Featured Posts

[Travel][feat1]

মদার টেরেসার কিছু অমূল্য বাণী

December 25, 2018

• কেবল টাকা দিয়েই আমাদের খুশি বা সন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয়। টাকায় যথেষ্ঠ নয়, টাকা জোগাড় হয়ে যায়। কিন্তু ওই মানুষগুলির যা দরকার তা হলো আমাদের হৃদয়ভরা ভালোবাসা। তাই, যেখানেই যাও সর্বত্র তোমার ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও।
• ‎আমাদের যদি শান্তি না থাকে তবে আমরা ভুলে গেছি যে আমরা একে অপরের জন্য।
• ‎জীবনের ছোটখাটো বিষয়গুলির প্রতি বিশ্বস্ত থেকো, কারণ তাদের মধ্যেই তোমার শক্তি নিহিত।
• ‎ওদের প্রত্যেকে এক একজন ছদ্মবেশী যীশু।
• ‎এমনকি ধনীরাও ভালোবাসার কাঙ্গাল, যত্নের, ডাকখোঁজের। তারাও নিজের বলে কাউকে চায়।
• ‎প্রথম আমাদের প্রেম, করুনা, বোঝাপড়া ও শান্তির তহবিল গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে আরো বেশি করে জোর দেওয়া উচিত। কারণ যদি আমরা ঈশ্বরের রাজ্য খুঁজে পায়, বাকি যা কিছু সব জুটে যাবে।
• ‎আমি চাই আপনি আপনার পাশের দরজার প্রতিবেশীর ব্যাপারে মনোযোগী হোন। আপনি কি আপনার প্রতিবেশীকে চেনেন?
• ‎যদি তুমি হাজার মানুষকে খাওয়াতে না পারো অন্তত একজনকে খাওয়াও।
• ‎যদি তুমি প্রেমের বাণী শুনতে চাও তবে তা কাউকে পাঠাতে হবে। প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত আমাদের ক্রমাগত তাতে তেল ঢেলে যেতে হবে।
• ‎তীব্র প্রেম মাপা যায়না, তা কেবল দেয়। 
• ‎যে ব্যক্তির খাবার মতো কিছুই নেই তার থেকে অনেক বেশি দরিদ্র হলো সেই ব্যক্তি যে পরিত্যক্ত, অবহেলিত, যাকে কেউ ভালোবাসে না, কিংবা কেউই মনে রাখে না।
• ‎আনন্দ হলো ভালোবাসার এক জাল যার দ্বারা তুমি আত্মাকে ধরতে পারো।
• ‎এসো আমরা সকলে একে অপরের দিকে হাসিমুখে তাকাই, কারণ প্রেমের শুরুই তো হাসি দিয়ে।
• ‎যারা দরিদ্র, যারা পরিত্যক্ত, যারা অবহেলিত, যারা মুমুর্ষ তাদের প্রেমের স্পর্শ দেও। এ কাজে আমরা যেন কেউ লজ্জিত না হয়।
• ‎একাকীত্ব ও অবহেলা হলো সবচেয়ে বড় দরিদ্র।
• ‎ধনীরা টাকার বিনিময়ে যা পেতে পারে আমি চেষ্টা করি তা গরিবদের দিতে ভালোবাসা দ্বারা। না, আমি হাজার পাউন্ডের বিনিময়েও একজন কুষ্ঠ রোগীকে ছোঁব না, তবে প্রভুর প্রতি ভালোবাসা জ্ঞানে তাকে আমি সানন্দে সুস্থ করে তুলবো।
• ‎প্রেম হলো এমন এক ফল যা সব ঋতুতেই পাওয়া যায়, সকলেরই হাতের নাগালে।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন 

মদার টেরেসার কিছু অমূল্য বাণী মদার টেরেসার কিছু অমূল্য বাণী Reviewed by Kona Dey Chakraborty on December 25, 2018 Rating: 5

নিকোলাস কোপারনিকাসের জীবনী

November 27, 2018

নিকোলাস কোপারনিকাস (জন্ম - ১৪৭৩ খ্রি., মৃত্যু - ১৫৪৩ খ্রি.)


বাবা শোনাতেন দেশ-বিদেশের সাগর আর বন্দরের কথা। স্তব্ধ বিস্ময়ে অবাক হয়ে শুনত ছেলেটি। চোখ বন্ধ করত, ভেসে যেত কল্পরাজ্যে। এভাবেই তার মনের মধ্যে এক অদ্ভুত আবেগসম্পৃক্ত জগতের জন্ম হয়েছিল।
অন্য কেউ হলে হয়তো হতেন একজন কবি। ছোট্টবেলার এইসব স্মৃতিতে আচ্ছন্ন থাকতেন, যারা জীবন ভরে লিখতেন না-দেখা ভুমিখণ্ডের কল্পিত কবিতা।
কিংবা হতেই পারতেন সৃজনশীল গল্পলেখক। কেন না তার বাবার গল্প বলার ভঙ্গিটি ছিল ভারী চমৎকার। দূর প্রাচ্যের কোথায়, কোন জননীর বুকফাটা আর্তনাদ তিনি শুনেছেন, নিখুঁতভাবে তা উপস্থিত করতেন ছেলের কাছে।
হলেও হতে পারতেন একজন উপন্যাসিক। মানুষের জীবনের ওঠাপরা, আশা আর নিরাশা কে পাথেয় করে লিখতেন মহান উপন্যাস। পৃথিবীর মানুষ যা পরে আনন্দ পেত।
উনি কিন্তু তা হননি। উনি হয়েছিলেন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী। শুধু বিজ্ঞানী বললে ভুল হবে। ওনার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর উনি পৌঁছে দিয়েছিলেন, পৃথিবীর সর্বত্র। তখনকার সমাজে যা করা হত, উনি তার বিরুদ্ধে অক্লেশে ঘোষণা করেছিলেন সীমাহীন জেহাদ। আর এভাবেই প্রগতিবাদী মানুষের ইতিহাসের সঙ্গে ওনার নাম জড়িয়ে ব্যক্তিত্ব রূপে।
বন্ধুরা, তোমাদের নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, কোন মহাবিজ্ঞানীর ছোটবেলার গল্পকথা শোনাব বলে তৎপর হয়েছি। নামটা বললে তোমরা সবাই তাকে চিনতে পারবে। শুধু চিনতে পারলে বললে ভুল হবে, তোমরা সবাই তার জীবনকথাও হয়তো বলে দেবে - এতই জনপ্রিয় তিনি আমাদের মধ্যে।
হ্যাঁ, তোমরা হয়তো অনুমান করতে পারছ, তিনি হলেন নিকোলাস কোপারনিকাস।
জন্মেছিলেন তিনি পোল্যান্ডের ভিস্টলা নদীর তীরবর্তী টরুন নামক বন্দর-শহরে, আজ থেকে অনেক বছর আগে - ১৪৭৩ খ্রিস্টাব্দে।
যে পরিবারের হয়ে নিকোলাস পৃথিবীর আলো দেখেন, সেটি ছিল এক বণিক পরিবার। বণিক পরিবারের পুরুষেরা বছরের বেশিরভাগ সময় বাইরে বাইরে কাটান। মাথার ওপর কঠিন কঠোর কর্তব্যের বোঝা চাপানো থাকে তাদের। সেই সঙ্গে থাকে দেশজয়ের নেশা এবং থাকে অর্থ উপার্জনের তাগিদ। সব মিলিয়ে সে এক দারুন ব্যস্ততার জীবন। বাবার সাথে তাই খুব একটা দেখা হত না শিশু নিকোলাসের। বাবা বাণিজ্যে চলে যেতেন। যাবার আগে দুহাত ভরিয়ে দিতেন লজেন্স আর টফিতে। বলতেন, 'নিকোলাস, মন খারাপ করিস না। ফিরে এসে অনেক নতুন নতুন গল্প শোনাব।' ধীরে ধীরে বাবার শরীরটা দূর থেকে আরও দূরে চলে যেত। টমটম গাড়ি চলে যাচ্ছে। ছোট্ট নিকোলাস চোখ বন্ধ করছেন। গল্প শোনার লোভনীয় দিবাস্বপ্নে টফি খেতে ভুলে যাচ্ছেন। ভাবছেন, কখন বাবা ফিরে আসবেন, শোনাবেন সেই সাত মাথাওয়ালা দৈত্যটার কথা - যে আস্ত মানুষ গিলে ফেলতে পারে। কিংবা উড়তে উড়তে যে হাঁস বদলে যায় সুন্দরী রাজকন্যাতে - তার গল্প।
দিন কেটে যেত - বর্ষা, শীত, বসন্ত। বাবা আসছেন না কেন? অভিমানী মন ছটফট করত। মায়ের সান্নিধ্যে আসার চেষ্টা করতেন। বেচারি মা, সংসারের কত কাজ তার। কিকরে সময় দেবেন এই ছোট্ট শিশুকে?
তারপর একদিন ফুরিয়ে যেত প্রতীক্ষার এই দীর্ঘ প্রহর। বাবা আসতেন। কত কি যে জিনিসপত্র এনেছেন তিনি নিকোলাসের জন্য। ছেলেটাকে সত্যিই খুব ভালোবাসতেন বাবা। ভালোবাসতেন তার সরল দুটি চোখের স্বপ্নমাখা চাউনি, ভালোবাসতেন তার অবুঝপনা।
কিন্তু, সুখস্বপ্নের এই ছবিটাও হঠাৎ একদিন আবছা হয়ে গেল। তখন নিকোলাসের বয়স মাত্র দশ বছর, দূর বিদেশেই বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। অনেকদিন বাদে বাবার মৃত্যুসংবাদ পৌঁছেছিল হতভাগ্য ওই পরিবারের কাছে। বাবা নেই, দশ বছরের বালক নিকোলাস ব্যাপারটি ঠিক বুঝতে পারেনি। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিলেন ক্রন্দনশীল মায়ের দিকে। তারপর, একটু একটু করে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আজ থেকে তার জগৎটা অনেক পাল্টে গেছে। এখন তার কল্পনার সুদুরতম শরনিতে ব্যঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি বসে থাকবে না বিশাল পাকুর গাছের ডালে। রাতের আধার ঘনিয়ে এলে ব্রহ্মদৈত্য এসে ভয় দেখাবে না। এখন থেকে তিনি সত্যি সত্যি নিঃসঙ্গ হলেন।
অনেকে বলেন, সেই বয়সেই নিকোলাস হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদি। সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, দীর্ঘদিন ধরে সমাজপতিরা নানাভাবে মানুষকে শোষণ করে এসেছেন, এবার তাদের শোষনের দিনের অবসান ঘটাতে হবে- এমনই একটা দৃঢ় প্রত্যয়ের জন্ম হয়েছিল বালক নিকোলাসের মনের মধ্যে।
বাড়ি ছেড়ে নিকোলাসরা চলে এলেন মামাবাড়িতে। মামা ছিলেন বাস্তববাদী। যে-কোনো বিশ্বাসের গভীরে প্রোথিত প্রকৃত সত্যের সন্ধান করা ছিল তার স্বভাব। তিনি ছিলেন পোল্যান্ডের একজন বিশিষ্ট বিশপ। ধর্মের সঙ্গে মানুষের সাধারণ জীবনবোধকে মিশিয়ে দেওয়ার একটা অদ্ভুত প্রবণতা ছিল তার। সে যুগের নিরিখে এটা কিন্তু একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, বিশেষ করে ধর্মযাজকদের ক্ষেত্রে। ধর্মপ্রচারের স্বভাবতই প্রাচীনপন্থী হয়ে থাকেন। সমাজের বুকে ঘটে যাওয়া যে কোনো বিপলবাত্মক ঘটনাকে তারা নিন্দা করতেন। তারা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিভূ হিসেবে ভাবতে ভালোবাসেন। বোকাসোকা জনসাধারণের ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করেন। রাজার আশ্রয়ে পায়ের ওপর পা দিয়ে জীবনের দিনগুলো অনায়াস আরামে কাটিয়ে দেন।
মামার সান্নিধ্যে এই জীবনবোধ সেদিনের কিশোর নিকোলাসের মনের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। বাবার অভাব অনেকটাই পূরণ করেছিলেন ওই প্রগতিপন্থী মামা।
১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে উনিশ বছর বয়সে কোপার্নিকাস ভর্তি হয়েছিলেন পোল্যান্ডের বিখ্যাত ক্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি নানাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু পোল্যান্ড থেকেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে দলে দলে কৃতি ছাত্ররা আসতেন এখানে ভর্তি হবার জন্য। ভর্তি হওয়ার ছাড়পত্রটাও পাওয়া যেত না সহজে। অনেকগুলো কঠিন পরীক্ষার বেড়া টপকে তবেই এই বিশ্বখ্যাত অঙ্গনের প্রবেশের অনুমতি মিলত। ভর্তির প্রতিটি পরীক্ষায় নিকোলাস অসাধারন কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। অধ্যাপকেরা তার এই গুনপনায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এখানে পড়তে পড়তে নিকোলাসের সঙ্গে পরিচয় হল বিশিষ্ট অধ্যাপক ব্রুদেসকির। উনি ছিলেন অংক এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক, আধুনিক মনোভাবাপন্ন বিজ্ঞানী। ওনার সংস্পর্শে এসে নিকোলাসের জীবনাদর্শের রুদ্ধ দুয়ার খুলে গিয়েছিল। এতদিন পর্যন্ত সব বিষয়ে কেমন একটা ভাসা ভাসা অভিমত ছিল নিকোলাসের। ব্রুদেসকিই তাকে প্রথম বললেন, বিজ্ঞান কখনো 'যদি', 'কিন্তু' ইত্যাদি শব্দকে প্রাধান্য দেয়না। যা সুনিশ্চিত, তাকে প্ৰতিষ্ঠা করাই বিজ্ঞানের একমাত্র লক্ষ্য। তার জন্য যদি জীবনাপাত করতে হয়, তাহলে তাও করতে হবে। তবুও কোনো অনুমানের পিছনে বিজ্ঞান ছুটবেনা।
সংক্ষেপে বলা যেতে পারে, পরবর্তীকালে কোপার্নিকাস যে কারণে জগৎবিখ্যাত হন, সেই বিষয়ে কৌতূহলের প্রথম বীজটি অঙ্কুরিত করেছিলেন ওই ব্রুদেসকি।
১৪৯২- নিকোলাস এলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের ইতিহাসে সেই বছরটি কিন্তু আরও একটি কারণে বিখ্যাত হয়ে আছে। তোমরা হয়তো ভুলে গেছো, সেই বছরই ইতালিয় নাবিক কলম্বাস অতলান্তিকের ওপারে নতুন ভুমিখন্ড আবিষ্কার করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন - নতুন মহাদেশ। পরবর্তীকালে যা 'আমেরিকা' নামে আত্মপ্রকাশ করে।
সেদিনের এই আবিষ্কারের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। আমেরিকা আবিষ্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জ্ঞানভান্ডারের সীমানা একলাফে অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছিল। দলে দলে মানুষ তখন চলেছেন আমেরিকার উদ্দেশ্যে। সেখানকার বাতাসে নাকি টাকা উড়ছে, মাটির নিচে তাল তাল সোনা পোঁতা আছে - এমনই একটা গুজব রটে গিয়েছিল সর্বত্র। আর নতুন এই দেশে যাবার যে হিড়িক উঠল, তাতেই পাল্টে গেল মানুষের মন। নতুন সব কিছুকে আঁকড়ে ধরতে হবে, বস্তাপচা পুরানো ভাবধারাকে বিদায় দিতে হবে - এমনই একটা ধারণা জন্মেছিল তরুণতর প্রজন্মের মধ্যে।
বিশ্ববিদ্যালযের ছাত্র থাকাকালীন জ্যোতির্বিজ্ঞানকে আঁকড়ে ধরেছিলেন নিকোলাস কোপার্নিকাস। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। মামার ইচ্ছে ছিল, ভাগ্নেটি হবে চিকিৎসাবিজ্ঞানী। আর্ত-আতুরদের সেবা করবে। তাই মনের ইচ্ছে চেপে কোপার্নিকাস ভর্তি হতে হল চিকিৎসাবিনজ্ঞানের বিভাগে। মান দিয়ে পড়াশোনা করলেন তিনি। শেষ অব্দি উর্ত্তীণ হলেন ওই পরীক্ষাতে। মামার ইচ্ছে তিনজ অপূর্ন রাখেননি। ডাক্তারি পাশ করার পর আর্ত মানবাত্মার সেবাতে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন তিনি।
এবার বিদেশে যেতে হবে। তখন উচ্চ শিক্ষার জগতে ইতালির খুবই নামডাক। মামার অনুমতি নিয়ে কোপার্নিকাস এলেন ইতালিতে। ভর্তি হলেন বোলগানা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেক হয়েছে, এবার আর চিকিৎসাশাস্ত্র নয়। এবার আমি আমার মনের মতো বিষয় গণিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়ব - এমনই একটা ইচ্ছে জাগল সেদিনের তরুণ নিকোলাস কোপারনিকাসের মনে।
তখনকার দিনে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গ্রিক মনীষীদের অবিসংবাদিত প্রাধান্য ছিল। আবার অংক এর ক্ষেত্রে প্রাচীন ধারাটি সযত্নে বহন করতেন আরব পন্ডিতরা। দুটি বিষয়ের মূল ধারার সঙ্গে পরিচিত হবে জন্য নিকোলাস সযত্নে গ্রিক এবং আরবি ভাষা অধ্যয়ন করলেন। এই জাতীয় আত্মনিবেদন এখন ভাবতেই পারা যায় না। এখনকার দিনে আমরা অবুবাদের মাধ্যমে চটজলদি সবকিছু শেখার চেষ্টা করি। কিন্তু নিকোলাস ছিলেন অন্য চরিত্রের মানুষ। যা শিখবেন একেবারে একটা মনোবৃত্তি ছিল তার।
সে এক দারুন কর্মমুখর দিন। সারা রাত বসে বসে পড়া মুখস্থ করছেন। বাইরের প্রকৃতি নিঝুম নিথর হয়ে গেছে। ঘুমন্ত মানুষের বিলম্বিত শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। রুমমেট কখন ঘুমিয়ে পড়েছে সেদিকে নজর দেবার মতো সামান্য অবসরটুকুও নেই নিকোলাসের, তিনি যা জানেন, জীবনের দিনগুলি হঠাৎ হঠাৎ ফুরিয়ে যায়। বার্ধক্য এসে সময়ের দরজাতে করা নাড়ে। তাকে যে অনেক কাজ করতে হবে। পৃথিবীতে মানুষ এসেছে সুনির্দিষ্ট কিছু কাজ করার জন্য। সেগুলো অসম্পূর্ন রেখে আগে আগে চলে গেলে চলবে কেন?
এভাবেই ফুরিয়ে গেল নিকোলাস কোপারনিকাসের ছোটবেলা আর ছাত্রজীবন। বোলগানা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার কাজ চলাকালীনই রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বান পেলেন তিনি। এরপর তিনি পরিচিত হয়েছিলেন এক বিশিষ্ট বিতর্কিত বিজ্ঞানী হিসেবে। সে বিষয়ে দু চার কথা না বললে নিকোলাস সম্পর্কে আমরা সবটুকু জানতে পারব না।
তখনকার দিনে জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি ছিল গ্রিসের দার্শনিক বিজ্ঞানী টলেমির একটি ধারণা। মানবসভ্যতার ঊষালগ্নে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, পৃথিবী হল এই সৌরজগতের কেন্দ্রভূমি। তার চারপাশে সূর্য আছে। আছে চন্দ্র, গ্রহ এবং অসংখ্য নক্ষত্রের পরিমন্ডল। তারা নিজ নিজ কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে।
এই মতবাদকে সকলে অভ্রান্ত হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ তখনকার সব চিন্তাই হত এই মতবাদকে আশ্রয় করে। তার মানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাথমিক পর্বেই আমরা একটা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েছিলাম। কেউ কিন্তু এগিয়ে এসে টলেমির এই ত্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার সাহস কেউ করেননি। টলেমি তখন প্রায় ভগবানের পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন।
নিকোলাসই প্রথম এই মতবাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করলেন। তিনি সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের আবিষ্কার করলেন। এই তত্ত্বের সারকথা হল - সৌরমন্ডলের সকলেই, এমনকি পৃথিবীও স্থির নয়। তারা সবাই নিজস্ব কক্ষপথে চলমান। সূর্যকে ঘিরেই চলে তাদের পরিক্রমণ।
আজ আমরা এই তত্ত্বটিকে নির্ভুল সত্য বলে মনে নিয়েছি। কিন্তু যখন নিকোলাস এটি প্রথম প্রচার করেন, তখনকার অবস্থা ছিল একেবারে আলাদা। অচিরেই নিকোলাস চিহ্নিত হলেন দেশদ্রোহী হিসেবে। তাঁকে নানাভাবে ভৎর্সনা করা হল। শুধু তাই নয়, শারীরিকভাবেও তাঁকে নিগৃহীত হতে হয়েছিল। শেষ অব্দি অবশ্য নিকোলাসের এই তত্ত্ব পন্ডিতসমাজ মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু জীবদ্দশাতে তিনি এই মতবাদের স্বীকৃতি দেখে যেতে পারেননি। দেখেননি ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে কিভাবে পোপ গ্রেগরি ক্যালেন্ডার সংশোধন করেছেন সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের ভিত্তিতেই।
বিতর্কিত বিজ্ঞানী ছাড়াও তিনি ছিলেন এক বিশিষ্ট সহযোগীরূপে চার্চের কাজে যোগ দেওয়ার পর সপ্তম শতাব্দীর বিখ্যাত বাইজেনটাইন কবি থিয়োফিলাকটাস সীমাকোট্টা-র ৮৫ টি কবিতা গ্রিক থেকে লাতিনে অনুবাদ করেছিলেন তিনি।
১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দে এই প্রাণবন্ত জ্ঞানপিপাসু বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁকে শুধুমাত্র আমরা একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী বলব না। একাধারে তিনি ছিলেন ভাষাবিদ, চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, পুরোহিত, অর্থনীতিবিদ এবং রাজনীতজ্ঞ। এক মানুষের মধ্যে এতগুলি গুণের সমাহার সত্যি সত্যি আমাদের অবাক করে দেয়।
নিকোলাস কোপারনিকাসের জীবনী নিকোলাস কোপারনিকাসের জীবনী Reviewed by Kona Dey Chakraborty on November 27, 2018 Rating: 5

