাব তা পথেই পাব।

• সাধনায় যাঁকে পাওয়া যায় তাঁর ভক্তিকেই আমরা ভক্তি বলি, কিন্তু নিষ্ঠা হচ্ছে সাধনারই প্রতি ভক্তি।

• পূণ্য হই সে চলার স্নানে।

• পুরুষ আধিপত্য ছেড়ে দিলেই মেয়ে আধিপত্য শুরু করবে। দুর্বলের আধিপত্য অতি ভয়ংকর।

• পূর্ণতার জন্য রিক্ততা সবচেয়ে দরকারি, বস্তুবাহুল্য জীবন বিকাশের প্রধান বাধা।

• দৈন্য জিনিসটা জটিল মিশ্র জিনিস। আর এ জিনিসটা উৎপত্তির কারণ আছে আমাদের জ্ঞানের অভাব, বুদ্ধির ত্রুটিতে, প্রথার দোষে ও চরিত্রের দুর্বলতায়।

• দুঃখের অভিজ্ঞতায় আমাদের চেতনা আলোড়িত হয়ে ওঠে। দুঃখের কটু স্বাদে দুই চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকলেও তা উপাদেয়। দুঃখের অনুভূতি সহজ আরামবোধের চেয়ে প্রবলতর। ট্রাজেডির মূল এই নিয়ে

• যে ধর্ম অপমান করে সে ধর্ম মিথ্যা।

• কত অজানারে জানাইলে তুমি,

কত ঘরে দিলে ঠাঁই

দূরকে করিলে নিকট বন্ধু

পরকে করিলে ভাই।

• নৃত্যের কোনো একটি ভঙ্গিও স্থির হয়ে থাকে না, কেবলই তা নানা খানা হয়ে উঠছে। তবু যে দেখছে সে আনন্দিত হয়ে বলছে, ‘আমি নাচ দেখছি।' নাচের সমস্ত অনিত্য ভঙ্গিই তালে মানে বাঁধা একটি নিরবচ্ছিন্ন সত্যকে প্রকাশ করছে। আমরা নাচের নানা ভঙ্গিকে মুখ্য করে দেখছি নে, আমরা দেখছি তার সেই সত্যটিকে, তাই খুশি হয়ে উঠছি।

• আমাদের দেশের পুরুষেরা গৃহপালিত, মাতৃপালিত, পত্নীচালিত। যাহারা নকল করিয়া শেখে তাহারা নকলের বাহিরে কিছুই দেখিতে পায় না।

• একদিন যে পৃথিবীর অতি পুরাতন দিন, এক প্রত্যহ প্রভাতে নূতন করে জন্মলাভ করতে হয়। প্রত্যহই একবার করে তাকে আদিতে ফিরে আসতে হয়, নইলে তার মূল সুরটি হারিয়ে যায়।

• পাখির পাখাও বাতাসের সঙ্গে মিল করে চলে, তাই এমন তার সুষমা।




• যে-কোনো সমাজই কর্মকাণ্ডকে জ্ঞানকাণ্ডের ওপরে বসিয়েছে সেইখানেই মানুষের সকল বিষয়ে পরাভব।

• তার্কিক বন্ধুদিগের সহবাসে থাকিলে প্রাণের উদারতা সঙ্গীর্ণ হইতে থাকে।

• জীবনে যত পূজা

হল না সারা

জানি হে জানি, তাও

হয়নি হারা।

• যথার্থ জানাই ভালোবাসা।

• গ্রহণ করা বর্জন করা জীবনের একটি প্রধান লক্ষণ।

• বিশ্বজগৎ অনন্ত আকাশের উপরে আছে বলিয়াই অর্থাৎ তাহা খানিকটা করিয়া আছে, ও খানিকটা করিয়া নাই বলিয়াই তাহার ছোট বড় নানা আকৃতি আয়তন লইয়া তাহাকে এমন বিচিত্র করিয়া দেখিতেছি। কিন্তু জগৎ যদি আকাশে না থাকিয়া একেবারে আমাদের চোখের উপরে চাপিয়া থাকিত—তাহা হইলে ছোটও বা বড়ও তা, বাঁকাও যেমন সোজাও তেমন।

