আকর্ষ-চিকিৎসা কি ? জেনে নিন

আকর্ষ-চিকিৎসা


আমেরিকা ও য়ুরোপে যাঁরা আকর্ষ-চিকিৎসক নামে খ্যাত , প্রাণের নিরাময়শক্তির প্রকাশ তাঁরাও করেছেন। তারা হয়তো এভাবে ভেবে দেখেননি যে, ঐ তথাকথিত ব্যক্তির আকর্ষশক্তি ভারতীয় যোগীদের কথিত 'প্রাণ' নামে অভিহিত জিবনীশক্তির প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছুই নয়। সুপ্রাচীন কাল হতে হিন্দু যোগীরা ঐ স্বাভাবিক নিরাময়শক্তির সাহায্যে রোগীর মুখের মধ্য দিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে অথবা দেহের রুগ্ন অংশে হাত রেখে, কিমবা শুধুমাত্র অঙ্গুলি পরশের দ্বারা অতি কঠিন ও দুশ্চিকিৎস্য রোগও সারিয়েছেন। একদা যীশু দু'টি অন্ধ লোকের চোখ ছুঁয়ে ঠিক ঐভাবে তাদের অন্ধতা মোচন করেছিলেন। মথি-লিখিত সুসমাচারে কথিত আছে, 'তারপর তোমাদের বিশ্বাস মতো ফললাভ হোক'--- এই কথা ব'লে তাদের চোখ স্পর্শ করতেই তাদের চোখ খুলে গেল। আবার ওখানেই বলা হয়েছে, তারপর করুনা-পরবশ হয়ে যীশু তাদের চোখ স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই তারা দৃষ্টি লাভ করল। 

প্রাচীনকাল থেকে অধুনাতমকাল অবধি ভারতে বহু যোগী ঐ প্রণালীতে অনেক পীড়িত লোকেদের রোগ সারিয়েছেন। রোগীর সৌভাগ্য থাকলে অনেক সময় রোগী তথাকথিত চিকিৎসকদের নিরাময়করণে অসামর্থ্যের পর কোনও যোগীর দেখা পেয়ে তাঁর প্রাণশক্তি আকর্ষ-নিরাময়তার অদ্ভুত শক্তির সাহায্যে অসুখ সারাতে সুযোগ পেয়েছেন। ভারতে অবশ্য এমন আকর্ষ-চিকিৎসক বহু রকমের আছেন যাঁরা দেশে-দেশে ঘুরে ঘুরে লোকেদের নানা ধরনের রোগ সারিয়ে বেড়ান। 

কোন কোন যোগী-চিকিৎসক এক গেলাস জলে কিমবা একটি ফুলে অথবা এক চিমটি ধুলোতে প্রাণবায়ু- নিঃশ্বাসিত করে তার দ্বারা রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারেন। ঐ প্রাণবায়ু- নিঃশ্বাসিত জল পান করলে অথবা দেহের আহত বা ক্ষত স্থানে প্রয়োগ করলে অত্যাশ্চর্য ফল পাওয়া যায়। আর একধরনের আকর্ষ-চিকিৎষক আছেন যাঁরা অনামায়কারী প্রাণপ্রবাহকে ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রিত ক'রে রোগীদেহে ছড়িয়ে দিয়ে রোগ সারাতে পারেন। আকর্ষ-চিকিৎষার কয়েকটি সাধারণ রীতি হচ্ছেঃ দেহের ওপর কর-ঘর্ষণ, অঙ্গুলিদ্বারা দেহের ওপর মৃদু-মৃদু আঘাত, রোগীর মাংস ও মাংসপেশীকে টিপে সুস্থ করা এবং মর্দন বা দলাই-মালাই দিয়ে অস্থি-চিকিৎসা করা। প্রাচীন ও আধুনিক ভারতের যোগীরা ঐসব পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন।

খ্রীষ্টানদের অনেকের বিশ্বাস যে, ইশ্বর শুধুমাত্র খ্রিষ্টের ভক্ত-শিষ্যদেরকেই ঐ অনাময়কারী শক্তি দান করেছেন; কিন্তু যোগশাস্ত্র বলে এ-শক্তি প্রানশক্তিরই দানবিশেষ। কারও মধ্যে এ-শক্তি বেশী আছে কারও মধ্যে কম। আরোগ্য দান করার গুঢ়তত্ত্বটি যোগীরা জানেন, তাই দু'-হাজার বছর আগে যীশু যেমন ক'রে রোগ সারিয়ে দিতেন তাঁরাও ঠিক সেইভাবে তা পারেন। ভারতে এ'ব্যাপারটি এতই সাধারণ যে, বহু দীর্ঘপথ হেঁটে লোকেরা যোগীকে রোগ দেখাতে যান। তাই যখনই কোন যোগী ঐ-ব্যাপারে নাম করেন তখনই দিবারাত্রি অসংখ্য রোগী আসেন তাঁর আশীর্বাদ পাবার জন্য।

  ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ অদ্ভুত অনাময়কারী শক্তির অধিকারী ছিলেন, কিন্তু তিনি সচরাচর তা প্রয়োগ বা ব্যবহার করতেন না। একবার আমি তাঁর এই শক্তি দেখবার সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম। তিনি তাঁর ভক্তশিষ্য বিবেকানন্দকে  ঐভাবে সুস্থ ক'রে তুলেছিলেন।একদিন সিকালে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর শিষ্যদের নিয়ে রামবাবুর বাড়ীতে এলেন। সেদিন সেখানে বহু লোকের ভিড় জমেছিল। শ্রীরামকৃষ্ণদেব বসে একবার চারিদিকে দেখে নিয়ে জিজ্জাসা করলেন, "নরেন্দ্র(স্বামী বিবেকানন্দ) কোথায়, তাকে যে দেখছিনে ?" রামবাবু বললেন, 'অতিশয় মাথাব্যথার জন্য সে মাথায় বরফ চাপিয়ে অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছে, কোনমতেই আলো সহ্য করতে পারছে না'। গুরুদেব নরেন্দ্রকে দেখতে চাইলেন ও কয়েকজন শিষ্যকে বললেন নরেনকে সেখানে নিয়ে আসবার জন্য। তখন আমি ও তাঁর অনান্য শিষ্যরা নরেন্দ্রর বাড়ি তে গেলাম। গিয়ে দেখলাম একটা অন্ধকার ঘরে মাথার ওপর একটা ভিজে তোয়ালে রেখে নরেন্দ্র শুয়ে আছেন। বুঝলাম তিনি খুব কষ্ট পাচ্ছেন। আরাম পাবার জন্যে তিনি অনেক রকম চেষ্টা ক'রে বিফল হয়েছেন। আমরা তাঁকে গুরুদেবের কথা জানালাম। নরেন্দ্র বললেন তাঁর পক্ষে আলোতে বেরনো অসম্ভব; তাছাড়া অতো রুগ্ন অবস্থায় লোকসভায় যাওয়া তাঁর শোভনিও হবে না। আমরা তাঁকে বারবার অনুরোধ করলাম চোখ ও মাথা বেধে আসবার জন্য; তাঁকে হাত ধরে আমরা নিয়ে এলাম। শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রকে দেখে বিশেষ আনন্দিত হলেন ও নরেন্দ্রর মাথা ছুঁয়ে বললেন, 'কি হয়েছে রে তোর মাথায়?' তৎক্ষণাৎ নরেন্দ্রন ব্যথা কোথায় মিলিয়ে গেল! সকলে এই ব্যাপার দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সেই জনবহুল সভার মধ্যে বসে নরেন্দ্র তানপুরাসহযগে ভকতিমূলক ভজনগান করতে লাগলেন; গুরুদেব তা শুনে গভীর সমাধিতে মগ্ন হলেন। সেদিন কোনরকম কষ্ট অনুভব না ক'রে নরেন্দ্র চার ঘণ্টা ধরে অচঞ্চলভাবে গান করেছিলেন।

আর একটি ঘটনা আমার মনে আছে। একদিন লাটু মহারাজ (স্বামী অদ্ভুতানন্দ), শ্রীরামকৃষ্ণের এক মহিলাশিষ্য ( গোপাল-মা) ও আমি নৌকায় ক'রে কলকাতা থেকে দক্ষিনেশ্বর ফিরছি। তখন বেলা প্রায় আড়াইটা হবে। আমাদের সকলেরই খুব খিদে পেয়েছিল, গুরুদেবেরও তাই। কিছু খাবার কেনবার জন্য বরানগর-ঘাটে আমরা নোঙর ফেলে দিলুম। সেই মহিলা-ভক্তটির কাছে তখন মাত্র একটি আনি (চার পয়সা) সম্বল ছিল। আমি সেই আনিটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরে সামান্য-কিছু মিষ্টি নিয়ে আমি ফিরে এলাম। গুরুদেব আমার কাছ হ'তে সবটুকু নিয়ে খেয়ে ফেললেন। তারপর আঁজলা ক'রে গঙ্গা হ'তে কিছু জলও খেয়ে নিলেন। আমরা একটি কণিকামাত্রও না পেয়ে পরস্পর তাকাতাকি করলাম। কিন্তু এমন আশ্চর্যের ব্যাপার যে, ঠিক তখন থেকেই আমাদের আর কোন ক্ষুধা বোধ হ'ল না, মনে হ'ল উদর পূর্ণ হয়ে আছে। শুধু তাই নয়, ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ একটুকু করস্পর্শ কিম্বা একটুখানি দৃষ্টি দিয়ে দুঃখিত ও তাপিত জনের দুঃখ-তাপ উপশমিত ক'রে পরমেশ্বরের নিত্যানন্দময় দিব্যধামে নিয়ে যেতে পারতেন। এমনি করেই তিনি ঞ্জান-তরবারির সাহায্যে সকল অজ্ঞানতা মিথ্যামন্দের মল পর্যন্ত দূর ক'রে মানুষকে পূর্ণতায় প্রতিষ্ঠিত করতেন। 

আকর্ষ-চিকিৎসা কি ? জেনে নিন আকর্ষ-চিকিৎসা কি ? জেনে নিন Reviewed by Kona Dey Chakraborty on September 11, 2018 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.