বাবা নিজের হাতে মেয়ের নামের ট্যাটু করার পর মেয়ে কি করলো ? - দিপা নাইডুর ঘটনাটা পড়ুন

October 23, 2018
জীবনের ছোট ছোট ঘটনা গুলো জীবনে আশ্চর্য রকমের প্রভাব ফেলতে পারে - নীচের এই ঘটনাটি থেকে আপনি বুঝতে পারবেন । ঘটনাটি শেয়ার করেছেন তামিলনাড়ুর এক গৃহবধূ  দিপা নাইডু। ঘটনাটি পড়ে ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন -

"আমার নাম দিপা, দু বছর আগে আমার স্বামী তার বন্ধুদের সাথে বেড়াতে গিয়ে হাতের কব্জিতে আমাদের মেয়ের নামে একটি ট্যাটু করে আনেন। তিনি বাড়ি এসে আমাদের সবাইকে ট্যাটুটি দেখান। 
আমাদের ছেলে যখন জানতে পারলো যে তার বাবা শুধুমাত্র তার বোনের নাম ট্যাটু করে এসেছে  তখন তার মুখ গোমড়া হয়ে গেল অবশ্য তার জন্যে আনা চকলেট, খেলনা পাওয়ার পরেই সে সেসব ভুলে গেলো। আমাদের মেয়ে ট্যাটু দেখে খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে গেলো, সে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরলো, কপালে চুমু খেলো এবং তার বাবাকে প্রশ্ন করলো যে তার এটি করতে গিয়ে ব্যাথা লেগেছে কিনা ?

এর উত্তরে আমার স্বামী বললেন, "আমি তোমার জন্য সব ব্যাথা সহ্য করতে পারি.।"
আমি জানিনা এর পর কি হলো, তার বাবার প্রতি তার মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে গেল । 
সে তার বাবার প্রতি মায়ের মতো আচরণ শুরু করলো। যদিও আগে থেকে সে তার ভাইয়ের প্রতি মায়ের মতো আচরণ করতো এখন বাবার সাথে শুরু করলো। (আমি মনে মনে ভাবলাম তাহলে আমার ভূমিকা কি?)
সে তার বাবার খেয়াল রাখা, যত্ন নেওয়া শুরু করলো। তার বাবা তার ওপর রাগ করলেও সে রাগ করতো না। সে তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করতো 'তার দিন কেমন কাটলো?, সে কি খাবার খেয়েছে?' তার হাঁচি হলে সে তার বাবার বুকে ভিক্স মালিশ করে দেওয়া শুরু করলো । সে তার বাবার কাছ থেকে কিছুই চায় না, কখনও কখনও আমার ছেলে যখন কিছু চায় তখন সে বলে, "অর্জুন, বাবাকে জ্বালাতন করো না, বাবার যখন ব্যস্ততা কমবে তখন তুমি না চাও তোমাকে দেবেন।"

প্রথমে আমি ভাবলাম এটি কেবল কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের জন্য হবে, কয়েক মাস পরে সে আগের অবস্থায় ফিরে আসবে, যখন তার চাওয়া কোনো জিনিস তার বাবা দিতে প্রত্যাখ্যান করবে।

9-10 মাস আগে, একদিন, সে আস্তে আস্তে স্কুলের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। আমার স্বামী খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠেন , সেদিন আমাদের মেয়ে স্কুলে যাওয়ার দেরি দেখে উনি চিৎকার করে উঠলেন। তিনি বলেন, "আমি এই সঞ্জনাকে ঘৃণা করি, দিনের শুরুতে তুমি এত অলস হতে পারো কিভাবে তবে দিনটা কেমন কাটবে"।
সে শুধুমাত্র হাসলো এবং স্কুলের জন্য প্রস্তুত হলো। 
আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম,শরীর ঠিক আছে কিনা, সে শুধু মাথা নাড়িয়ে স্কুলে চলে গেল।
1 ঘন্টা পরে, আমি স্কুল থেকে একটি ফোন পেয়েছিলাম। রিসেপশনিস্ট বলেছিলেন যে আমার মেয়ের জ্বর হয়েছে এবং দুবার বমি হয়ে গেছে। তারা আমাকে স্কুল থেকে নিয়ে যেতে বলেছিল। আমি কথাটা জানানোর জন্য তার বাবার কাছে একটা ফোন করি তাকে নিয়ে আসার জন্য, কিন্তু 4-5 বার চেষ্টা করার পরও তাকে ফোনে পাইনি। আমি আমার স্কুটার নিয়ে তাকে নিতে গিয়েছিলাম। আসার সময় আমি ওকে বলেছিলাম, " তোমার ভালো না লাগলে বলতে পারতে, আমি তোমাকে স্কুলে পাঠাতাম না। তোমার কি খারাপ লেগেছিলো তোমার বাবা বকেছিলেন বলে, তাই কি তুমি কিছু না বলে স্কুলে গেছিলে?"
তার উত্তর আক্ষরিক অর্থে আমার চোখে জল এনে দিয়েছিল।

সে আমাকে জাপটে ধরে আমার পাশে বসে ও বলে, "না মা আমি কোনোদিন বাবার কোনো কথায় রাগ করবো না, এটা সত্যি যে বাবা কিছু সময় না বুঝেই চেঁচামেচি করে, কিন্তু বাবা আমাকে খুব ভালোবাসে। যদি তাই না হতো তাহলে বাবা কি অতো ব্যাথা সহ্য করে আমার নামের ট্যাটু করতো?"(সে তখনও প্রসব ব্যাথা সম্মন্ধে কিছু জানতোনা তাই হয়তো ওর বাবার ব্যাথাটা তার কাছে অনেক বেশি মনে হয়েছিলো।)  যে মুহূর্তে সে কথাটি বলেছিলো আমার চোখে আপনাআপনি জল চলে আসে এটা ভেবে যে একটি আট বছর বয়সের মেয়ে কিকরে এতটা ভাবতে পারে? সে কিভাবে ভালবাসা আদর এত গভীর ভাবে বুঝতে পারে?


হ্যাঁ, কখনো এই ছোট জিনিষ গুলি অনেক কিছু প্রকাশ করে। এই ছোট্ট ট্যাটুটি বাবা এবং মেয়ে দুজনের কাছেই অতি মূল্যবান। জীবন সুন্দর। এটা কে আরো বেশি সুন্দর করা যাক এই রকম মুহূর্ত ও স্মৃতি গুলি দিয়ে।

ভাবছেন , আমার ছেলে এমন কিছু করেছে কিনা ? গতবার ওর জন্মদিনে আমি একটি মেলেটারী ড্রেস কিনে দিয়েছিলাম । ওর খুব শখ বড় হয়ে মেলেটারী হওয়া । এই কারনে ওর জামায় সেলাই করে ওর নামের একটা ব্যাজ লাগিয়ে দিয়েছিলাম । জামাটা পড়ে , আমার ছেলে যেভাবে কেঁদেছিল , এখনও ভাবলে আমার আশ্চর্য লাগে । হাসি খুশি একটা বাচ্চা যে আনন্দে এত আবেগপ্রবন হয়ে উঠতে পারে আমি কোনোদনিও ভাবিনি ।

উপরে আমাদের পরিবারের ছবি দিলাম - আমার স্বামী , মেয়ে , ছেলে আর আমাকে নিয়ে আমাদের ছোট্ট পরিবার । আমার এই ঘটনাটি আপনার ভালো লেগে থাকলে অবশ্যই শেয়ার করবেন -


বাবা নিজের হাতে মেয়ের নামের ট্যাটু করার পর মেয়ে কি করলো ? - দিপা নাইডুর ঘটনাটা পড়ুন বাবা নিজের হাতে মেয়ের নামের ট্যাটু করার পর মেয়ে কি করলো ? - দিপা নাইডুর ঘটনাটা পড়ুন Reviewed by Kona Dey Chakraborty on October 23, 2018 Rating: 5

ছোটবেলায় বিজ্ঞানে কোন আগ্রহ ছিল না পরমানু বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীরের

October 17, 2018

হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা (জন্ম : ১৯০৯ খ্রি.,মৃত্যু : ১৯৬৬ খ্রি.)


তাঁকে বলা হয় ভারতের পরমাণু শক্তি গবেষণার পথিকৃৎ। বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।


অথচ ছোটবেলার দিনগুলিতে কখনোই তিনি বিজ্ঞানকে ভালোবাসেননি। ভালোবেসেছিলেন সাহিত্য। লুকিয়ে লুকিয়ে সুন্দর কবিতা লিখতেন। সেই কবিতার মধ্যে ছন্দের বাহার থাকত। থাকত অলঙ্কারের বহিঃপ্রকাশ। শব্দচয়নে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন সেদিনের কিশোর হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। চারপাশের পৃথীবিতে যেসব ঘটনা ঘটছে, তাকে কেন্দ্র করেই কবিতা লিখতে ভালোবাসতেন তিনি। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন সূর্যাস্তের দিকে। এক লহমাতে পৃথিবীর বুকে বিরাট পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। আলোর উৎসার এবার বন্ধ হল। পৃথিবীতে নেমে আসছে রাত্রির অন্ধকার। প্রাকৃতিক এইসব ঘটনা সেদিনের কিশোর হোমি জাহাঙ্গীর ভাবাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করত। যা দেখতেন চোখের সামনে, তাই লিখে রাখতেন খাতার পাতায়। এইভাবেই ষোলো বছর বয়সে অনেকগুলি ভালো কবিতার জনক হয়েছিলেন তিনি।


কবিতার সঙ্গে সঙ্গে ছিল ছবি আঁকার ঝোঁক। রং-তুলি নিয়ে ছবি আঁকতেন বসতেন। স্কুলের পাঠ্যক্রম মোটেই ভালো লাগত না তাঁর। তবুও কৃতিত্বের সঙ্গেই পড়াশোনা শেষ করেছিলেন।


কবিতা জাহাঙ্গীরের অসম্ভব আগ্রহ ছিল। আর ছিল উচ্চাঙ্গ সংগীতে ভালোবাসা। গাইতে পারতেন খুব ভালো। রোজ সকালে ভৈরবীতে গলা সাধতেন। প্রতিবেশীদের ঘুম ভেঙে যেত। তাঁরা তন্ময় হয়ে যেতেন সেই সুরের খেলাতে।


শ্রোতা হিসেবেও তিনি ছিলেন চমৎকার। বিশেষ করে ভালো লাগত পশ্চিম দেশের গান।


জন্মেছিলেন তিনি ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০ শে অক্টোবর। বোম্বের এক ব্যবসায়ী পারসি পরিবারে। তাঁর বাবা ব্যবসায়ী হলে কি হবে, বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক ছিল ভদ্রলোকের। নানা বিষয়ের বই নিয়ে একটি সুন্দর লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন বাড়ির মধ্যে। কাজের অবসরে লাইব্রেরিতেই ডুবে থাকতেন তিনি।


এই পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠা ভাবা কিন্তু ছোটোবেলার বিজ্ঞানের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ প্রকাশ করেননি।


যথাসময়ে তাঁর স্কুলের পড়া শেষ হল। ভাবা সত্যিকারের সমস্যার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বিজ্ঞানকে খুব একটা লাগে নি নাকি? ভালো লাগে আঁকা, কবিতাচর্চা এবং সংগীত? অবশেষে তাঁর বাবাই সব সমস্যার সমাধান করলেন। তিনি ছেলেকে পাঠিয়ে দিলেন বিলেতে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি করে দিলেন।


হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা কিন্তু বেশিদিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ক্লাস করেননি। নীরস কলকব্জা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে তার মোটেই ভালো লাগত না। মাঝপথেই তিনি এই পড়া ছেড়ে দিলেন। এলেন পদার্থবিদ্যার ক্লাসে।


১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র একুশ বছর বয়সে কেমব্রিজ থেকে পদার্থবিদ্যায় বি এ পাশ করলেন তিনি। তখন ভাবার মনে নতুন ভাবনার স্পন্দন ঘটে গেছে। না, আর কবিতা লেখা নয়, সংগীত-সাগরে অবগাহন করা নয়, এবার আমাকে একজন ব্যবহারিক পদার্থবিদ হয়ে উঠতে হবে, এমনটিই সংকল্প করেছেন ভাবা।


তখন পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উল্লেখ্যযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন ডির‍্যাক, পাউলি, হিজেনবার্গ, বন এবং শ্রয়া ডিংগার-এর মতো দিকপাল পদার্থবিদেরা। এঁদের নেতৃত্বে ছিলেন ডির‍্যাক।


ডির‍্যাকের মতবাদটিকেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছিল সেদিনের সদ্য তরুণ হোমি জাহাঙ্গীরের ভাবার। কেমব্রিজে বিএ পড়তে পড়তেই তিনি ডির‍্যাকের গবেষণার প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কেমব্রিজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরিতে পদার্থবিদ্যার বই নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেত তাঁর।


১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কেমব্রিজ থেকে তিনি পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করলেন। পরবর্তীকালে ডঃ হোমি জাহাঙ্গির ভাবাকে আমরা একজন বিশিষ্ট  পদার্থবিদ হিসেবে চিনেছি। ভাবতে অবাক লাগে, ছোটোবেলায় যিনি কবিতা লেখা আর গানের মধ্যেই জীবনের আসল মানে খুঁজে পেয়েছিলেন, তিনি হয়ে উঠলেন একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী! সত্যিই মানুষের জীবনে কখন কোন পরিবর্তন ঘটে আমরা তা জানতেই পারি না !