• সেই পাওয়াতেই মানুষের মন আনন্দিত যে পাওয়ার সঙ্গে না-পাওয়া জড়িত হয়ে আছে।

• বুদ্ধির জড়তা ও সংকীর্ণতা সকল দেশেই সকল কালেই গ্রাম্যতার নামান্তর হয়ে আছে।

• পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়,

পথের দু'ধারে আছে মোর দেবালয়।

• তপোবন স্থানটি এমন যেখানে স্বভাব এবং তপস্যা, সৌন্দর্য এবং সংযম একত্র মিলিত হইয়াছে। সেখানে সমাজের কৃত্রিম বিধান নাই, অথচ ধর্মের কঠোর নিয়ম বিরাজমান।

• মানুষের মৃত্যুর পরে তার জীবনী লেখা হয় তার কারণ, একদিকে সংসারে সে মরে, আর একদিকে মানুষের মনে সে নিবিড় করে বেঁচে ওঠে। জ্ঞানের দ্বারা জানা যায় মাত্র, প্রেমের দ্বারা পাওয়া যায়। জ্ঞানেতেই বৃদ্ধ করিয়া দেয়, প্রেমেতেই যৌবন জিয়াইয়া রাখে।

• গ্রাম্যতা হচ্ছে সেইরকম সংস্কার, বিদ্যা, বুদ্ধি, বিশ্বাস ও কর্ম যা গ্রামসীমার বাইরের সঙ্গে বিযুক্ত–বর্তমান যুগের যে প্রকৃতি তার সঙ্গে যা কেবলমাত্র পৃথক নয়, যা বিরুদ্ধ।

• আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন।

• মানুষের মধ্যে দ্বিজত্ব আছে, একবার জন্মায় গর্ভের মধ্যে, আবার জন্মায় মুক্ত পৃথিবীতে। তেমনি আর একদিক দিয়ে মানুষের একজন্ম আপনাকে নিয়ে আর-এক জন্ম সকলকে নিয়ে।

• গায়কের সার্থকতা কথার ফাঁকে, লেখকের সার্থকতা কথার ঝাঁকে। আমাদের জানা দু'রকমের—জ্ঞানে জানা আর অনুভবে জানা । আমরা জগৎকে কেবল তার কোনো একটি মাত্র দিক থেকে দেখি তখন গতি এবং আঘাত এবং বিনাশ দেখি, কিন্তু সমগ্রকে যখন দেখি তখন দেখতে পাই নিস্তদ্ধ সামঞ্জস্য।

• চলার পদ্ধতির মধ্যে অবিবেচনার বেগও দরকার, বিবেচনার সংযমও আবশ্যক।

• ছবিতে যে আনন্দ, সে হচ্ছে সুপরিমিতির আনন্দ, রেখার সংযমে সুনির্দিষ্টকে সুস্পষ্ট করে দেখি—মন বলে ওঠে; নিশ্চিত দেখতে পেলুম, তা সে যাকেই দেখি না কেন, এক টুকরো পাথর, একটা গাধা, একটা কাঁটাগাছ, একজন বুড়ি, যাই হোক।

• আমাদের চক্ষুর স্বভাবই হচ্ছে সে কোনো জিনিস ভেঙে ভেঙে দেখে না, একেবারে সমগ্র করে দেখে। আমাদের আত্মবোধের দৃষ্টি যখন খুলে যায় তখন সেও তেমনি অত্যন্ত সহজেই আপনাকে এক করে এবং পরম একের সঙ্গে আনন্দে সম্মিলিত করে দেখতে পায়।