স্বাধীন ভারতের পরমাণু বিজ্ঞানের ইতিহাসে ভাবা একটি স্মরণযোগ্য নাম। তিনি ভারতের পরমাণুশক্তি কমিশনের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে তিনি ভারত সরকারের পরমাণু শক্তি বিভাগের সচিব পদে মনোনীত হন। তাঁর প্রেরনাতেই ভারতের পরমাণু শক্তির উন্নয়নসংক্রান্ত গবেষণা শুরু হয়েছিল। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশের প্রথম পরমাণু শক্তি চুল্লি বা অ্যাটমিক রি-অ্যাক্টর।


মুম্বাই শহরের অদূরে তারাপুরে ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয় ভারতের প্রথম পরমাণু শক্তি কেন্দ্রটি। দু-বছর পর এখানেই গড়ে ওঠে প্লুটোনিয়াম প্ল্যান্ট। এইসব প্রয়াসের অন্তরালে ছিলেন ওই নিরলস সংগ্রামী-বিজ্ঞানী ডঃ হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা।


এরই পাশাপাশি তিনি মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রেও ভারতের ভূমিকাকে উজ্জ্বলতর করেছেন। তাঁরই উদ্যোগে শুরু হয়েছিল তেজঃসৌরবিদ্যা এবং জীবাণুবিদ্যা সংক্রান্ত গবেষণা। স্থাপিত হয়েছিল উৎকামন্ডের রেডিও টেলিস্কোপ।



১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে এক বিমান দুর্ঘটনাতে অকাল প্রয়াত হলেন এই মহান বিজ্ঞানী। ভারতীয় বিজ্ঞানী সাধনায় অক্ষয়কীর্তি স্থাপন করে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

ছোটবেলায় বিজ্ঞানে কোন আগ্রহ ছিল না পরমানু বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীরের ছোটবেলায় বিজ্ঞানে কোন আগ্রহ ছিল না পরমানু বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীরের Reviewed by Kona Dey Chakraborty on October 17, 2018 Rating: 5

বিগ ব্যাং থিয়োরি সম্বন্ধে আজনা তথ্য জানিয়ে নোবেল পেয়েছিলেন এই দুই বিজ্ঞানী

October 13, 2018

জন সি. ম্যাথার ও জর্জ এফ. স্মুট

Jhon C Mather 
২০০৬ খ্রিস্টাব্দে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুইজন বিজ্ঞানী। তাঁদের মধ্যে একজন জন সি ম্যাথার ও অন্যজনের নাম জর্জ এফ. স্মুট। ছোট্টবেলা থেকে ম্যাথার ছিলেন এক আদ্যন্ত বিজ্ঞানপিপাসু মানুষ। সম্প্রতি এক স্মৃতিচারণে তিনি তাঁর ফেলে আসা দিনযাপনের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। সমবয়সী বন্ধুরা যখন মাছ ধরা কিংবা সাইকেলে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন, তখন জন সি ম্যাথার অংকের আকিবুঁকির মধ্যে মুখ গুঁজে বসে থাকতেন। তখন থেকেই তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য তথা উদ্দেশ্য ছিল কিভাবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি রহস্যের আবরণ উন্মোচিত করা যায়।
তারপর একটু বড়ো হলেন ম্যাথার। এলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়ার অবসরে ছেলেমেয়েরা ঠাট্টা আনন্দে মশগুল হয়ে ওঠেন, কিন্তু ম্যাথারের সেদিকে নজর নেই। তিনি লাইব্রেরিতে বসে মোটা মোটা বই পড়তেন। মাথার ভিতরে চিন্তার পোকার কিলবিল করে। ভাবতে থাকেন এই যে বিশাল ব্রহ্মান্ড,  এর আদি কোথায়, অন্ত কোথায় ? যদিও ইতিমধ্যে আলবার্ট আইনস্টাইন প্রমুখ অনেক বিজ্ঞানী এই বিশ্বরহস্য উন্মোচনে উল্লেখযোগ্য গবেষণা করে গেছেন। কিন্তু ম্যাথারের কেবলই মনে হয়, কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে গেছে। কিছুতেই আমরা পৃথিবীর আসল রহস্যটাকে বুঝতে পারছিনা। কবে সেই রহস্য উন্মোচিত হবে ? একুশ বছরের ম্যাথারের এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি একটি সংবাদপত্রে এই বিষয়ে প্রতিবেদন লেখেন। তখন থেকেই তাঁর নাম বিজ্ঞানী মহলে ঘুরতে থাকে। 
মার্কিন দেশে জন্মগ্রহণ করায় আধুনিকতম সুযোগ সুবিধা তিনি পেয়েছিলেন। সেই সুবিধাগুলিকে কাজে লাগিয়ে অল্প বয়সেই তিনি এক বিশিষ্ট গবেষক হিসাবে পরিচিতি অর্জন করেন। তিনি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন শক্তিশালী টেলিস্কোপের লেন্সের দিকে। বিশাল মহাবিশ্বের বুকে কত-না ঘটনা ঘটে চলেছে। পৃথিবীর মানুষ হয়ে আমরা তার কতটুকু খবর রাখতে পারছি? ম্যাথার তখন থেকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, একদিন তিনি মহাবিশ্বের এই রহস্য উন্মোচন করবেনই।
শেষপর্যন্ত বিগব্যাং থিয়োরি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ন গবেষণা করে জন সি ম্যাথার পেলেন বিজ্ঞানে নোবেল পুরুষ্কার। অনেকদিন থেকেই আমরা বলে থাকি, ব্রহ্মান্ড আসলে একটি মহা বিস্ফোরণের ফল, যাকে বলে বিগ ব্যাং থিয়োরি। কিন্তু অনেক বছর আগে এই পৃথিবী কেমন ছিল? নাসার কৃত্রিম উপগ্রহ কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড এক্সপ্লোরারে সাহায্যে ম্যাথার এই গবেষণা করলেন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন তার এক সহযোগী আর-এক বিজ্ঞানী। তিনি হলেন জর্জ এফ. স্মুট। তাঁদের যুগ্ম গবেষণায় আমরা জানতে পারি, আজ থেকে অনেক লক্ষ বছর আগে মহাবিশ্ব ঠিক কিরকম ছিল। উপগ্রহের সাহায্যে গবেষণা চালিয়ে তাঁরা এই গুরুত্বপূর্ন তথ্য আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। বিগ ব্যাং-এর ফলে তৈরি শক্তি এখনো বিশ্বব্রহ্মান্ডে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু সব জায়গাতে তা সমান ভাবে ছড়িয়ে নেই। এর কারণও জানিয়েছেন ওই দুই গবেষক। জানিয়েছেন কোথায় ওই শক্তির পরিমান কম এবং কোথায় ওই শক্তির পরিমান কিছুটা বেশি।
তাঁদের আর-একটি গবেষণার কথাও প্রসঙ্গে বলা উচিত। তাঁরা অনেকদিন থেকেই অনুমান করেছিলেন যে, ওই বিস্ফোরণের অন্তরালে কোনো একটা অদৃশ্য শক্তি নিহিত ছিল। এই শক্তিটি আসলে কি, তা এখনো পর্যন্ত কেউ বের করতে পারেননি। কিন্তু এই দুই বিজ্ঞানী বললেন, এই শক্তি হল প্রচন্ড সঙ্কুচিত বীজ যা বস্তু। তারা নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিজগুলির আকর্ষনে পদার্থ জমতে থাকে। তৈরি হয় নতুন বস্তুপিন্ড। 
কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড এক্সপ্লোরারকে তাঁরা নানাভাবে কাজে লাগিয়েছেন। অসংখ্য ছবি তুলেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন যে মহাবিশ্বের বুকে এখনও নিরন্তর পরিবর্তন ঘটে চলেছে। ভবিষ্যৎকালে তাঁদের এই গবেষণার পথ ধরে আরও অনেক নতুন বিজ্ঞানী এগিয়ে আসবেন, এবিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
George Smoot 
এবার জর্জ এফ. স্মুটের কথা বলি। আত্মভোলা স্বভাবের এই মানুষটিকে দেখলেই মনে হয় না যে, তিনি মার্কিন দেশের বাসিন্দা। নামকরা বিজ্ঞানী হলে কি হবে, তার দিন কাটে একান্ত নিঃসঙ্গতার মধ্যে। সকলে যখন ঘুমে অচেতন, তখনও তিনি ল্যাবরেটরিতে আত্মনিমগ্ন থাকেন নিত্যনতুন গবেষণায়। এই প্রসঙ্গে স্ফুট তাঁর ফেলে আসা দিনযাপনের কথা স্বীকার করেছেন। মোটামুটি সম্পন্ন পরিবারের সন্তান হয়ে পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি উৎসুক ছিল ঘুমিয়ে। বড়ো হবার সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তুখোর ছাত্র হিসাবে খুব একটা পরিচিত ছিল না। মোটামুটি মেধাবী মানের ছাত্র ছিলেন তিনি। কিন্তু পরীক্ষাতে ফল করতেন খুবই ভালো। অচিরেই অধ্যাপকদের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করার পর প্রথমদিকে ছিলেন নিষ্প্রভ অবস্থায়। চুপচাপ একা একা বসে ভাবতে ভালোবাসতেন। আত্মপ্রচার করা থেকে শত হাত দূরে থাকতেন। পরবর্তীকালে অবশ্য তাঁর চরিত্রের মধ্যে একটা লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটে যায়। তিনি হয়ে ওঠেন এক বিগদ্ধ বিজ্ঞানী।
এই দুই বিজ্ঞানসাধকের ছেলেবেলার দিনযাপনের কথা মনে করলে আমাদের অনেক কথাই মনে পড়ে যায়। আমরা অবাক হয়ে ভাবতে থাকি পরবর্তীকালে যাঁরা কিংবদন্তির মানুষ হয়ে ওঠেন, ছোট্টবেলা থেকেই বোধহয় শুরু হয় তাঁদের নীরব এবং কঠিন অনুশীলন। তা না হলে তাঁরা কিভাবে মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবেন এই পৃথিবীর বুকে? 

বিগ ব্যাং থিয়োরি সম্বন্ধে আজনা তথ্য জানিয়ে নোবেল পেয়েছিলেন এই দুই বিজ্ঞানী বিগ ব্যাং থিয়োরি সম্বন্ধে আজনা তথ্য জানিয়ে নোবেল পেয়েছিলেন এই দুই বিজ্ঞানী Reviewed by Kona Dey Chakraborty on October 13, 2018 Rating: 5

তাঁতির ছেলে হয়ে উঠলো জগতসেরা বিজ্ঞানী , পড়ুন জীবনী

October 10, 2018

জন ডালটন (জন্ম : ১৭৬৬ খ্রি. , মৃত্যু : ১৮৪৪ খ্রি.)

এবার এক তাঁতী পরিবারের গল্প বলি। তোমরা কি কখনও ফুলিয়াতে গেছ? নিদেনপক্ষে সমুদ্রগড় অথবা বেগমপুর। যদি যাও, তাহলে দেখবে, সেখানকার জীবন একেবারে অন্য খাতে বইছে। সকাল থেকে সন্ধ্যে অব্দি শুধু মাকুর আওয়াজ, টানা আর পোড়েনের শব্দ। এর বাইরে যে আরো একটা পৃথিবী আছে, সে-খবর রাখেন না ওখানকার মানুষজন। ওনারা তাঁত বুনে চলেছেন। তৈরি করছেন মানুষের পরিধেয় হাজার সামগ্রী।
এমনই এক তাঁতী পরিবারে জন্মেছিলেন জন ডালটন। যিনি পরবর্তীকালে প্রমানুবাদের প্রবর্তক হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। জন্মেছিলেন তিনি ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের ইগলস ফিল্ড নামে এক অখ্যাত গ্রামে।
যে পাড়াতে তিনি জন্মেছিলেন, সেটা ছিল তাঁতিদের পাড়া। তাঁত বুনে জীবন নির্বাহ করাই ছিল ওই পাড়ার মানুষদের একমাত্র কাজ। পুরুষানুক্রমে এঁরা ছিলেন নিরক্ষর। নিজের নাম সই করতে পারতেন না। লেখাপড়ার সঙ্গে সম্পূর্ন সম্পর্কশূন্য হয়ে জীবন কাটাতেন।
কারোর হাতেই পয়সাকড়ি বিশেষ থাকত না। সকলেই ছিলেন হতদরিদ্র। খাবার সংস্থান করতেই দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যেত। অবসর বিনোদনের কোনো সুযোগ ছিল না। ওরই মধ্যে কি একটা রোগ মহামারি আকার ধারণ করত। তখন ওঝাকে ডাকতে হত। তিনি এসে ঝাড়ফুঁক করতেন। নাকের ভিতর লঙ্কাপোড়ার ধোঁয়া ঢুকিয়ে দিতেন। হ্যাঁচ্চ হ্যাঁচ্ছ করে জীবন বেরিয়ে যেত। 
সে এক ভয়ংকর দিন ! অভিশপ্ত রাত ! এভাবেই জন ডালটনের ছোটোবেলা কেটে যায়।
ডালটনও ভেবেছিলেন তাঁতি হবেন। সাধ্যমতো চেষ্টাও করেছেন বাবাকে সাহায্য করতে। কিন্তু এরই পাশাপাশি আর-একটি কাজ তিনি করেছেন যত্নের সঙ্গে, যা সে যুগের কেউ ভাবতেই পারতেন না।
কি সেটা? পড়াশোনা। লেখাপড়ার প্রতি সহজাত আগ্রহ ছিল জন ডালটনের। সেই আগ্রহে নিতান্ত শৈশবকালেই স্থানীয় একটি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। স্কুলটি ছিল পাশের গ্রামে। অনেকটা পথ হাঁটতে হত তাকে। যখন তিনি বই বগলে করে স্কুলে যেতেন, সমবয়সীরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতেন তাঁর দিকে। আর ভাবতেন, জনের কি মাথা খারাপ হয়েছে? বিদয়ের জাহাজ হয়ে কি হবে?
আশ্চর্য মেধা ছিল জন ডালটনের। অতি অল্প সময়ে তিনি সহপাঠীদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। কথিত আছে, বিদ্যালয়ে পড়বার সময় নিজের চেষ্টাতে গ্রিক এবং লাতিনের মতো দুরূহ ভাষাদুটিকে আয়ত্ত করেছিলেন তিনি। তাই দেখা গেল, এগারো বছরের বালক জন ডালটন গড়গড় করে গ্রিক কবিতা আবৃত্তি করছেন। গ্রিক নাটকের সংলাপ বলছেন। লাতিন ভাষায় লেখা কঠিন মন্ত্র উচ্চারণ করছেন। তখনই তাঁর চারপাশে ভিড় জমে যেত। গুনমুগদ্ধ মানুষেরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন জন ডালটনের মুখের দিকে। অনেকে ভাবতেন, তিনি বোধহয় রূপকথার এক মহানায়ক। কেউ কেউ আবার তাঁর সঙ্গে অবতারবাদ জুড়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের চোখে জন ডালটন নতুন যুগের যীশুখ্রিস্ট।
ছোটবেলায় বিজ্ঞান এবং অঙ্কই বেশি ভালো লাগত তাঁর। যখন বয়স তাঁর বারো, তখন একটা অদ্ভুত কান্ড করে বসলেন জন ডালটন। নিজেই স্থির করলেন, তাঁতি পাড়ার খেলার সঙ্গীদের লেখাপড়া শেখাতে হবে। আর কতদিন এরা অজ্ঞানতার অন্ধকারে মুখ গুঁজে পড়ে থাকবে?
নিজেই একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুল খুলে ফেললেন জন ডালটন। নামেই কিন্ডারগার্টেন, বয়স্কদেরও শিক্ষা দিতে থাকলেন সেখানে। তখ। থেকেই জন ডালটন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, সব মানুষকে সাক্ষর করে তুলতে হবে। নিরক্ষর জীবন বড্ড অপমানের। প্রতি মুহূর্তে ঠকবার ভয় থাকে। যে জীবনকে আমরা শতবার ধিক্কার জনাব।
বাবর কাজে সাহায্য করতে হচ্ছে, স্কুলে যেতে হচ্ছে, পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে, আর তারই পাশে সন্ধ্যেবেলা আবার নিজে হাতে তৈরি ওই স্কুলে এসে পড়াতে হচ্ছে। এইভাবে সকাল থেকে রাত অব্দি নানা ধরনের কাজে ব্যস্ত থাকতে হত জন ডালটনকে।
প্রথমদিকে পাড়ার সকলে ডালটনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। বিদ্যাশিক্ষার এই ব্যাপারটিকে তাঁরা ভালো মনে গ্রহণ করতে পারেননি। অনেকেই আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিক্ষোভ দেখানো হয়েছিল ডালটনের বিরুদ্ধে। শেষপর্যন্ত সকলেই তাদের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। প্রত্যেকেই শিক্ষার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
অঙ্কই ভালোবাসতেন ডালটন। কঠিন কঠিন অঙ্ক কষতে কষতে রাত কেটে যেত। তবুও এতটুকু ক্লান্তি ছিল না তার।
আঠারো বছর বয়সেই ছোটখাটো বিজ্ঞান মডেল তৈরি করতে থাকেন। সেসব নিয়ে আপন খেয়ালেই একটির পর একটি পরীক্ষা চালাতে থাকেন। তারপর একটি খাতায় পরীক্ষার বিভিন্ন অবস্থা ও সিন্ধান্তের বিবরণ লিখতে থাকেন।
বিখ্যাত শিল্পনগরী ম্যাঞ্চেস্টার। কলেজের পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই ডালটন এম এস সি ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন একজন অধ্যাপক হিসেবে।
পরবর্তী কালে জন ডালটন পরমাণুবাদতত্ত্ব প্রকাশ করেন। তিনিই প্রথম বলেন যে, প্রতিটি মৌলিক পদার্থ অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কনা দিয়ে গঠিত। এই কনাগুলি অবিভাজ্য। প্রত্যেকেই পরস্পরের সঙ্গে একটা নির্দিষ্ট ব্যবধানে অবস্থান করছে। তিনি আরো বলেছিলেন, এই কনাকে ভাঙা কিংবা গড়া যায় না। প্রত্যেকটি মৌলিক পদার্থের কনাগুলির ওজন এবং ধর্ম এক।
গ্রিক ভাষা ভালোভাবে জানতেন বলে, প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানচর্চা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে উঠেছিলন তিনি। গণিত বিজ্ঞানী ডেমোক্রিটাসের মতামতকে আশ্রয় করেই ডালটন তাঁর পরমাণুতত্ত্ব প্ৰতিষ্ঠা করেন। ডেমোক্রেটিস অবিভাজ্য কনাগুলির নাম দিয়েছিলেন 'অ্যাটমস'। এই গ্রিক শব্দটির অর্থ 'অবিভাজ্য'। ডালটন এই শব্দটিকে গ্রহণ করলেন 'স' অক্ষরটিকে বাদ দিয়ে। জন্ম হল 'অ্যাটম' এর।
জীবদ্দশাতেই তিনি এক বিশিষ্ট অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী হিসেবে জগৎজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সারাজীবনে অনেক সম্মান ও পুরুষ্কার লাভ করেন। ফ্রান্সের বিজ্ঞান অ্যাকাডেমী তাঁকে মাননীয় সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।
১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে এই নিরভিমানী মৃত্যু হয়।
তাঁতির ছেলে হয়ে উঠলো জগতসেরা বিজ্ঞানী , পড়ুন জীবনী তাঁতির ছেলে হয়ে উঠলো জগতসেরা বিজ্ঞানী , পড়ুন জীবনী Reviewed by Kona Dey Chakraborty on October 10, 2018 Rating: 5