• ঘুম পাড়িয়ে রাখার সুবিধা এই যে তাতে দেহের প্রাণটা টিকে থাকে, কিন্তু মনের বেগটা হয় একেবারে বন্ধ হয়ে যায়, নয় সে অদ্ভুত স্বপ্নের পথহীন ও লক্ষ্যহীন অন্ধলোকে বিচরণ করে।


• ঈশ্বরের সঙ্গে আমাদের যে গ্রন্থিবন্ধনের প্রয়োজন আছে মন্ত্র তার সহায়তা করে। এই মন্ত্রকে অবলম্বন করে আমরা তার সঙ্গে একটা কোনো বিশেষ সম্বন্ধ পাকা করে নেব।

• জীবনের তত্ত্বই হচ্ছে মরণের ভিতর দিয়ে নতুনকে কেবলই প্রকাশ করা।

• গম্ভীর্য নির্বোধের মুখোশ।

• যখন আমাদের চোখে দেখার সঙ্গে বিশ্বের আলোকের যোগ হয় যখন আমাদের কানে-শোনার সঙ্গে বিশ্বের গানের মিলন ঘটে, যখন আমাদের স্পর্শস্নায়ুর তন্তুতে তন্তুতে বিশ্বের কত হাজার রকম আঘাতের ঢেউ আমাদের চেতনার ওপরে ঢেউ খেলিয়ে উঠতে থাকে তখন আমাদের জাগা——আমাদের শক্তির সঙ্গে যখন বিশ্বের শক্তির যোগ দুই দিক থেকেই সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে তখনি জাগা।

• শিশু শত সহস্র বৎসর পূর্বে যেমন ছিল; আজও তেমনি আছে, সেই অপরিবর্তনীয় পুরাতন বারম্বার মানবের ঘরে শিশুমূর্তি ধরিয়া জন্মগ্রহণ করিতেছে, অথচ সর্বপ্রথম দিনে সে যেমন নবীন, যেমন সুকুমার, যেমন মূঢ়, যেমন মধুর ছিল, আজও ঠিক তেমনি আছে। এই নবীন চিরত্বের কারণ এই যে, শিশুপ্রকৃতির সৃজন; কিন্তু বয়স্ক মানুষ বহুল পরিমাণে মানুষের নিজকৃত রচনা। তেমনি ছড়াগুলিও শিশুসাহিত্য, তাহারা মানব-মনে আপনি জন্মিয়াছে।

• অসীম যেখানে সীমার মধ্যে সেখানে ছবি, অসীম যেখানে সীমাহীনতায় সেখানে গান। রূপ-রাজ্যের কলা ছবি, অপরূপ রাজ্যের কলা গান।

• কলহ অক্ষমের উত্তেজনা প্রকাশ, তাহা অকর্মণ্যের একপ্রকার আত্মবিনোদন।

• যদি মানুষ গল্পের আসরে আসে, তবে সে গল্পই শুনতে চাইবে, যদি প্রকৃতিস্থ থাকে। এই গল্পের বাহন কী, না, সজীব মানব-চরিত্র। আমরা তাকে একান্ত সত্যরূপে চিনতে চাই, অর্থাৎ আমার মধ্যে যে ব্যাক্তিটা আছে সে সম্পূর্ণভাবে ব্যাক্তিরই পরিচয় নিতে উৎসুক।

•  বাহিরের হাটে বস্তুর দর কেবলই উঠানামা করিতেছে—সেখানে নানা মুনির নানা মত, নানা লেখকের নানা ফরমাশ, নানা কালের নানা ফ্যাশান। বাস্তবের সেই হট্টগোলের মধ্যে পড়িলে কবির কাব্য হাটের কাব্য হইবে। তাঁহার অন্তরের মধ্যে যে ধ্রুব আদর্শ আছে তাহারই 'পরে নির্ভর করা ছাড়া অন্য উপায় নাই।

• ভয়ের শাসনের সীমা কোন্ পর্যন্ত সেইটের দ্বারাই দেশের মানুষ কতটা স্বাধীন জানা যায়।

• দানের মন্ত্রে স্ত্রীর যেটুকু পাওয়া যায় তাহাতে সংসার চলে, কিন্তু পনেরো-আনা বাকি থাকিয়া যায়। যা খুশি তাই বানিয়ে তোলা মাত্রাকেই সৃষ্টি বলে না। কোনো বিশ্বসত্যকে লাভ করার যোগে প্রকাশ ও প্রকাশ করার যোগে লাভ করাকেই বলে সৃষ্টি।

• সকল সভ্যতার আরম্ভেই সেই ঐক্যবুদ্ধি।

• সঙ্গীতের সঙ্গে কাব্যের একটা জায়গায় মিল নেই। সঙ্গীতের সমস্তটাই অনির্বচনীয়। কাব্যে বচনীয়তা আছে সে কথা বলা বাহুল্য ।


• সুখ জিনিসটা কেবল আমার, কল্যাণ জিনিসটা সমস্ত জগতের। সুন্দর কাকে বলি। বাইরে যা অকিঞ্চিৎকর, যখন দেখি তার আন্তরিক অর্থ তখন দেখি সুন্দরকে। একটি গোলাপ ফুল বাছুরের কাছে সুন্দর নয়। মানুষের কাছে সে সুন্দর, যে মানুষ তার কেবল পাপড়ি না, বোঁটা না, একটা সমগ্র আন্তরিক সার্থকতা পেয়েছে। সমাজ মানুষের সকলের চেয়ে বড়ো সৃষ্টি।

• সামাজিকতা হল লোকালয়ের প্রাণ ।

• সমাজ পরিবর্তনশলী, কিন্তু তাহার প্রতিষ্ঠাস্থল ধ্রুব হওয়া অবাশ্যক। আমরা জীবগণ চলিয়া বেড়াই, কিন্তু আমাদের পায়ের নীচেকার জমিও যদি চলিয়া বেড়াইত তাহা হইলে বিষম গোলযোগ বাধিত পৃথিবীর সমস্ত বড় বড় সভ্যতাই দুঃসাহসের সৃষ্টি। শক্তির দুঃসাহস, বুদ্ধির দুঃসাহস, আকাঙ্খার দুঃসাহস।

• আসল সত্যটা যে প্রত্যক্ষের উপরেই ভাসিয়া বেড়াইতেছে, তাহা নহে, অপ্রত্যক্ষের মধ্যেই ডুবিয়া আছে—এইজন্যই তাহাকে লইয়া এত তর্ক, এত দলাদলি ।

• জ্ঞানের ভিত্তি যদি শক্ত না হইত তবে তো সে কেবল খাপছাড়া স্বপ্ন হইত, আর আনন্দের ভিত্তি যদি শক্ত না হইত তবে তাহা নিতান্ত পাগলামি মাতলামি হইয়া উঠিত। এই যে শক্ত ভিত্তি ইহাই সংযম।

• কাব্যের বাহন বাক্য, সেই বাক্যের ছন্দ অংশ সঙ্গীতের বিশ্বজনীন নিয়মে চালিত; কিন্তু তার অর্থ অংশ কৃত্রিম, সেটা সমাজে পরস্পরের আপসে তৈরি করা সংকেত মাত্র। এই দুইয়ের যোগে কাব্য।