শরীরের উইরিক অ্যাসিডই কি বাতের কারন ? জেনে নিন বাত সম্বন্ধে

October 09, 2018

গাউট অর্থাৎ বাত কী?

ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ শরীরে বেড়ে গেলে তা শরীরের নানা জায়গায় গিয়ে জমা হয়। সব থেকে বেশি জমা হয় শরীরের জয়েন্টে। তখন জয়েন্টগুলোতেও এক ধরনের ইনফ্লামেশন হয় বা ফুলে যায়। এটা সব থেকে বেশি হয় আমাদের পায়ের বুড়ো আঙুলে। এছাড়া হাঁটু, গোড়ালি বা শরীরের অন্য নানা জয়েন্টেও হতে পারে। খুব বেশি জমা হলে ওইখানে ব্যাথা হয়, লাল হয়ে যায় এবং ফুলে যায়। একে বলে অ্যাকিউট গাউটি আর্থ্রাইটিস।

ইউরিক অ্যাসিড বাড়ে কেন?

ইউরিক অ্যাসিড আমাদের সবার শরীরেই থাকে। এর দুই তৃতীয়াংশ তৈরি হয় শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়। আর এক তৃতীয়াংশের উৎস হল খাদ্য। আমরা যে ধরনের খাবার খাই তার থেকেও শরীরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড ঢুকতে পারে। যেমন বেশি হচ্ছে বিয়ার, অ্যালকোহল থেকে প্রচুর ইউরিক অ্যাসিড তৈরি হয় শরীরে। আবার যে কোনও ধরনের মাংস, বিশেষ করে অর্গান মিট বা শরীরের যন্ত্রাংশের মাংশ যেমন মেটে, সি-ফুড, শেল-ফিশ যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, নান ধরনের বিনস থেকেও শরীরে তৈরি হয় ইউরিক অ্যাসিড। আরেকটা কারণ হল শরীরের ভিতরেই অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড তৈরি হওয়া। লিউকোমিয়াজাতীয় ক্যানসারের মতো কিছু রোগে এই রকম হতে পারে। দেখুন, আমাদের শরীর থেকে ইউরিক অ্যাসিড প্রস্রাবের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যায়। এখন কিডনিতে কোনও সমস্যা হলে আমাদের শরীর থেকে অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ব্যহত হতে পারে। অনেক সময় উপোস করা কিমবা খুব তাড়াতাড়ি ওজন কমালেও ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যায়। এছাড়াও একটা বিরল সম্ভাবনা হল, বংশানুক্রমিকভাবে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়া। এটাকে বলা হয় লেশ-নিহ্যান সিনড্রোম। অনেক সময় কিছু কিছু ওষুধের জন্যও ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যেতে পারে।

গাউট কি বাত? 

সাধারণ বাত বলতে বোঝা হয় আর্থারাইটিস। এর মধ্যে সব থেকে বেশি হয় অস্কিওআর্থ্রাইটিস। এটা সাধারণত শরীরের ওজন বহনকারী জয়েন্টগুলোতে হয় যেমন হাঁটু গোড়ালি এইসব জায়গায়।কারও কারও ক্ষেত্রে কনুই, কাঁধ এবং কমরেও হতে পারে। এর বাইরেও ছোটবেলায় কোনও জয়েন্টে আঘাত লেগেছে, সেটা থেকেও বাত হতে পারে। এটা এক ধরনের অষ্টিওআর্থ্রাইটিস। কিন্তু এটাকে বলা হয় পোস্ট ট্রমাটিক আর্থ্রাইটিস। এইগুলো হল নানা ধরনের বাত। এছাড়াও এক ধরনের বংশানুক্রমিক অর্থোপ্যাথি আছে। এই ধরনের বাত শরীরের নানা জয়েন্টে অ্যাটাক করতে পারে যেমন হাতে, মেরুদণ্ডে। এইগুলোর মধ্যে সব থেকে কমন হল রিউম্যাটইয়েড আর্থ্রাইটিস, অ্যাঙ্কোলাইজিং স্পন্ডিলাইটিস এর বাইরেও একরকম আর্থ্রাইটিস আছে যাকে আমরা বলি ক্রিস্টাল আর্থোপ্যাথি। ইউরিক অ্যাসিড থেকে গাউট হওয়াটা এই ধরনের। এই রোগে ইউরিক অ্যাসিডের ক্রিস্টাল জয়েন্টে গিয়ে জমা হয়। এই ধরনের আর্থ্রাইটিস ইউরিক অ্যাসিডের জন্য হতে পারে। সেই অর্থে গাউটটা হল ক্রিস্টাল অর্থোপ্যাথির একটা দিক।

গাউট-এর চিকিৎসা কীভাবে হয়?

 গাউট হলে প্রথমেই দেখতে হবে ইউরিক অ্যাসিড শরীরে বাড়ছে কেন। যদি ক্যানসার বা এই জাতীয় কারণে হয় তবে তাঁর চিকিৎসা করতে হবে। যদি শরীর থেকে ইউরিক অ্যাসিড বার করতে কিডনির সমস্যা হয় তাহলে কিডনির চিকিৎসা করাতে হবে। যদি কোনও  ওষুধ থেকে হয়, তাহলে সেই ওষুধগুলোকে বদলে দেওয়া বা বন্ধ করতে হবে। যদি খাবার থেকে হয়, তাহলে অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড আছে এমন খাবার খাওয়া বন্ধ করা। এর সঙ্গে সবথেকে উপকারী হল জীবনযাত্রার পরিবর্তন জরুরি।

কী ধরনের জটিলতা হতে পারে?

নানা জয়েন্টে গাউট হলে হাঁটাচলার কাজকর্মে অসুবিধা হতে পারে। সফট টিস্যুতে ইউরিক অ্যাসিড জমলে সেইখানেও ব্যাথা হয়।

গাউটের চিকিৎসার কেমন সময় লাগে?

যাদের একবার গাউট হয়েছে, তাঁদের বারবার গাউট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যখন খুব জটিল সমস্যা হয় তখন পা-টাকে উঠিয়ে রাখতে হবে। বরফ দিতে হয়। ব্যাথার ওষুধ খেতে বলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধে ব্যাথা কমে না। তখন স্টেরয়েড দিতে হতে পারে। যখন এই অ্যাকিউট অ্যাটাকটা কমে যায়, তখন দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা শুরু করতে হয়।

বাত সারাতে অপারেশন

বিরাশি বছর বয়সি বিমানবাবুর কথা দিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক। অনেকদিন ধরে তিনি হাঁটুর সমস্যায় ভুগছেন। তার ওপর আবার কার্ডিয়াক, নিউরোলজিক্যাল সমস্যাও রয়েছে তাঁর। খুব পজিটিভ মানুষ হলেও হাঁটুর অপারেশন করাতে ভয় পাচ্ছেন। কীসের ভয়? উত্তরে তিনি বললেন,'দেখলেন না প্রাক্তন এক প্রধানমন্ত্রীর এই অপারেশন করে কী হয়েছিল? তিনি নাকি লন্ডনে গিয়ে অপারেশন করেছিলেন। তাতেও দেখুন..." ভদ্রলোককে বুঝিয়ে বললাম, 'আপনি কিছুই খবর রাখেন না। তাই এরকম নেগেটিভ কথা বলছেন। আসলে আমাদের দেশের বহু মানুষেরই এটা ধারণা যে বিদেশে গিয়ে অপারেশন করিয়েও আমাদের দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নি-রিপ্লেসমেন্ট সাকসেসফুল হয়নি। প্রথমত, বিদেশে গিয়ে তিনি অপারেশন করাননি। তখনকার বম্বে আর আজকের মুম্বাইয়ের চিকিৎসক সি.এস. রানাওয়াতের নেতৃত্বে ডাক্তারদের এক বিশেষ মেডিক্যাল টিম ওই অপারেশন করেছিলেন। আর যারা বলেন যে ওঁর অপারেশন সাকসেসফুল হয়নি তাঁরা কি করে জানলেন সেটা। ওই যে ভুত দেখা মানুষকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি যেমন বলেন, ওই অমুকে দেখেছেন। ব্যাপারটা এমনই। 
আসলে বাস্তবতা অন্য। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নি রিপ্লেসমেন্ট শুধু সাকসেসফুল হয়েছিল তাই-ই নয়, তিনি যথেষ্ঠ সুস্থ হয়েওছিলেন। তাহলে এমন গুজব কেন? অপারেশনের পর তো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ওবামা সাহেবের মতো গটগট হরে হাঁটছেন না। এবার এই বিষয়েই একটু বিস্তারিত আলোকপাত করা যাক। 

এক্সারসাইজ প্রয়োজন

একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, কঙ্কাল কিন্তু হাঁটতে পারে না।
হাঁটার জন্য যে শক্তি দরকার তা আসে মাংসপেশি থেকে। অর্থাৎ যতক্ষন না পর্যন্ত মাসল পাওয়ার সঠিকভাবে ব্যালান্সড হবে ততক্ষণ পর্যন্ত হাঁটু বা হিপের এক্স-রে যতই সুন্দর হোক না কেন সঠিকভাবে এবং সাবলীলভাবে হাঁটার ক্ষমতা অপূর্ণ থেকে যাবে। নি-রিপ্লেসমেন্ট করার আগে রোগীকে বেশ কিছু এক্সারসাইজ দেওয়া হয়। সেই এক্সারসাইজ প্রতিদিন নিয়ম মেনে করতেই হবে। যতই কষ্ট হোক না কেন এই এক্সারসাইজ করতে হবে। আবার অপারেশনের পরেও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে কিছু ব্যায়াম করতে হয়। আমার বিশ্বাস, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে যতটা এক্সারসাইজ প্রোগ্রাম করানো দরকার ছিল ততটা বাস্তবে রুপায়িত করা সম্ভব হয়নি। যাই হোক, আমার ধারণা সঠিক নাও হতে পারে। 

নি-রিপ্লেসমেন্ট আসলে কী?

প্রথমেই কোর ম্যাটারে আসা যাক। 'হাঁটু পালটানো'-র অপারেশনকে সাধারণত টোটাল নি-রিপ্লেসমেন্ট বলা হয়। সত্যিটা হল, টোটাল নি-রিপ্লেসমেন্ট করা যায় না। তাহলে রোগী আর হাঁটতে পারবেন না। কারণ হাঁটু মানে কিন্তু দুটো  বোনের মাথা আর সামনে একটা মালাইচাকি নয়। অর্থাৎ যেটুকু কঙ্কালের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। হাঁটুকে পূর্ণ রুপ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সফট টিস্যু থাকে। যেমন-সাইনুভিয়াল ক্যাপসুল, লিগামেন্টস, টেনডনস। ফ্যাট আর চামড়া তো বাদই দিলাম। আসলে অপারেশনের মাধ্যমে ব্যালেন্সিং করা পুরো বিষয়টা।

শরীরের উইরিক অ্যাসিডই কি বাতের কারন ? জেনে নিন বাত সম্বন্ধে শরীরের উইরিক অ্যাসিডই কি বাতের কারন ? জেনে নিন বাত সম্বন্ধে Reviewed by Kona Dey Chakraborty on October 09, 2018 Rating: 5

শৈশবে পিতৃহারা গোপাল হয়ে উঠেছিল ভারতসেরা গবেষক - পড়ুন জীবনী

October 09, 2018

গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য (জন্ম : ১৮৯৫ খ্রি. , মৃত্যু : ১৯৮১ খ্রি.)