• কথা জিনিসটি মানুষেরই, আর গানটি প্রকৃতির। কথা সুস্পষ্ট এবং বিশেষ প্রয়োজনের দ্বারা সীমাবদ্ধ আর গান অস্পষ্ট এবং সীমাহীনের ব্যাকুলতায় উৎকণ্ঠিত। সেই জন্যে কথায় মানুষ মনুষ্যলোকের এবং গানে মানুষ বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মেলে। এই জন্যে কথার সঙ্গে মানুষ যখন সুরকে জুড়ে দেয় তখন সেই কথা আপনার অর্থকে আপনি ছাড়িয়ে গিয়ে ব্যাপ্ত হয়ে যায়—সেই সুরে মানুষের সুখ-দুঃখকে সমস্ত আকাশের জিনিস করে তোলে, তার বেদনা প্রভাত সন্ধ্যার দিগন্তে আপনার রঙ মিলিয়ে দেয়, জগতের বিরাট অব্যক্তের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বৃহৎ অপরূপতা লাভ করে, মানুষের সংসারের প্রাত্যহিক সুপরিচিত সংকীর্ণতার সঙ্গে তার ঐকান্তিক ঐক্য আর থাকে না।

Rabindranath-tagore-quotes


• যেমন বোঁটার সঙ্গে ফুল তেমনি ধনের সঙ্গে স্ত্রী। অর্থাৎ ধন থাকলে স্ত্রীকে গ্রহণ করবার সুবিধা হয়—নইলে তাকে বেশ সুচারুরূপে ধরে রখবার সুযোগ হয় না।

• মানুষ নির্মাণ করে প্রয়োজনে, সৃষ্টি করে আনন্দে।

• জগতে ঈশ্বরের এই যে অপরূপ রহস্যময় সৌন্দর্যের আয়োজন, এ আমাদের কাছে কোনো মাসুল, কোনো খাজনা আদায় করে না, এ আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাকে চায়—বলে, ‘আমাতে তোমাতে আনন্দ হোক, তুমি স্বতঃ আমাকে গ্রহণ করো।’

• বিচিত্রে বিচিত্রের এই সম্মিলন একটি অখণ্ড রূপের ঐক্য পেয়েছে, তাকেই বলে সৃষ্টি।

• সভ্যতা কী? আর কিছু নয়, যে অবস্থায় মানুষের এমন একটি যোগের ক্ষেত্র তৈরি হয়, যেখানো প্রতি মানুষের শক্তি সকল মানুষকে শক্তি দেয় এবং সকল মানুষের শক্তি প্রতি মানুষকে শক্তিমান করিয়া তোলে।

• নারীর প্রতি পুরুষের টান জিনিসটা প্রকৃতির স্বহস্তের ব্যবস্থা, তাই সেইটের জোর বাড়িয়ে তুলে ঘরের প্রতি টানটাকে মেয়েরা নিজে সৃষ্টি করেছে। এই ঘর বাঁধাটা সভ্যতার প্রথম বড় ভূমিকা, এইটেই সমাজ পত্তনের গোড়া। 

• সত্য সর্বাংশেই ব্যক্তিনিরপেক্ষ, শুভ্র নিরঞ্জন।

• বাতাস যখন স্তব্ধ তখন তাহা আগাগোড়া এক হইয়া আছে। সেই এককে বীণার তার দিয়া আঘাত কর, তাহা ভাঙ্গিয়া বহু হইয়া যাইবে। এই বহুর মধ্যে ধ্বনিগুলি যখন পরস্পর পরস্পরের ওজন মানিয়া চলে তখন তাহা সংগীত, তখনই একের সহিত অন্যের সুনিয়ত যোগ, তখন সমস্ত বহু তাহার বৈচিত্র্যের ভিতর দিয়া একই সংগীতকে প্রকাশ করে। ধ্বনি এখানে রূপ এবং ধ্বনির সুষমা যাহা সুর তাহাই প্রমাণ। ধ্বনির মধ্যে ভেদ, সুরের মধ্যে এক।


rabindranath-thakur-quotes-on-mother


• সীমা আপন সংযমের দ্বারা আপনাকে আড়াল করে সত্যকে প্রকাশ করে। সেইজন্য সকল কলাসৃষ্টিতেই সরলতার সংযম একটি প্রধান বস্তু। সংযম হচ্ছে সীমার তর্জনী দিয়ে অসীমকে নির্দেশ করা।

• মেয়েরা ঝড়ের মতো অন্যায় করতে পারে, সে অন্যায় ভয়ঙ্কর সুন্দর। পুরুষের অন্যায় কুশ্রী, কেননা তার ভিতরে ভিতরে ন্যায় বুদ্ধির পীড়া আছে।

• শ্রদ্ধাদিনের ভিতরকার কথাটি শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা শব্দের অর্থ বিশ্বাস ....গোচরে ও অগোচরেও যার উপর আমার বিশ্বাস, অটল তারই উপর আমার শ্রদ্ধা। মৃত্যুর অন্ধকারময় অন্তরালেও যাকে আমার সমস্ত চিত্ত সত্য বলে উপলব্ধি করছে তাকেই তো যথার্থ আমি সত্য বলে শ্রদ্ধা করি।

• শিশুর মধ্যে আমরা মুক্তির ছবি দেখতে পাই। মুক্তি বলতে কী বোঝায়। প্রকাশের পূর্ণতা। সে আপনাতে আপনি পরিব্যক্ত। তাকে দেখে আমাদের যে আনন্দ সে তার বাধামুক্ত সহজ প্রকাশে। মুনাফার নেশায় উন্মত্ত হয়ে এই বিশ্বব্যাপী দূতক্রীড়ায় মানুষ নিজেকে পণ রেখে কতদিন খেলা চালাবে? এ খেলা ভাঙতেই হবে। যে খেলায় মানুষ লাভ করবার লোভে নিজেকে লোকসান করে চলেছে, সে কখনোই চলবে না ।

• মাতাই শিশুকে জানিয়ে দিলে, বিশাল বিশ্বজগৎ তার আত্মীয়, নইলে মাতা তার আপন হত না ।

• কিন্তু মানুষ তো কেবল প্রাকৃতিক নয়, সে মানসিক। মানুষ তাই বিশ্বের ওপর অহরহ আপন মন প্রয়োগ করতে থাকে। বস্তু বিশ্বের সঙ্গে মনের সামঞ্জস্য ঘটিয়ে তোলে।



• মহাপুরুষরা যখন আসেন তখন বিরোধ নিয়েই আসেন, নইলে তাঁর আসার কোনো সার্থকতা নেই।

• বিবাহ এখনো সকল দেশেই ন্যূনাধিক পরিমাণে নারীকে বন্দি করে রাখবার পিঞ্জর।

• প্রতিভা মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের মতো আর মনুষ্যত্ব চরিত্রের দিবালোক, তাহা সর্বত্রব্যাপী ও স্থির।

• বিচারক আপন শাসনে বন্ধ, বন্দি হতে বেশি বন্দি।

• নিয়েমেই যেমন আনন্দের প্রকাশ, কর্মেই তেমনি আত্মায় মক্তি। এই বুঝি মেয়েদের স্বভাব—তাদের হৃদয়াবেগে যখন একদিকে প্রবল হয়ে জেগে ওঠে তখন অন্যদিকে তাদের আর কিছুই সাড় থাকে না।

• স্বার্থের সঞ্চয় যখন অভ্রভেদী হয়ে ওঠে তখন কামানের গোলা দিয়ে তাকে ভাঙতে হয়। তবে মুক্তি। তখন কান্নায় আকাশ ছেয়ে যায়, কিন্তু সেই কান্নার ধারা নইলে উত্তাপ দূর হবে কেমন করে ? মানুষ মাকড়সারই মতো। সে নিজের অন্তর থেকেই হাজার হাজার সূক্ষ্ম সূত্র বের কর জাল বাঁধে, নিজের অব্যবহিত পরিবেশের সঙ্গে নিজের বিশেষ সম্বন্ধ ধ্রুব করতে চেষ্টা করে।