ছোটোবেলা কেটে গিয়েছিল বনেবাদাড়ে। সারাদিন ঘুরে বেড়াতেন সেখানে। দেখতেন কেঁচোদের কীর্তিকলাপ। ভালোবাসতেন কালো মাকড়সার সন্ধানে কোনো এক বৃষ্টি হব হব দুপুরে দূর নির্জন প্রান্তরে ছুটে বেড়াতে।
তিনি কে? চিনতে কি পারছ তাঁকে? তিনি হলেন প্রকৃতিবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ! বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশের ছাড়পত্র ছিলনা তাঁর। শেষ অবধি তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তীর এক মহানায়ক।
জন্ম হয়েছিল তাঁর বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার লনসিং গ্রামে। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের ১লা আগস্ট তারিখে। বাবার নাম অম্বিকাচরন, মায়ের নাম শশিমুখী দেবী।
গোপালচন্দ্রের বাবা অম্বিকাচরণ ব্রাহ্মণ হিসেবে চার বিঘে ব্রহ্মত্র নিষ্কর জমি পেয়েছিলেন। ছিলেন তিনি গ্রামের জমিদার বাড়ির কুলপুরোহিত। যজন, যাজন আর সংস্কৃত চর্চা নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত থাকতেন। এসব থেকে যে সামান্য আয় হত তাতে কোনোরকমে সংসার চলে যেত।
গোপালচন্দ্র তখন পাঁচ বছরের বালক, একদিনের জ্বরে অম্বিকাচরনের অকালমৃত্যু হল। বেচারি গোপালচন্দ্রকে সেই বয়সেই যজমানি করতে হত।
তারই পাশাপাশি তিনি স্কুলের পড়াশোনা চালিয়ে যান। প্রতি বছর ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতেন তিনি। দরিদ্র এবং মেধাবী ছাত্র বলে স্কুল কতৃপক্ষ বিনা বেতনে তাঁকে পড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
ছাত্র গোপালচন্দ্রকে খালবিল অতিক্রম করে স্কুলে যেতে হত। এইভাবে খুব কষ্ট করে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশ করেন। মার্কশিটে দেখা গেল সারা ফরিদপুর জেলায় তিনি পেয়েছেন সবথেকে বেশি নম্বর। লনসিং স্কুলে তিনিই ছিলেন প্রথম বিভাগের একমাত্র ছাত্র।
গ্রামবাসীরা গোপালচন্দ্রের সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন। সেখানে তাঁকে কাপ, মেডেল এবং কিছু অর্থ প্রদান করা হয়।
এবার গোপালচন্দ্র এলেন মহাবিদ্যালয়ের অঙ্গনে। ভর্তি হলেন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে। থাকতে হত তাঁকে কলেজ হোস্টেলে। তখন তিনি দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছেন, চারপাশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে লাগল। এরই মধ্যে যিনি গোপালচন্দ্রের পড়ার খরচ চালাতেন, তিনি টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলেন। তাঁর নিজের পক্ষে হোস্টেলের খরচ চালানো সম্ভব ছিলনা।  অন্যের সাহায্যে এতদিন কোনোরকমে কায়ক্লেশে খরচা চালিয়ে ছিলেন। এবার কলেজের পড়া সাঙ্গ হল। কলেজ ছাড়তে হল, পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্ক চিরদিনের মতো ছিন্ন হয়ে গেল সেদিনের কিশোর গোপালচন্দ্রের।
ময়মনসিংহ থেকে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে এলেন গোপালচন্দ্র। তখন তাঁর বয়স মাত্র উনিশ বছর। তখনকার প্রথা অনুযায়ী ওই বয়সেই গোপালচন্দ্রকে বসতে হল বিয়ের পিঁড়িতে। বিয়ে হল ফরিদপুরের শ্রীনাথ চক্রবর্তীর বড়ো মেয়ে শ্রীমতী লাবণ্যময়ী দেবীর সঙ্গে। তখন কনের বয়স ছিল মাত্র বারো বছর।
সাংসারিক অবস্থার কথা ভেবে তাকে স্কুলের শিক্ষকতার কাজে যোগ দিতে হয়েছিল। লোনসিং গ্রামের স্কুলে তিনি চারবছর ধরে ভূগোল পড়িয়েছিলেন। শুধুমাত্র ছাত্রদের পরিয়েই তিনি খুশি থকেতেন না। সময় পেলেই আবার শুরু করতেন তাঁর প্রকৃতিচর্চা। বনবাদার, ঝোপজঙ্গলের পরিত্যক্ত স্থানে ঘুরে বেড়াতেন। কীটপতঙ্গের ওপর ছিল তাঁর বিশেষ আকর্ষণ। তারা কি খায়, কোথায় যায়, কেমনভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করে, তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন। স্কুলের বাগানে ছাত্রদের নিয়ে পরীক্ষা করতেন। কৃত্রিম উপায়ে কিভাবে পরাগসংযোগ ঘটানো যেতে পারে তার চেষ্টা করতেন। কলম করে একই গাছে দু-তিন রকমের ফুল ফোটানো ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয় শখ।
সমাজসেবার কাজেও যোগ দিলেন সদ্য তরুণ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য। সে সময়ে বাংলার গ্রামগুলির অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। সমাজে ছিল নানা ধরনের কুসংস্কার। গ্রামে তথাকথিত নিচু শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি 'কমলকুঠি' নামে একটি সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে বিনা বেতনে পড়ানো হত। গ্রামের মেয়েদের হাতের কাজ শেখানো হত। প্রত্যেক শনিবার নমঃশূদ্রের বৈঠক বসত। গোপালচন্দ্র সেখানে নিয়মিতভাবে উপস্থিত হতেন। নানাধরনের আলোচনায় অংশ নিতেন। ওই বয়সেই তিনি এমন ধরনের জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিতেন যা শুনে প্রবীণ প্রাজ্ঞ মানুষরা পর্যন্ত অবাক হয়ে যেতেন।
তখন গ্রামের জমিদার বাড়িতে দুর্গা পুজো হত। গরিব লোকেরা সেখানে যোগ দিতে পারতেন না। এজন্য তাদের মনের ভেতরে ক্ষোভ জন্মেছিল। গোপালচন্দ্র নিচু সম্প্রদায়ের লোকদের বোঝালেন, দুর্গা পুজোয় তাদেরও সমানভাবে অংশ নেওয়ার অধিকার আছে। তারা ইচ্ছে করলে গ্রামের কালিতলাতে আলাদা করে পুজো করতে পারে।
এভাবে সেই বয়সেই তিনি অসাধারন সংগঠনী শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে এই বিষয়ে বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি। কেন-না তারপর তাকে বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে যোগদানের জন্যে কলকাতায় চলে আসতে হয়। জীবনটা অন্য প্রবাহে বইতে থাকে।
পরবর্তীকালে নানা জায়গা থেকে সম্মান এবং পদক পেয়েছিলেন গোপালচন্দ্র। বসুবিজ্ঞান মন্দির তাকে 'বিবিড' মেডেল দিয়েছিল। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ তাঁকে দিয়েছিলে 'সত্যেন্দ্রনাথ বসু পদক'।
ভারী সুন্দর প্রবন্ধ লিখতে পারতেন তিনি। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলিকে সহজবোধ্য করে তুলে ধরতেন। তাঁর লেখা 'বাংলার কীটপতঙ্গ' বইটি সাহিত্য বিজ্ঞানে রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ৮ই এপ্রিল তারিখে প্রকৃতিবিজ্ঞনী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য লোকান্তরিত হন।

শৈশবে পিতৃহারা গোপাল হয়ে উঠেছিল ভারতসেরা গবেষক - পড়ুন জীবনী শৈশবে পিতৃহারা গোপাল হয়ে উঠেছিল ভারতসেরা গবেষক - পড়ুন জীবনী Reviewed by Kona Dey Chakraborty on October 09, 2018 Rating: 5

কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে হয়েছিলেন পৃথিবীর সেরা জ্যোতির্বিজ্ঞানী - টাইকো ব্রাহের জীবনী

October 07, 2018

টাইকো ব্রাহে (জন্ম : ১৫৪৬ খ্রি., মৃত্যু : ১৬০১ খ্রি.)

তোমরা নিশ্চয়ই হ্যামলেট পড়েছ। হ্যামলেটের দৌলতে বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছে ডেনমার্কের ছোট্ট শহর এলসিনো। এই শহরেই জন্মেছিলেন বিজ্ঞানের এক মহান প্রতিভা টাইকো ব্রাহে !
টাইকো ব্রাহে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছেন আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জকে। তাকিয়ে থেকেছেন জ্যোতিষ্কমন্ডলীর দিকে। মনের ভেতর হাজার প্রশ্নের উতরোল। কোন তারার কি গল্প, তা তাঁকে জানতেই হবে। শুনতে হবে, কৃষ্ণনক্ষত্রের রহস্য কথা। সবথেকে অবাক করা খবর হল, সারা জীবন টাইকো ব্রাহে কিন্তু খালি চোখেই আকাশ দেখেছিলেন। কেন-না তখনও পযর্ন্ত দূরবিন আবিষ্কৃত হয়নি। কিভাবে খালি চোখে আকাশ পর্যবেক্ষন করে তিনি এত কথা জেনেছিলেন তা ভাবলে আমাদের অবাক হতে হয় ! আজ বিজ্ঞান অনেক উন্নত হয়েছে। আজ প্রতিটি গবেষণাগারে অতি-উন্নত টেলিস্কোপ, দুরবিন বসানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা টাইকো ব্রাহেকে অতিক্রম করতে পারছিনা। এমনকি বর্তমান যুগের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও এককথায় তার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন।
এবার এসো, আমরা টাইকো ব্রাহের ছোটবেলার দিনগুলির কথা বলি। জন্ম হয়েছিল তাঁর ১৫৪৬ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের এক জমিদার বংশে। তাঁর আসল নাম ছিল টাইজি। ছোটবেলার দিনগুলি কেটে গিয়েছিল নিঃসন্তান এক কাকার কাছে। কাকা ছিলেন অন্য ঘরানার মানুষ। বিলাসিত জীবনকে ঘৃণা করতেন তিনি। অভিজাত বংশের সন্তান হলে কি হবে, কাকা সবসময় চেয়েছিলেন মানুষের মতো মানুষ হয়ে সমাজের বুকে বেঁচে থাকতে। ছোট্টবেলায় কাকার কাছ থেকেই টাইকো নানা বিদ্যায় বিদ্বান হয়ে ওঠেন। বিদ্যা মানে শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়। পড়াশোনার বইয়ের বাইরে যে বিরাট জগৎ আছে, যে জগতে সূর্যের আলোর ঝলকানি এবং চাঁদের জোছনা ধারা, সেই জগৎ সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে হবে - এটাই ছিল কাকার সারাজীবনের উদ্দেশ্য ! ভাইপোর মধ্যে তিনি এই ব্যাপারটিকে ভালোমতোই ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন। পথের বাধাকে অগ্রাহ্য করে কিভাবে নিজের গতিপথকে অব্যাহত রাখতে হয়, সেই শিক্ষাও টাইকো কাকার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। তাই দেখা গেল, দশ বছরের ছোট্ট তাইজি প্রকৃতির বুকে তন্ময় হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ফুলে ফুলে মৌমাছি কি করছে, তা জানতে ভারি শখ ছিল তাঁর। অবাক বিস্ময়ে তিনি প্রত্যক্ষ করতেন গোধূলির রক্তরাগ। দেখতেন, হঠাৎ কখন আকাশের পরিবেশ পাল্টে যাচ্ছে ; দূর থেকে ছুটে আসছে দুষ্টু কালো মেঘের দল ; ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি-সেনারা শুরু করেছে তাদের বাঁধনভাঙা তান্ডব !
বলো না আঙ্কেল, এসব কেন হয়? সত্যি সত্যি কোনো একটা দত্যি বসে আছে আকাশের অন্তরালে ? সে হঠাৎ রেগে গেলে কড়কড়-করাত শব্দে বাজ পড়ে ! আর তার চোখের জল বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে পৃথিবীর বুকে?
বেচারি কাকা আর কি করেন, ভাইপোর বকর বকর শুনতে হয়, আর বানানো গল্পকথা বলতে হয়। ভাইপোর তাইজি কিন্তু ধরে ফেলতে পারতেন, কাকা বানিয়ে বানিয়ে বলছেন। সঙ্গে সঙ্গে ভুল শুধরাতে হত কাকাকে। এইভাবেই কাকা আর ভাইপোর মধ্যে সুন্দর বন্ধুতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বারো বছর বয়সে আকাশকে নিয়ে গান লিখেছেন টাইকো ব্রাহে। সেই গানে তিনি নিজেই সুর দিয়েছিলেন। পাড়ার জলসাতে সেই গান নিজেই গেয়ে ছিলেন। ভারী সুন্দর গলা ছিল তাঁর ! চোখ বন্ধ করে যখন তিনি গান গাইতেন, সকলে অবাক হয়ে শুনতেন। এক কিশোর প্রতিভার এই বিচ্ছুরণ দেখে মনে মনে তাঁরা খুশি হতেন।
সকলেই ভেবেছিলেন, ভবিষ্যতে টাইকো ব্রাহে একজন নামকরা কবি-গাইয়ে হবেন। তাঁর কবিতা মানুষের মর্মস্থলকে ছুঁয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। স্কুলের পাঠ শেষ করে টাইকো দর্শন এবং সাহিত্য ক্লাসের ছাত্র হয়েছিলেন। ভর্তি হয়েছিলেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে।
এই সময়ে তাঁর জীবনে একটি আকস্মিক ঘটনা ঘটে যায়। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে টাইকো ব্রাহের ভবিষ্যৎ জীবনের গতিপথ নির্ণীত হয়। তিনি ভেবেছিলেন সাহিত্যিক হবেন, হয়ে যান বিজ্ঞানী। এসো আমরা সংক্ষেপে সেই ঘটনার কথা বলি।
১৫৬০ খ্রিস্টাব্দর আগস্ট মাস। ডেনমার্কের কয়েকজন জ্যোতিষী আগে থেকেই বলেছেন যে কবে গ্রহণ দেখা দেবে। গ্রহণের সময়টাও তারা নির্দিষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন।
প্রথমদিকে ব্যাপারটিকে কেউ আমল দেয়নি। কিন্তু দেখা গেল সত্যি সত্যি নির্দিষ্ট দিনে সূর্যের মুখ ঢাকা পড়ে গেল কালো চাদরে। আঁধার ঘনিয়ে এল। পাখিরা কুলায় ফিরে গেল। ঠান্ডা বাতাস বইল। এই ঘটানটি টাইকো ব্রাহেকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল। টাইকো ব্রাহে একেবারে অভিভূত হয়েগিয়েছিলন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বিজ্ঞানই হল অবিসংবাদিত সত্য। বিজ্ঞানের মধ্যে আবেগের কোনো স্থান নেই। কষ্টকল্পনার আসন নেই। যে সত্যি, বিজ্ঞান তাকেই প্রকাশ করে। তিনি আরো বুঝতে পারলেন, গ্রহ-নক্ষত্রের গতি হিসেব করে জ্যোতিষীরা অনেক কথা বলতে পারেন। তার মনে এই প্রত্যয় দৃঢ়ভাবে জন্মাল যে গ্রহ নক্ষত্রের উপর নজর রাখলে আমরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আসল রহস্য উদঘাটন করতে পারব।
আজ থেকে আর কবিতা লিখবনা, গান লিখব না, সুর দেব না। এমন একটা কঠিন কঠোর সিন্ধান্ত নিয়ে বসলেন টাইকো। সব কাজ ফেলে রেখে তিনি টলেমির জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন। শুরু হল জ্যোতিষশাস্ত্রে তাঁর নির্ভীক আনাগোনা। 
তাঁর হাতে ষোড়শ শতকের জ্যোতির্বিজ্ঞান নতুন রুপ লাভ করল। ডেনমার্কের লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয় তখন জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। দেশের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 
টাইকোর অনেকদিনের ইচ্ছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন। মনের কথা জানিয়ে বাবাকে একখানা চিঠি দিলেন তিনি। তারপর নাম লেখালেন লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান ক্লাসে। 
ক্লাসে পড়তে পড়তে তিনি আকাশ পর্যবেক্ষন করতে শুরু করেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অনিদ্রিত রাত কেটে যেত। টাইকোর কোনো ক্লান্তি নেই। তিনি সিন্ধান্ত নিয়েছেন যে করেই হোক, ওই অনন্ত মহাকাশের অজানাকে জনাতে হবে। দিনের পর দিন কেটে যেতে লাগল। বন্ধুবান্ধবরা ভাবতে লাগলেন, টাইকোর বোধহয় মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কেউ তার সঙ্গে বড়ো-একটা কথা বলতেন না। টাইকোর দু-চোখে তখন স্বপ্নের ঘোর লেগেছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গজিয়েছে। দাঁড়ি কামানোর সময় পাচ্ছেন না তিনি। এলোমেলো চুলে হাত চিরুনি চালিয়ে দিচ্ছেন। অনেকদিন স্নান পর্যন্ত করতে ভুলে যান। কেমন যেন পাগল পাগল অবস্থা। 
টাইকো ব্রাহে বুঝতে পেরেছিলেন, এখনও বিজ্ঞানের এই শাখা সম্বন্ধে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান আমরা আয়ত্ত করতে পারিনি, এখনও এই বিষয়টি আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারিনি। বেশিরভাগটাই আচ্ছন্ন হয়ে আছে কুসংস্কারের মধ্যে। মানুষ আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জকে পর্যবেক্ষন করে ভয়মিশ্রিত কৌতূহলের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তা কেন হবে ? প্রকৃতি তার অপার রহস্য থরে থরে সাজিয়ে রেখেছে আমাদের চারপাশে। আমরা কেন উৎসাহী ছাত্র হয়ে সেই জগতে প্রবেশ করব না? আমরা কেন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকবনা প্রাকৃতিক ঘটনাবলির দিকে !
১৫৭২ সালের ১১ই নভেম্বর রাতে তিনি আকাশে একখানি বেশ উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখতে পান। দীর্ঘ আঠারো মাস ধরে নিজের তৈরি যন্ত্রপাতি দিয়ে টাইকো তারাটি কৌণিক দূরত্ব, বর্ন, আলোর তারতম্য বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে ফেলেন। আসলে এটি ছিল নোভা অর্থাৎ সব নক্ষত্র। জ্যোতির্বিদ টাইকো সেইসময় নোভা পর্যবেক্ষন করে 'দি নোভাস্টেলা' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসাবে টাইকো ব্রাহের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো ইউরোপে। তিনিই প্রথম জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক অনেকগুলি যন্ত্র নির্মাণ করেছিলেন। কোয়াড্রান্ট যন্ত্র ছাড়াও বানিয়েছিলেন আর্সিলারি গোলক। দূরের নক্ষত্রের সঠিক অবস্থান বোঝার জন্য 'এডিলেড' যন্ত্র তিনি আবিষ্কার করেন।।বলা যেতে পারে টাইকো ব্রাহে আমাদের নৈসরগ চেতনার একেবারে মূলে আঘাত করতে চেয়েছিলেন। বিজ্ঞানকে তিনি আরো পরিশিলিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। এই পথে অনেক বাধা ছিল। শেষ পর্যন্ত টাইকো ব্রাহে অধিকাংশ বাধাকে অতিক্রম করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীদের লেখার সঙ্গে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন তিনি। ১৫৮৮ সালে ধূমকেতু বিষয়ক গ্রন্থ 'De Mundi Aetherii Recentioribus' প্রকাশ করেছিলেন। গবেষণা করতে করতে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন জ্ঞানের এমন এক উচ্চতম শিখরে যে, লোকে অবাক বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকত!
তবুও টাইকো ব্রাহে কখনও ছেলেবেলার দিনগুলিকে ভুলতে পারেননি। যে-কোন কাজ করার আগে কাকার অনুমতি নিতেন। কাকই ছিল তার সমস্ত কাজের অনুপ্রেরণা, তার জীবনের পথ প্রদর্শক।
মহাবিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে ১৬০১ খ্রিস্টাব্দে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এখনো আমরা তাকে সর্বকালের শ্ৰেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম বলে সম্মান করি।
কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে হয়েছিলেন পৃথিবীর সেরা জ্যোতির্বিজ্ঞানী - টাইকো ব্রাহের জীবনী কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে হয়েছিলেন পৃথিবীর সেরা জ্যোতির্বিজ্ঞানী - টাইকো ব্রাহের জীবনী Reviewed by Kona Dey Chakraborty on October 07, 2018 Rating: 5

কালিম্পং ও লাভায় কি দেখবেন , কীভাবে যাবেন

October 05, 2018

কালিম্পং

ছোট শৈলশহর কালিম্পং। মনোরম আবহাওয়া এই অঞ্চলের প্রশস্তির কারণ। বাস স্ট্যান্ডের আশেপাশের ঘিঞ্জি অঞ্চল বাদ দিলে, এখানকার পাহাড়,  অরণ্য, দূষণহীন প্রকৃতি, সহজ সরল মানুষ, ছোটো ছোটো ক্ষেত, আর মেঘমুক্ত দিনে কাঞ্চনজঙ্ঘার ভেসে ওঠা তুসারচ্ছাদিত শৃঙ্গ---সব মিলিয়ে কালিম্পং অনন্য। রবীন্দ্রনাথের গৌরীপুর হাউস, গ্রাহাম সাহেবের গড়া মিশনারি আশ্রম, ক্যাকটাস-অর্কিড ফার্ম, চার্চ, গুম্ফা নিয়ে পূর্ব হিমালয়ের এই শহর প্রকৃতির অজস্র দানে সমৃদ্ধ এই কালিম্পং। এখানে শীত তেমন প্রবল নয়। দুর্গাপুজোর সময় কালিম্পং গেলে দেখা যায় গোর্খাদের দশই উৎসব। মহালয়ার দিন শুরু হয়ে চলে পূর্ণিমা পর্যন্ত। শক্তির প্রতীক হিসাবে কুকরির পূজা হয়। 
অতীতে এই অঞ্চল ছিল ভুটানে। কালিম অর্থাৎ রাজমন্ত্রী এবং পং বা শক্ত ঘাঁটি থেকেই নামকরণ কালিম্পং, যা ১৮৬৫ সালে অন্তর্ভুক্ত হয় ভারতের এবং ১৯১৬ সালে সাব ডিভিশনের মর্যাদা পায়। ১৯৫০-এ চীনের তিব্বত অধিগ্রহণ পর্যন্ত এই শহর ছিল উল ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র।
এই অঞ্চলের শ্বেতপাথরের মঙ্গলধামে রাধাকৃষ্ণের মন্দির পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখতে ভাল লাগে। শহর থেকে ৭ কিমি দূরে ৫৫০০ ফুট উচ্চতায় দেলো ভিউ পয়েন্ট, যা কালিম্পং এর সর্বোচ্চ স্থান। এখান থেকে কানিম্পং শহর ছাড়াও দেখা যায় দুরের বহমান তিস্তা। আবহাওয়া ভাল থাকলে দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার। পথের ধারে অজস্র অর্কিড আর ফুল যার খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। কাছেই কালিম্পং-এর পর্যটনের নবতম সংযোজন সাইন্স সিটি। ছোটদের খেলার সাথে বিজ্ঞানভিত্তিক শো, সঙ্গে ছোট্ট জুরাসিক পার্ক। দেলো থেকে ফেরার পথে চোখে পড়বে গ্রাহাম সাহেবের ভূমিকা অবিসংবাদিত।
কালিম্পঙয়ের গ্রাম, তিস্তা নদী, রেলি নদীকে উপর থেকে দেখা যায় জেলেপলা ভিউপয়েন্ট থেকে। এখানকার জং দং পারলি গুম্ফা, না দেখে ফেরা উচিত নয়। গুহার বাইরে রঙিন কারুকার্য। ভিতরে আধো আলোছায়ায় গুরু পদ্মসম্ভবা আরও অনেকের মূর্তি। এখানকার দেওয়াল চিত্রগুলি অসাধারণ। রয়েছে নানান দুস্প্রাপ্য পুঁথি। গুম্ফায় শিশু লামাদের জীবনচর্চা প্রত্যক্ষ করা যায়। আর দোতলার বারান্দায় উঠলে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার অনুপম দৃশ্য। এছাড়াও কালীমন্দির, ক্যাকটাস-অর্কিডের পাইনভিউ নার্সারিও দর্শনীয়। শহরের দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে থার্পা চোলি গুম্ফা, কালিম্পং বঙ্কিম পার্ক, দুরপিন গুম্ফা, দুরপিন ভিউপয়েন্ট, গৌরীপুর হাউসের মতো দ্রষ্টব্যস্থানগুলি সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টার মধ্যে দেখে নেওয়া যায়। দমকার চকে পর্যটন দপ্তর থেকে এই সব ট্যুর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বুকিং করা যায়। 
বিগত কয়েক বছরের মধ্যেই দার্জিলিং জেলায় ক্রমশ জনপ্রিয়তা লাভ করছে হোম স্টে ট্যুরিজম। তথাকথিত উন্নত তথা প্রথিতযশা ভ্রমনকেন্দ্রের ভিড় এড়িয়ে তারাই অদুরে ছোট্ট গ্রামের একটি বা দুটি বাড়িতে স্থানীয় মানুষ তাদের বাড়ির অব্যবহৃত কয়েকটি ঘরে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা রয়েছে। সঙ্গে সুযোগ রয়েছে তাঁদের সমাজ-সংস্কৃতির সাথে অতি নিকট আত্মীয়তার সুযোগ। কালিম্পং থেকে মাত্র ৬ কিমি দূরে এমনই এক গ্রাম,ছিরো। দুরপিন ভিউপয়েন্টের কাছেই এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িই যেন এক একটা ক্যাকটাস গার্ডেন। দূষণমুক্ত পরিবেশে পাইনের জঙ্গলে ঘেরা এই গ্রাম থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য অনন্য সুন্দর। সঙ্গে অতিরিক্ত পাওনা, জানা অজানা বিভিন্ন পাখির কলতান।
কালিম্পং থেকে ৯ কিমি দুরত্বে রেলি নদীতীরে রেলিখোলা। একদিকে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদীর জলধারা, অন্যদিকে তাকালেই শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা। প্রকৃতির নীরবতা ভঙ্গ করা পাখির কলতান মনকে ছুঁয়ে যায়।
কালিম্পং থেকে রংপোর পথে ১৪ কিমি দুরত্বে সাংসের। শান্ত, মনোরম এই গ্রামের খ্যাতি সিঙ্কোনা চাষের জন্য। রয়েছে শতবর্ষ প্রাচীন বাংলো, এখান থেকে দৃশ্যমান তিস্তার ধারা কাঞ্চনজঙ্ঘা। পায়ে হেঁটে গ্রামের আশেপাশে ঘুরে বেড়ালে দেখা মেলে বিভিন্ন পাখির।
কালিম্পং-এর ভিড় এড়িয়ে রেলির পথে মাত্র ৫ কিমি দুরত্বে পুড়ুং। স্থানীয় এক গ্রামবাসী তাঁর পুরনো বাড়িটির দোতলায় দুটি ঘরে রাত্রিবাসের ব্যাবস্থা রেখেছেন  উৎসাহী পর্যটকদের জন্য। শান্ত-স্নিগ্ধ-নির্মল প্রকৃতির মাঝে থাকার ফাঁকে বেরিয়ে পরা যায় গ্রামের আঁকা-বাঁকা পথের চড়াই-উৎরাই সামলে তথাকথিত 'ভিলেজ ওয়াক'-এ। 
কালিম্পং থেকে ১৪ কিমি দুরত্বে পর্যটনের নুতন ঠিকানা রামধুরা। সবুজে মোড়া মেঘের রাজ্য। সিঙ্কোনা চাষের জন্য খ্যাত এই পাহাড়ি গ্রাম অনেকের কাছে বার্মিক নমেও খ্যাত। এখান থেকে একই সাথে দৃশ্যমান কাঞ্চনজঙ্ঘা ও তিস্তা ভ্যালি। এমনকি পরিস্কার রাতে দৃশ্যমান দুরের দার্জিলিং শহরের আলোকমালা। রামধুরার অন্যতম আকর্ষণ জলসা বাংলো, যা তৈরি হয়েছিল ১৯৩০ সালে। কালিম্পং থেকে আসার পথে রয়েছে হনুমানটক ভিউ পয়েন্ট। উৎসাহীরা দেখে নিতে পারে মাধবধাম মন্দির। 
রামধুরা থেকে ২ কিমি দুরত্বে ৫৮০০ ফুট উচ্চতায় ইচ্ছেগাও। হোম স্টে কেন্দ্রীক এই অপরিচিত ভ্রমনকেন্দ্র থেকে মাত্র ঘণ্টা খানেকের ট্রেকপথে পৌঁছানো যায় সিলেরিগাও/ ঘন জঙ্গলের পথের দেখা মেলে বিভিন্ন রঙের মকড়সার। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়াও দেখা মেলে পূর্ব হিমালয়ের বেশ কয়েকটি বরফে মোড়া শৃঙ্গ।

কীভাবে যাবেনঃঃ শিলিগুড়ি থেকে ৭০ কিমি ও বাগডোগরা থেকে ৮০ কিমি দুরত্বে কালিম্পং। তেনজিং নোরগে বাস স্ট্যান্ড থেকে প্রতি আধ ঘণ্টা অন্তর বাস ছাড়ছে কালিম্পঙের। শিলিগুড়ির পানিট্যাঙ্কি জিপ স্ট্যান্ড থেকে কালিম্পঙের জিপ পাওয়া যায়। সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। দার্জিলিং থেকেও চলেছে শাটেল জিপ/গাড়ি। কালিম্পং থেকে গ্যাংটক যাওয়ার বাসও পাওয়া যায়। জিপ চলেছে আধ থেকে এক ঘণ্টা অন্তর। সময় লাগে ৩ ঘণ্টা। এছাড়াও লাভা-লোলেগাঁও-রিশপ-পেডং-হৃষি-নেওড়া ভ্যালি জঙ্গল ভ্রমনের গেটওয়ে বা প্রবেশদ্বার এই কালিম্পং। 


 লাভা 

কালিম্পং থেকে ৩২ কিমি দূরের ২১৮৪ মিটার উচ্চতায় পাইন-ফারের জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট শান্ত পাহাড়ি জনপদ লাভা। লাভা শব্দের অর্থ ঈশ্বরের বাসভূমি। কালিম্পং থেকে  আলগারা পেরিয়ে পথেই অনুভূত হবে নামকরণের যথার্থতা। একসময় দার্জিলিং জেলার পর্যটন মানচিত্রে থাকত দার্জিলিং-কালিম্পং-কার্শিয়াং, সঙ্গে সান্দাকুফু ও মিরিক। এই মানচিত্রে কালিম্পং-এর সীমানা ছড়িয়ে একে একে যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু ভ্রমনকেন্দ্র। ভৌগলিক অবস্থানের জন্য সেই তালিকায় প্রথমেই চলে আসে লাভার নাম। কারণ এই লাভা-কে কেন্দ্র করে একে একে ঘুরে নেওয়া যায় লোলেগাঁও-রিশপ-নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যান-চারখোলা-চুইমাখি এমনকি ঋষি-পেডং-ও। পর্যটনের প্রসারের ফলে যথেষ্ট জনবহুল হয়ে উঠেছে এই অঞ্চল, পড়েছে শহুরে ছাপ। এখান থেকে দেখা মেলে বেশ কয়েকটি গিরিশৃঙ্গ, যেমন কাঞ্চনজঙ্ঘা, কোকতাং, পান্ডিম, সিনিয়লচু ইত্যাদি। লাভা থেকে ৩ কিমি দূরে টিফিনদাড়া ভিউ পয়েন্ট থেকে সূর্যোদয় অসাধারণ। এখান থেকে রিশপ গিয়ে চরুইভাতি আয়োজন করা যায়। তবে বিকেলের মধ্যে লাভায় ফিরে আসা উচিত। সময় থাকলে পায়েহেটে ঘুরে নিতে পারেন নেওড়া ভ্যালি। 

কাছেই টিলার মাথায় বৌদ্ধদেব গুম্ফা। ভোরবেলায় ভেসে আদে লামাদের প্রার্থনা সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্রের গুরুগম্ভীর সুর। গুম্ফা প্রাঙ্গন থেকে দৃশ্যমান হয় পাহাড়ের ঢালে লাভা গ্রাম। পাহাড়ের উপর ঘন সবুজ পাইনের বন। লাভা ভ্রমনের সবচেয়ে ভালো সময় অক্টোবর থেকে এপ্রিল। বর্ষায় এখানে খুব জোঁকের উৎপাত হয়। মার্চ-এপ্রিলে লাভার প্রান্তর ফুলের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। মনে হয় ঈশ্বর যেন তার সব রঙ দিয়ে এখানে হোলি খেলেছেন।

লাভা থেকে মাত্র ৪ কিমি দুরত্বে সানফুং, অনেকে বলে লোয়ার রিশপ। একদিকে হিমালয়ের শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গরাজি, অন্যদিকে রডোডেনডরেনের বাহার। পক্ষীপ্রেমীদের কাছেও আকর্ষণীয় এই গ্রাম। সুযোগ রয়েছে ঘণ্টাখানেকের ট্র্যাকপথে সানফুং জলপ্রপাত দেখে আসার।

লাভা থেকে মাত্র ১৪ কিমি দুরত্বে ৬২০০ ফুট উচ্চতায় ঝান্ডি, দার্জিলিং জেলার নবতম পর্যটনকেন্দ্র। লাভা থেকে গরুবাথানের পথে এগিয়ে আলাদা পথ চলেছে ঝান্ডি পাহাড়ের প্রাচীন জনপদ আপার লুংসেল-এ। দূষণহীন পরিবেশে, সবুজে মোড়া এই জনপদ থেকে মেঘমুক্ত দিনে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অভিজ্ঞতা অনন্য। এখান থেকে দৃশ্যমান ডুয়ার্স ও তরাই। শিলিগুড়ি থেকে ডামডিম-গরুবাথান হয়ে দুরত্ব ৮৭ কিমি। আবার নিয় মাল জং থেকে চা বাগানের মধ্য দিয়ে পথ এসেছে ঝান্ডি, দুরত্ব ৩২ কিমি।তাই ডুয়ার্স ঘুরে সরাসরি দার্জিলিং-এর পাহাড়ে পৌঁছনোর মাঝে একরাত কাটানো যেতে পারে এই লুংসেল গ্রামে। 

কীভাবে যাবেনঃ কালিম্পং থেকে আলগারা হয়ে ৩৩ কিমি দুরত্বে লাভা। শিলিগুড়ি থেকে কালিম্পং হয়ে লাভার দুরত্ব ৯৯ কিমি, সময় লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা। তবে শিলিগুড়ি থেকে লাভা আসা যায় ওদালবাড়ি-ডমডিম-গরুবাথান হয়েও। তরাইয়ের পথে সময় একটু কম লাগে, সঙ্গে মেলে নতুন জায়গা দেখার অভিজ্ঞতাও। শিলিগুড়ি ও কালিম্পং থেকে বাস চলছে, লাভা। ফেরার বাস মেলে সকালের দিকে। শেয়ার জিপ মেলে কম,তাই উচিত হবে জিপ ভাড়া করে চলা। 

কালিম্পং ও লাভায় কি দেখবেন , কীভাবে যাবেন কালিম্পং ও লাভায় কি দেখবেন , কীভাবে যাবেন Reviewed by Kona Dey Chakraborty on October 05, 2018 Rating: 5

বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জীবনী ও আবিষ্কার

September 29, 2018

সত্যেন্দ্রনাথ বসু (জন্ম : ১৮৯৪ খ্রি., মৃত্যু : ১৯৭৪ খ্রি.)