• মানুষ আপন উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাক্তি সীমাকে পেরিয়ে বৃহৎ মানুষ হয়ে উঠছে, তার সমস্ত শ্রেষ্ঠ সাধনা এই বৃহৎ মানুষের সাধনা ।

• গঙ্গাকে কলকাতা কিংকরী করেছে, সখি করেনি, তাই অপমানিত নদী হারিয়েছে তার রূপলাবণ্য।

Rabindranath-tagorequotes-on-wife

• নিজের মধ্যে সজীব মনুষ্যত্ব থাকলে তবেই প্রাচীন এবং আধুনিক মনুষ্যত্বকে, পূর্ব ও পশ্চিমের মনুষ্যত্বকে নিজের ব্যবহারে আনতে পারা যায়।

• জগতে ঋতু আবর্তনের সর্বপ্রধান কাজ প্রেম জাগানো, ফুল-ফুটানো প্রভৃতি অন্য সমস্তই তাহার অনুষঙ্গিক।

• শিশুদের মধ্যেই পরিপূর্ণতার ব্যাঞ্জনা আছে। যে মানুষ বয়সে পাকা হইয়া অভ্যাসে, সংস্কারে ও অহমিকায় কঠিন হইয়া গেছে, সে মানুষ সেই পূর্ণতার ব্যঞ্জনা হারাইয়াছে, বিশ্বগুরুর কাছে আসা তার পক্ষে বড়ই কঠিন বিশ্বপ্রাণের আহ্বানে যখন বিশেষ প্রাণের মধ্যে তরঙ্গ ওঠে তখনই তো উৎসব।

• বিশেষ প্রয়োজনের সংকীর্ণ পাওয়াকেই আমারা লাভ বলি। ইতিহাসের ভিতর দিয়ে ইতিহাসের দেবতা তার পূজা গ্রহণ করবেন, এ যুদ্ধের মধ্যে তাঁর সেই উৎসব।

• পাখি যেমন অন্ধকারের প্রান্তে জ্যোতির স্পর্শ মাত্রে অকারণ আনন্দে গেয়ে ওঠে, তেমনি যেদিন পরম জ্যোতি তাকে স্পর্শ করেন, সেদিন মানুষও গেয়ে ওঠে। সেদিন সে বলে, “আমি অমৃতের পুত্র'। সে বলে, “ বেদাহমেতং। আমি পেয়েছি।'

• মাধুর্য বলতে কেউ যেন লালিত্য না বোঝেন। তার সঙ্গে ধৈর্যত্যাগ সংযমযুক্ত চরিত্রবল, সহজবুদ্ধি, সহজ নৈপুণ্য, চিন্তার ব্যবহারে, ভাবে ও ভঙ্গিতে শ্রী প্রভৃতি নানা গুণের মিশেল আছে, কিন্তু এর গূঢ় কেন্দ্রস্থলে আছে আনন্দ, যা আলোর মতো স্বাভাবই আপনাকে নিয়ত বিকীর্ণ করে, দান করে।

• একটি ছেলে আসিয়া মাকে পৃথিবীর সকল ছেলের মা করিয়া দেয়।


Rabindranath tagore Love quote


• তারাগুলি নিয়ে রাতি 

জেগে ছিল সারারাতি

নেমে এল পথ ভুলে

বেলফুলে জুঁইফুলে।

• প্রমাণ মানে না যে যুক্তি সেই তো কুযুক্তি।

• পুরুষ ভজনার জন্য কেন এই প্রবণতা? তার কারণ আর কিছুই নয়, নারী কামিনী ও জননী।। কামিনী হিসাবে আছে তার আদিম যৌনক্ষুধা, আর জননী হিসাবে আসে তার মাতৃত্বের গর্ব।