অনেকে তাঁকে বলেন, সদ্যসমাপ্ত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি প্রতিভা। রবীন্দ্রনাথের কথা মনে রেখেও তাঁরা এই কথা উচ্চারণ করেন। তিনি হলেন আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু। যিনি গণিতে একশোর মধ্যে একশো দশ পেয়ে রেকর্ড করেছিলেন। যা আজও কিংবদন্তির বিষয় হয়ে কাছে।
জন্ম হয়েছিল তাঁর ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে ১লা জানুয়ারি তারিখে। বাবার নাম সুরেন্দ্রনাথ বসু। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের একটি দায়িত্বপূর্ন পদে কাজ করতেন। কলকাতা থেকে আটচল্লিশ কিলোমিটার দূরে নদিয়া জেলার বড়ো জগুলিয়া গ্রামে ছিল তাদের আদি বাড়ি। মায়ের নাম আমদিনী দেবী।
সত্যেন্দ্রনাথরা এক ভাই, ছয় বোন। তিনি সবার বড়ো। আট বছর বয়সে বাড়ির কাছে নরম্যাল স্কুলে পড়াশোনা শুরু হয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথের। একসময় রবীন্দ্রনাথও ওই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই সত্যেন্দ্রনাথ যন্ত্রপাতি নিয়ে খেলতে ভালোবাসতেন। একবার বাবার শখের হাতঘড়িটা খুলে ফেলেছিলেন। অফিস থেকে ফিরে এসে বাবা ছেলের ওই কান্ড দেখে তো অবাক ! জিজ্ঞাসা করলেন , 'এ কি করেছিস?'
সত্যেন্দ্রনাথ একটুও ঘাবড়ে না গিয়ে বাবাকে বলেছিলেন, 'দেখো না বাবা কে টিকটিকি করছে তা দেখার জন্য আমি ঘড়িটা খুলেছি।'
বাবা বুঝতে পেরেছিলেন, এই অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ একদিন মস্ত বড়ো বিজ্ঞানী হয়ে উঠবেন।
বসু পরিবার তখন থাকতেন গোয়াবাগানের ২২ নং ঈশ্বর শীল লেনে তাদের নিজেদের বাড়িতে। কাছাকাছি নিউ ইন্ডিয়ান স্কুলে ভর্তি হলেন তিনি। সেখান থেকে এলেন হিন্দু স্কুলে। সত্যেন্দ্রনাথ যখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তখন পাঠ্যপুস্তক ছিঁড়ে ফেলার এক অদ্ভুদ প্রবণতা দেখা গিয়েছিল তাঁর মধ্যে।
মা খুব বকুনি দিতেন। সত্যেন্দ্রনাথ বলতেন, মা বই নেই তো কি হয়েছে? গোটা বইটাই আমি মুখস্থ করে ফেলেছি।
পরীক্ষা করার জন্য পাশের বাড়ির একটি ছেলের কাছ থেকে মা পাঠ্যপুস্তক চেয়ে এনেছিলেন। প্রথম থেকে শেষ অবধি গড় গড় করে মুখস্থ বলেছিলেন সেদিনের বালক সত্যেন্দ্রনাথ। মা অবাক হয়ে গালে হাত দিয়েছিলেন।
শুধু তাই নয়, কোন পাতায় কোন প্রশ্নের কি উত্তর লেখা আছে তাও সত্যেন্দ্রনাথ মনে রেখেছিলেন। এমনই অবিশ্বাস্য ছিল তাঁর স্মরণশক্তি ! আমৃত্যু তিনি এই অসাধারন মেধা আর স্মৃতিশক্তি নিয়ে কাজ করে গেছেন।
মাকেই বেশি ভালোবাসতেন তিনি। মাকে সম্বোধন করতেন 'তুই' বলে আর বাবাকে বলতেন 'আপনি'।
টেলিফোনের নম্বর যে টুকে রাখার মতো জিনিস সেটা সত্যেন জানতেন না। আসলে একটি নম্বর শুনলেই সঙ্গে সঙ্গে সেটি তাঁর মাথায় মধ্যে গেঁথে যেত। একবার প্রেসিডেন্সি কলেজের বিজ্ঞানের অধ্যাপকেরা ভেবেছিলেন তরুণ ছাত্র সত্যেনের স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা নেবেন। তাই সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক অশোক শাস্ত্রীমহাশয় নিজের থেকে তৈরি করা একটি সনেট সত্যেন্দ্রনাথকে শুনিয়েছিলেন। কিছুক্ষন বলার পর শাস্ত্রী মহাশয় সত্যেন বসুকে বললেন - 'স্যার আপনি কি সনেটটি এখন মুখস্থ বলতে পারবেন?'
একমুখ হেসে সত্যেনবাবু পুরো সনেটটাই আবৃত্তি করার শুনিয়েছিলেন।
এমন অনেক ঘটনাই আমরা বলতে পারি তাঁর জীবন থেকে। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দ। চোদ্দো বছর বয়সে সত্যেন্দ্রনাথ প্রবেশিকা পরীক্ষা দেবেন। পরীক্ষার দুদিন আগে চিকেন পক্সে আক্রান্ত হলেন তিনি। তাই তাকে একবছর পরীক্ষা না দিয়ে ঘরে বসে থাকতে হয়েছিল। পরের বছর পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। জীবনে এই একটিমাত্র পরীক্ষাতে প্রথম হতে পারেননি।
১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ। সত্যেন বোস ভর্তি হলেন স্বনামধন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে অধ্যাপক হিসেবে পেয়েছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ইতিমধ্যেই সত্যেনের প্রতিভার কথা শুনেছিলেন। তিনি সত্যেনকে বেঞ্চে বসতে না দিয়ে নিজের পাশে টুলে বসবার ব্যবস্থা করলেন। তাঁর মতে, সত্যেনের নতুন করে শেখবার দরকার ছিলনা। অন্য ছাত্রদের সঙ্গে বসলে অনাবশ্যক প্রশ্নবানে সত্যেন তাঁকে বিব্রত করবেন। তাই এইভাবে সত্যেনের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
১৯১১ খ্রিস্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আই এস সি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। এই পরীক্ষায় শরীরবিজ্ঞান ছিল তাঁর চতুর্থ বিষয়। তাতে তিনি একশোর মধ্যে একশো নম্বরই পেয়েছিলেন।
এবার এলেন বি এস সি ক্লাসে। ভর্তি হলেন মিশ্র গণিতে। বি এস সি অনার্স পরীক্ষাতে তিনি প্রথম হয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বিজ্ঞানতাপস মেঘনাদ ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় স্থান দখল করতেন।
১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ। এম এস সি মিশ্র গণিতের পরীক্ষাতেও একই ফল হল। তিনি আটশোর মধ্যে সাতশো ছত্রিশ নম্বর পেয়ে এমন একটি রেকর্ড করলেন যা আজ অব্দি কারোর পক্ষে ভাঙা সম্ভব হয়নি।
ইতিমধ্যে তাঁকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। মেয়ের নাম উষাবতী, এগারো বছরের কনে। তাঁর বাবা ছিলেন খ্যাতনামা চিকিৎসক যতীন্দ্রনাথ ঘোষ।
এবার আমরা অন্য সত্যেন বোসকে দেখব। যাঁর মাথায় ছিল এক চলন্ত গবেষণাগার। পেন্সিল হল তাঁর স্ক্রু ড্রাইভার। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, পরাধীন ভারতবর্ষে ফলিত বিজ্ঞানের বিস্তার না ঘটলে ভারতবাসীর জাগতিক উন্নতি সম্ভব নয়। তখন থেকেই তিনি হাতেকলমে নানা বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে শুরু করেন। বিজ্ঞানের সাম্প্রতিকতম গবেষণালব্ধ ধ্যানধারণার কথা সরাসরি জানবেন বলে তিনি জার্মান ভাষা শিক্ষা করেন। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ফিলোজফিক্যাল ম্যাগাজিনে 'সাহা-বোস অবস্থা সমীকরণ' নামে তাঁর প্রথম গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। এতে তাঁর সহযোগী ছিলেন মেঘনাদ সাহা।
১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার পদে যোগ দেন। সেখানেই গবেষণাকালে বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্কের তত্ত্বের এক ভ্রান্তি তাঁর চোখে পড়ে। এ বিষয়ে চার পাতার একটা প্রবন্ধও লেখেন। কিন্তু দেশি-বিদেশি সব বিজ্ঞানে পত্রিকা থেকে লেখাটি অমনোনীত হয়ে ফেরত আসে সত্যেন্দ্রনাথ বিচলিত হয়ে পড়েন। তারপর তিনি এক দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নেন। অপেক্ষবাদের জনক আইনস্টাইনের কাছেই পাঠিয়ে দিলেন প্রবন্ধটি। ভারতীয় অধ্যাপকের গাণিতিক ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে বিস্মিত হলেন শতাব্দীশ্ৰেষ্ঠ বিজ্ঞানী। শুরু হল বিশ্ববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সত্যেন্দ্রনাথের নিঃশঙ্ক পদচরণ।
এরই পাশাপাশি আমরা নানাভাবে সত্যেন্দ্রনাথকে দেখতে পেয়েছি। কখনও তিনি হয়ে উঠেছেন সমাজ সচেতক, কখনও আবার বিজ্ঞান প্রবন্ধকার। তাঁর সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল বাংলা ভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞানকে সাধারণের কাছে পৌঁছে দেবেন। তাই তৈরি করেছিলেন 'বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ'। এখান থেকে নিয়মিতভাবে 'জ্ঞান ও বিজ্ঞান' পত্রিকা প্রকাশিত হত। আজও এই সংস্থাটি নিরলসভাবে বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছে।
অবশেষে পরিনত বয়সে তিনি মহাপ্রয়াত হন - ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি। পার্থিব দেহে সত্যেন্দ্রনাথ বসু বেঁচে নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর তৈরি করা 'বোসন'। আজও যখন আমরা কোনো কনার গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করি তখন অবশ্যই তাঁর নাম স্মরণ করি। এভাবেই তিনি আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।



বোস পরিসংখ্যান পদ্ধতি (১৯২৪)

এন্ট্রান্স পরীক্ষার জন্য যে পরীক্ষা নেওয়া হত সেই পরীক্ষায় হিন্দু স্কুলের ছাত্র সত্যেন্দ্রনাথ বসু অঙ্কে ১০০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছিলেন ১১০। পরীক্ষায় মোট দেওয়া হয়েছিল ১১ টি প্রশ্ন। তার মধ্যে ১০ টি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়েছিল ছাত্রদের। কিশোর সত্যেন্দ্রনাথ ১১ টি প্রশ্নে উত্তর দিয়ে আবার জ্যামিতির অতিরিক্ত সমস্যাগুলিও তিনরকম পদ্ধতিতে সমাধান করে দেখিয়েছিলেন। এরকমই গণিতের প্রতি ভালবাসা ছিল সত্যেন্দ্রনাথের। শুধু গনিতিই নয় ছাত্রাবস্থাতেই ভারতীয় সাহিত্য, সংস্কৃত সাহিত্য চর্চা এবং ফরাসী ভাষা শিখে নিয়েছিলেন। আই, এস সি, অনার্স সহ বি, এস, সি ও এম, এস, সি কোনো পরীক্ষাতেই প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হননি তিনি। কোনো গানিতিক সমস্যার মুখমুখি পড়লে মূল নিয়ম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সমাধান করার যে প্রবণতা কিশোর সত্যেন্দ্রনাথের মধ্যে দেখা গিয়েছিল সেই প্রবণতাই তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ আবিস্কারের ক্ষেত্রে। 

বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক তাঁর কোয়ান্টাম থিয়োরি ও আইনস্টাইন আপেক্ষিকতাবাদ প্রচার করে পদার্থবিদ্যাকে এক নতুন যুগে পৌঁছে দেন। সত্যেন্দ্রনাথ প্রধানতঃ গণিতের ছাত্র হয়েও মেঘনাদ সাহা, জ্ঞান ঘোষ প্রমুখ বন্ধুদের সহচার্যে, পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত বই যোগাড় করে পড়তেন ও ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন। শুধু আধুনিক বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করার উদ্দেশ্যেই তাঁরা জার্মান ভাষাও শিখে নেন। এই সময়ই তাঁরা ১৯২০ সালে বিজ্ঞানী প্রশান্ত  মহালনবিশের সহযোগিতায় আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ সম্পর্কিত কতগুলি নিবন্ধ জার্মান ভাষা থেকে ইংরাজীতে অনুবাদ করেন।

১৯২১ সালে সত্যেন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার রিডারের পদে নিযুক্ত হন। এসময় তাঁর এক বন্ধু বিদেশ থেকে তাঁকে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের 'Thermodynamics and Heart'  বইটি উপহার দেন। বইটি হাতে পেয়েই সত্যেন্দ্রনাথ বইয়ের সমস্ত সমীকরণ ও সুত্রগুলি সমাধান করে ফেললেন। প্ল্যাঙ্ক একটি সমীকরণের সমাধান করতে গিয়ে অনুমানিক প্রকল্প গ্রহন করেন এবং সমীকরণের অসন্ন  সমাধান করেন, কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথের স্ববাভ ছিল শেষপর্যন্ত দেখা, ফলে তিনি উন্নত উপায়ে সমীকরণটির সমাধানের চেষ্টা করতে লাগলেন। ১৯২৪ সালে মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে প্ল্যাঙ্কের সুত্র আলোক কোয়ান্টাম তত্ত্ব (Planck's law and light Quantum hypothesis') নামে একটি চার পাতার গবেষণামূলক পুস্তিকা বের করেন। 

একটি ভারতীয় ও কয়েকটি বিদেশী পত্রিকায় এই পুস্তিকাটি প্রকাশের জন্য সত্যেন্দ্রনাথ পাঠান। কিন্তু তাঁরা কেউই উৎসাহ দেখালেন না। তখন ঐ বছরই সত্যেন্দ্রনাথ লেখাটি বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কাছে মতামতের জন্য  পাঠান। আইনস্টাইন নিবন্ধটি পড়ে মুগ্ধ হন এবং তাঁর গুরুত্ব  বুঝে নিজেই জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে জার্মানির বিশিষ্ট পত্রিকা ' সাইটস শিফটফ্যুরফিজিক' পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। অনুবাদের শেষে অনুবাদকের মন্তব্য লিখেছিলেন, আমার মতে বোস কতৃক প্ল্যঙ্কের এই সুত্র নির্ধারণ পদ্ধতি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সত্যেন্দ্রনাথের এই গবেষণার ফলেই তেজস্ক্রিয়তার ধর্ম ব্যাখ্যা করার জন্য যে পরিসংখ্যান পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয় তাঁকে বলে বসু সংখ্যায়ন। ফোটন আলফা কণা,ডয়টেরন প্রভৃতি মৌলিক কনাগুলি বসু-সংখ্যায়ন মেনে চলে বলে এগুলিকে 'বোসন' বলা হয়।

পদার্থের কনাগুলির সমষ্টিগত ধর্ম তাদের নিজের নিজের ধর্মের চেয়ে আলাদা, তাই কণাদের আচরণ স্পষ্টভাবে জানাতে গেলে তাদের পৃথক ধর্মের ওপর জোর না দিয়ে সমষ্টিগত ধর্মের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এই ঘটনাকেই বলে কোয়ান্টাম সংখ্যাতত্ত্ব। এটি বোস সংখ্যায়ন তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। আইনস্টাইন একক পরমাণুর গ্যাসের ক্ষেত্রে বোস-সংখ্যায়ন প্রয়োগ করে এই সংখ্যাতত্ত্বের পরিবর্ধন করায় পরবর্তীকালে নতুন গণনা পদ্ধতিটির নাম হয় বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন। 
বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জীবনী ও আবিষ্কার বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জীবনী ও আবিষ্কার Reviewed by Kona Dey Chakraborty on September 29, 2018 Rating: 5

আজীবন নির্যাতনের শিকার - বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির জীবনী

September 24, 2018

গ্যালিলিও গ্যালিলি (জন্ম : ১৫৬৪ খ্রি., মৃত্যু : ১৬৪২ খ্রি.)