• বিশ্ব তাঁর আনন্দরূপ, কিন্তু আমরা রূপকে দেখছি, আনন্দকে দেখছি নে, সেইজন্য রূপ কেবল পদে পদে আমাদের আঘাত করছে। আনন্দকে যেমনি দেখব, অমনি কেউ আর আমাদের কোনো বাধা দিতে পারবে না। সেই তো মুক্তি। সেই মুকি বৈরাগ্যের মুক্তি নয়, সেই মুক্তি প্রেমের মুক্তি। ত্যাগের মুক্তি নয়, যোগের মুক্তি। লয়ের মুক্তি নয়, প্রকাশের মুক্তি।

• মানুষের মধ্যে দুটো দিক আছে, একদিকে সে স্বতন্ত্র, আর -একদিকে সে সকলের সঙ্গে যুক্ত।

• মানুষের সব গুরুতর সমস্যাই চিরকালের।

• মানুষের একপ্রান্ত তার বিশ্ব, অন্য প্রান্ত তার বিশেষত্ব। এই দুই নিয়ে তবে তার সম্পূর্ণতা, তার আনন্দ নিখুঁত সম্পূর্ণতা মানুষের জন্য নহে। কারণ সম্পূর্ণতার মধ্যে একটি সমাপ্তি আছে। ...মানুষের জীবনের পরিধি বহু বিস্তীর্ণ, এইজন্য বহুকাল পর্যন্ত সে অপরিণত, দুর্বল।

•মানুষ আপনাকে পাবার জন্য বেরিয়েছ—আপনাকে না পেলে, তার আপনার চেয়ে যিনি বড় আপন, তাঁকে পাবার জো নেই। তাই এই আপনাকে বিশুদ্ধ করে, প্রবল করে, পরিপূর্ণ করে, পাবার জন্য মানুষ কত তপস্যা করছে । 

• অতীতকাল ধরণীর মতো আমাদের অচল-প্রতিষ্ঠা করিয়া রাখে। যখন বাহিরে খরতাপ, আকাশ হইতে বৃষ্টি পড়ে না, তখন শিকড়ের প্রভাবে আমরা অতীতের অন্ধকার নিম্মতন দেশ হইতে রস আকর্ষণ করিতে পারি।

• অহংকার আমাদিগকে নিজের সংকীর্ণতার মধ্যে বদ্ধ করিয়া রাখে, যাহার ভক্তি নাই, সে জানে না অহংকারের অধিকার কত সংকীৰ্ণ, যাহার ভক্তি আছে সেই জানে আপনার বাহিরে যে বৃহত্ত্ব যে মহত্ত্ব তাহা অনুভব করাতেই মুক্তি।

• ছড়ার এই সকল অযত্নরচিত চিত্রগুলি কেবল যে বালকের সহজ সৃজনশক্তি দ্বার সৃজিত হইয়া উঠে তাহা নহে, তাহার অনেক স্থানে রেখার এমন সুস্পষ্টতা আছে যে, তাহারা আমাদের সংশয়ী চক্ষেও অতি সংক্ষেপ বর্ণনায় ত্বরিত-চিত্র আনিয়া উপস্থিত করে।

• এই ছবিগুলি একটি রেখা, একটি কথার ছবি। দেশলাই যেমন আঁচড়ে দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠে বালকের চিত্তে তেমনি একটি কথার টানে একটি সমগ্র চিত্র পালকের মধ্যে জাগাইয়া তুলিতে হয়। অংশ যোজনা করিয়া কিছু গড়িয়া তুলিলে চলিবে না। চিৎপুরের মাঠেতে বালি চিক্‌চিক্‌ করে। একটিমাত্র কথায় একটি বৃহৎ অনুর্বর মাঠ মধ্যাহ্নের রৌদ্রলোকে আমাদের দৃষ্টিপথে আসিয়া উদয় হয়।




রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৫০১ টি বাণী - 501 Bengali quotes by Rabindranath Tagore রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৫০১ টি বাণী  - 501 Bengali quotes by Rabindranath Tagore Reviewed by Wisdom Apps on মে ০৪, ২০২৩ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.