লাতিন ভাষায় ফাদার মন্ত্রউচ্চারণ করছেন। সবটুকু বেচারি গ্যালিলি বুঝতে পারছেন না। কিন্তু সুরটা বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট করছে তাঁকে। আজ বাদে কাল মহামানব যীশুর জন্মদিন। আজ শুরু হয়েছে ক্যারল সংগীত। একটুবাদে রাত বারোটায় একটি একটি করে হাজার খানা প্রদীপ জ্বলে উঠবে। আকাশে শুরু হবে আতশবাজির খেলা। আর তখনই সান্তাক্লজ বের হবেন উপহারের মোজা কাঁধে নিয়ে। এমনটি দেখে আসছেন গ্যালিলিও, সেই ছোটবেলা থেকে। দেখে আসছেন আর ভাবছেন এই ধার্মিক অনুশাসনের অন্তরালে কি যুক্তি আছে? আছে কি এমন কিছু যাকে আমরা বিজ্ঞান বলতে পারি? নাকি এ হল নিছকই আমাদের আজন্মলালিত একমাত্র বিশ্বাস।
ছটফট করতে থাকেন তিনি- পাঁচ বছরের গ্যালিলিও গ্যালিলি। ভালো লাগে না, ভালো লাগেনা ধর্মের নামে অধর্মের এই উদ্ধত অহংকার। ধর্মের আফিম খাইয়ে মানুষকে ঝিমিয়ে রাখা। শোষনের ধারাবাহিকতা। সত্য কি? সত্য কোথায়? সত্যকে কিভাবে উপলব্ধি করব?
সত্যের সন্ধানে পাঁচ বছরের বালক গ্যালিলিও উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে। চিরাচরিত ধ্যানধারণার গোলক ধাঁধায়। সাদামাটা ভাবনা নিয়ে পরিচিত প্রিয়জনেরা সামনে এসে দাঁড়াচ্ছেন। অবাক বিস্ময়ে তাঁরা তাকিয়ে থাকছেন এই অবাক বালকের মুখের দিকে। আহা, ঠোঁট দুটো শুকনো ! একমাথা উস্কোখুস্কো চুল ! হ্যাঁরে, কি হয়েছে তোর? মা মেরেছে বুঝি? বাবার সঙ্গে মনোমালিন্য? যেমনটি হয়ে থাকে আর কি !
ওঁরা ভাবতেও পারেননি, এমন কোনো ঘটনা গ্যালিলিওকে আজ ঘরছাড়া করেনি। ঘর ছাড়া করেছে তাঁর নিজস্ব তাগিদ।
তাঁর মনের ভেতর উথলে ওঠা প্রশ্নের উতরোল। তাঁকে যে জানতেই হবে সৃষ্টিরহস্যের শেষ কথা ! তার আগে যদি আমার জীবন ফুরিয়ে যায় তাহলে কি হবে !
বিস্ময়ে আবিষ্ট বালক প্রশ্ন করছেন। 
এক চিররহস্যময় বিজ্ঞানী। পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে। জন্মেছিলেন ইতালির পিসা শহরে। বাবা ছিলেন এক বিখ্যাত সংগীতশিল্পী।
তাঁর ছোট্টবেলার দিনগুলির কথা বলতেই মনে পড়ে যায় গ্যালিলিও চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। হয়তো একটুবাদে ঘুমের রাজ্যে পা রাখবেন। হঠাৎ চারপাশের আকাশ সহস্র আলোয় ভরে উঠল। পাখিরা গান গেয়ে উঠল। কার সুমধুর কন্ঠসংগীত এভাবে বিদ্ধ করছে হৃদয়কে? এত দুঃখ জমে আছে অথচ বালক গ্যালিলিও তার খবর রাখেননি ! গ্যালিলিও শয্যা ছেড়ে উঠে আসতেন। পায়ে পায়ে চলে যেতেন পাশের ঘরে। অবাক হয়ে দেখতেন বাবাকে। মধ্যবয়সী বাবা চোখ বন্ধ করে পিয়ানোতে সুর তুলছেন। সেই সুরের মধ্যে একটা অদ্ভুত আকুল আর্তির ছাপ আছে। সেই সুর আমাদের হারানো অতীতে নিয়ে যায়। বলে, হে মানুষ, আর কতদিন তুমি মোহান্ধ হয়ে থাকবে। এসো, চোখ দুটি খুলে দাও। এই আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমি অমৃতপুরুষ। তুমি কি আমার সাথে সখ্যতার সম্পর্ক পাতাবে না?
ছোট্ট বয়স থেকেই গ্যালিলিও নানা বিষয়ে অনুসন্ধিৎসা জাগিয়ে তুলেছিলেন। চারপাশের সবকিছুকে ভালোভাবে দেখতে হবে, এমন একটা অসীম কৌতহল ছিল তার মনের মধ্যে। অজানাকে জানতে হবে তবেই মানব জীবনের সার্থকতা - মনে প্রাণে তাই বিশ্বাস করতেন তিনি। দিন কাটতে থাকে। শৈশবকাল একসময় হারিয়ে যায়। একঝাঁক রোমাঞ্চ আর রহস্য নিয়ে এসে দাঁড়ায় কিশোরবেলা। কিশোরবেলাতে গ্যালিলিও হাতে - কলমে পরীক্ষা - নিরীক্ষার কাজ শুরু করেছিলেন। নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির মডেল তৈরিতে তিনি ছিলেন খুবই ওস্তাদ। যেটা দেখতেন চট করে সেটারই একটা প্রতিরুপ বানিয়ে ফেলতে পারতেন। এইভাবে তিনি বন্ধুবান্ধবদের তাকে লাগিয়ে দিতেন। আত্মীয় পরিজনরাও কিশোর গ্যালিলিওর এই ক্ষমতা দেখে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন। হেডমাস্টার স্বয়ং বাড়িতে এসে বলে গিয়েছিলেন যে, একদিন গ্যালিলিও নিশ্চয়ই হবেন বিশ্বের বিস্ময়।
তার এই বাণী ভবিষ্যৎদ্বাণী পূরন হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য ভদ্রলোক তখন বেঁচে ছিলেন না।
উনিশ বছর বয়সে গ্যালিলিওর জীবনে একটি মজার ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। মজার বলব, নাকি রহস্যঘন, তা জানি না অবশ্য। এসো, সংক্ষেপে ঘটনাটি বলি। এই ঘটনাই গ্যালিলিওর পরবর্তী জীবনকে প্রভাবিত করেছিল।
চার্চের মধ্যে ঢুকেছিলেন গ্যালিলিও। বেদির কাছে শিকল দিয়ে ঝুলানো তেলের প্রদীপের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চমকে উঠলেন তিনি। একটা অসাধারন ব্যাপার চোখে পড়ল তার। অথচ লক্ষ লক্ষ মানুষ এই ব্যাপারটি প্রতিদিন দেখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন কেউ কখনও করেননি। অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন বলেই তিনি গ্যালিলিও, প্রশ্ন তোলেননি বলেই, অন্য লোকদের নাম আজ হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে।
গ্যালিলিও কি দেখলেন ? তিনি দেখলেন, শিকলের দোলার সঙ্গে সঙ্গে বাতিটি দুলছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, একটা নির্দিষ্ট ছন্দ আছে তার দোলুনির।
ব্যাপারটা খেয়াল হতেই তিনি চমকে উঠলেন। প্রদীপের প্রতিটি দোলনের বিস্তার আগের থেকে ক্রমশ কমছে। কিন্তু প্রত্যেক বার সেই একই সময় লাগছে।
প্রশ্নের কাঁটা গেঁথে গেল গ্যালিলিওর অনুসন্ধিৎসু মনের মধ্যে। কেন এমন হচ্ছে? সময় একই লাগছে, অথচ দোলনের বিস্তার কমছে কেমন করে?
এই জিজ্ঞাসার জবাব পেতেই পরবর্তীকালে গ্যালিলিও আবিষ্কার করেছিলেন তার বিশ্ববিখ্যাত ঘড়ির পেন্ডুলামের সূত্র।
এই সূত্র ব্যবহার করে সময়ের গতি নির্ধারণ করা হয়। নিয়ন্ত্রিত হয় ঘড়ির সময়।
এবার এসো, আমরা তার ছোটবেলার পড়াশোনার কথা বলি। তার ছোটবেলায় শিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই কম। তখনকার সমাজে বেশি লেখাপড়া করাটাকে খুব একটা সুনজরে দেখা হত না। বেচারি গ্যালিলিও এক জেসুইট মঠে গ্রিক ও লাতিন ভাষা শিক্ষা করেন। সামান্য কিছু অংকবিদ্যাও রপ্ত হয়েছিল তার। সেগুলিকে পুঁজি করে কি আর বিজ্ঞানী হওয়া যায়? হওয়া যায় না। কিন্তু এগিয়ে এসেছিলেন বাবা। বাবা চেয়েছিলেন ছেলের এই প্রতিভাকে কাজে লাগাতে। ছোট্ট থেকেই অসাধারন মেধাসম্পন্ন ছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। পুত্রকে নিয়ে তিনি এলেন পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয় গ্যালিলিওর বৌদ্ধিক জীবনকে একেবারে পাল্টে দিয়েছিলেন। এখানে পড়তে পড়তেই যুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠেন। তার মননশীলতার মধ্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। গড়ে ওঠে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভংগী।
তখন থেকেই তিনি নিয়মিত বিতর্কের আসরে যোগ দিতেন। তার অকাট্য যুক্তির কাছে পরাজিত হতেন প্রতিপক্ষরা। অনেক সময় দেখা দিতে চরম মনোমালিন্য। তবু গ্যালিলিও কখনো তার পথ থেকে বিচ্যুত হননি। এমনই অসমসাহসী ছিলেন তিনি।
গ্যালিলিও প্রাচীন মনীষীদের চিন্তাধারাকেও সমালোচনা করতেন। এ ব্যাপারে কোনো কুন্ঠা ছিলনা তার মনের মধ্যে। তিনি যেভাবে এবং যে ভাষায় অ্যারিস্টটলকে আক্রমন করেছিলেন তা শিক্ষিত সমাজকে ব্যথিত করেছিল।
তখন গ্যালিলিওর বয়স মাত্র ১৯ বছর। তিনি বললেন 'মহাপ্রাজ্ঞ অ্যারিস্টটলের সব সিদ্ধান্তই অভ্রান্ত নয়।' অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, কোনো উঁচু জায়গা থেকে একই সময়ে একটি ভারী বস্তু এবং একটি হালকা বস্তু ফেললে ভারী বস্তুটি হালকা বস্তুর আগে মাটিকে স্পর্শ করবে।
ওই বয়সেই গ্যালিলিও পরীক্ষার দ্বারা প্রমান করলেন যে, এই সিদ্ধান্ত ভুল। অথচ হাজার হাজার বছর ধরে আমরা এই সিদ্ধান্তকে অভ্রান্ত সত্য মেনেছি। আর মেনেছি বলেই বিজ্ঞানের ক্ষতি করেছি। এখন থেকে এমনটি আর হতে দেওয়া চলবে না। গ্যালিলিও প্রমান করেছিলেন যে, ওপর থেকে নিচে ফেলা ভারী বস্তু এবং হালকা বস্তু একই সঙ্গে নিচে পড়বে যদি না পতনকালে বায়ুমন্ডলের দ্বারা তাদের গতি বাধা পায়।
তার এই সিদ্ধান্ত ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে দারুন অসন্তোষ দেখা দিল। শেষ পর্যন্ত সকলে তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে শুরু করেন। কি! এত বড় কথা ! অ্যারিস্টটলকে অনেকে দেবতার আসনে বসিয়েছিলেন। আর তার বিরুদ্ধে কিনা এই বিদ্রোহ !
শেষ অব্দি গ্যালিলিও শক্তিশালী বিরুদ্ধ পক্ষের সামনে অসহায়, নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন। পিসা ছেড়ে তাকে আসতে হল পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।
এই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র থাকাকালীন গণিত শাস্ত্রের প্রতি তার আগ্রহ বেড়ে গিয়েছিল। ইউক্লিড, আর্কিমিডিস প্রভৃতি গণিতবিশারদদের গবেষণা পত্রগুলি তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন।তখন থেকেই তার মনের ভিতর একটা ধারণার জন্ম হয়েছিল, তা হল, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিতি অর্জন না করতে পারলে কোনো মানুষের জ্ঞান পূর্ন হবে না। তাই পদার্থবিজ্ঞানই হয়ে দাঁড়াল তার একান্ত প্রেম। চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যয়ন অবশ্য বেশি দূর এগোল না। আর্থিক কারণে মাঝপথেই বন্ধ হয়ে গেল এই পড়াশোনা। কিন্তু তার নিজস্ব গবেষণা বন্ধ হল না। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আর্কিমিডিসের সূত্রের ওপর নতুন একটি আবিষ্কার করে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিলেন। তিনি এমন একটি নিক্তি আবিষ্কার করেছিলেন যার দ্বারা মিশ্রিত ধাতুসমূহের মধ্যে থেকেও যেকোনো একটির পরিমান নির্নয় করা যায়।
গ্যালিলিওর পরবর্তী জীবন ছিল ঘাত-প্রতিঘাতে পরিপূর্ন। তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, নিজস্ব মতবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে কি ধরনের শারীরিক নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। যাজকসম্প্রদায় তার প্রতি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি রক্ষণশীল চার্চের সর্বময় ধ্যানধারণাকে আক্রমন করেছিলেন। সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ঘোষণা করেছিল তীব্র জেহাদ। তাই কুচক্রীরা তাকে 'বিধর্মী এবং বাইবেলবিদ্বেষী' বলে ঘোষণা করেছিলেন। জেসুইটরা তাকে চরম শাস্তি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন।
শেষ অব্দি গ্যালিলিওর জীবন কেটেছিল নিজ গৃহে অন্তরীন অবস্থায়। তখন তার বয়স হয়েছে সত্তর বছর। সেই বন্দি অবস্থাতেও তিনি হল্যান্ড থেকে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন।
১৫৯২ থেকে ১৬১০ সাল পর্যন্ত তিনি বিজ্ঞানের জগতে বিপ্লব এনেছিলেন। যেমন জ্যোতির্বিজ্ঞানে উন্নত দুরবিনের প্রয়োগ, শনিগ্রহের বলয় আবিষ্কার, বৃহস্পতি গ্রহের তিনটি উপগ্রহের সন্ধান, বহুভূজ আঁকবার যন্ত্র, সেকটার উদ্ভাবন, একাধিক নক্ষত্রের সঠিক অবস্থান নির্নয়, চাঁদের ভূমি অসমতল হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা ইত্যাদি।
জীবনের শেষ কটা দিন অন্ধ হয়েগিয়েছিলেন গ্যালিলিও। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। তখন অবশ্য গৃহবন্দিত্বের আদেশদন্ড থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন ওই প্রবীণ বিজ্ঞানী।
অন্ধ অবস্থাতেই জীবনের শেষ চারটি বছর অতিবাহিত করেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। অবশেষে ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে আটাত্তর বছর বয়সে চিরনিদ্রার কোলে ঢলে পড়েন এই মহান বিজ্ঞানী।
আজীবন নির্যাতনের শিকার - বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির জীবনী আজীবন নির্যাতনের শিকার - বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির জীবনী Reviewed by Kona Dey Chakraborty on September 24, 2018 Rating: 5

বইয়ের দোকানের কর্মচারী থেকে - পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানীঃ মাইকেল ফ্যারাডে

September 23, 2018

মাইকেল ফ্যারাডে (জন্ম : ১৭৯১ খ্রি. মৃত্যু : ১৮৬৭ খ্রি.)

১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে ২২শে সেপ্টেম্বর জন্ম হয়েছিল মাইকেল ফ্যারাডের। জন্মেছিলেন তিনি ইংল্যান্ডের নেউইংটন অঞ্চলে। তাঁর পিতা ছিলেন একজন দরিদ্র কর্মকার।
ছোটোবেলা থেকেই পিতার কারখানাতে ঘোরাফেরা করতেন মাইকেল ফ্যারাডে। কিভাবে কামরার লোহা পেটাচ্ছে, তা দেখতেন অবাক বিস্ময়ে। শিশুসুলভ উৎসাহে একদিন ঘোষণা করেছিলেন - 'বাবা, বড়ো হয়ে আমিও একজন কর্মকার হব। দেখো, সেদিন তোমাকে আর টাকার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে না।'
হয়তো কর্মকার হওয়ার স্বপ্ন সফল হয়নি মাইকেল ফ্যারাডের, কিন্তু তিনি যা আবিষ্কার করেছিলেন, তা বিশ্বের বিজ্ঞানীমহল সাদরে বরণ করে নিয়েছেন। তিনি এনেছেন ডায়নামো, বিশ্বের শিল্পক্ষেত্রে যা একটি বিপ্লব সংঘটিত করে। মানব সভ্যতার ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে এক নতুন যুগের দিক প্রদর্শক।
বাড়িতে চার দেওয়ালের মধ্যেই ছোটবেলার দিনগুলি কেটে গিয়েছিল মাইকেল ফ্যারাডের। স্কুলের পড়াশোনা কী তা বোঝার সুযোগ ছিল না। যে বয়সে ছেলেরা মন দিয়ে পড়াশোনা করে এবং অবসর সময়ে চুটিয়ে গল্পগুজব করে, সেই বয়সে বেচারি মাইকেল ফ্যারাডেকে কাজ নিতে হয়েছিল এক বইয়ের দোকানে। সারাদিন কাজ করতেন সেখানে। হাড়ভাঙা খাটনি। বইয়ের বান্ডিল মাথায় করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে হত। হিসেব নিকেশ করতে হত। পোকায় খাওয়া বইগুলোকে আলাদা করতে হত। শুধু তাই নয়, কাঁধে বই নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতে হত।
এমনকি অবসর সময়ে বই বাঁধাই করতে হত মাইকেল ফ্যারাডেকে।
এভাবেই বইয়ের প্রতি তাঁর সীমাহীন ভালোবাসার জন্ম হয়। মনের ব্যাপ্তি ক্রমশ বাড়তে থাকে। এখানে তিনি পছন্দমতো বই পড়তে পারতেন। কখনো কখনো সারারাত ধরে বই পড়তেন। বিশেষ ভালোবাসতেন বিজ্ঞান ,তার সহজাত আকর্ষণ। বিশেষ করে বিজ্ঞানের বই পেলে তো আর কথাই নেই। কোথা থেকে সময় কেটে যেত, তা বুঝতেই পারতেন না।
কিন্তু প্রথাগত কোনো শিক্ষা ছিল না তাঁর। তাই বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলি উপলব্ধি করতে পারতেন না। পড়তে পড়তে কোথাও বাধা পেলে নিজের ওপর ভীষণ রাগ হত মাইকেল ফ্যারাডের। ভাগ্যকে দোষারোপ করতেন তিনি। চোখ বন্ধ করে বসে থাকতেন। অংকের জটিল ফর্মুলা কিছুতেই বুঝতে পারতেন না। - কোথায় জ্ঞানের দেবী, আপনি আমার মধ্যে আসুন, আমার তৃতীয় চোখ খুলে দিন। আমি সবকিছু বুঝব। আমি এক বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হব। আকুল আহ্বানে তখন হয়তো একথাই বলতেন মাইকেল ফ্যারাডে।
তখন লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীরা আসতেন বত্তৃতা দিতে। সাধারণ মানুষরা দলে দলে ভিড় করতেন সেই বত্তৃতা শুনবেন বলে। সময় এবং সুযোগ পেলে ফ্যারাডেও হাজির হতেন সেখানে।
সেখানে আসতেন হামফ্রে ডেভি। এক নামজাদা বিজ্ঞানী। ফ্যারাডে ভীষণ ভালোবসতেন ডেভির বত্তৃতা শুনতে। ডেভিকে দেখে তাঁর মনে হত, তিনি বোধহয় স্বর্গ থেকে খসে পড়া এক দেবদূত। যে করেই হোক, ডেভির বত্তৃতা শুনতে যেতেন মাইকেল ফ্যারাডে।
বত্তৃতার সব অংশ তিনি বুঝতে পারতেন না। তবু যতটা সম্ভব দুর্বোধ্য অংশগুলিও বোঝার চেষ্টা করতেন। বত্তৃতাগুলি কাগজে টুকে নিয়ে আসতেন। ঘরে এসে রাতের পর রাত জেগে চিন্তা করতেন। কখনওবা হাতেকলমে ছোটোখাটো পরীক্ষা করতেন। এইভাবেই ডেভির সঙ্গে তাঁর একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
অজানাকে জানার আগ্রহে একদিন দুঃসাহসী হয়ে উঠেছিলেন ফ্যারাডে। সরাসরি ডেভিকে একটি চিঠি লিখলেন তিনি। অশিক্ষিত ফ্যারাডের কাছ থেকে এই চিঠি পেয়ে ডেভি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ডেভি ভেবেছিলেন, লেখক বোধহয় সাধারণ একজন দপ্তরী। তবুও তিনি এই চিঠিটাকে অবজ্ঞা করেননি। নিজের কাজে খুবই ব্যস্ত থাকতে হত হামফ্রে ডেভিকে। তখন তিনি এক নামজাদা বিজ্ঞানী। তা সত্ত্বেও ফ্যারাডেকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনি।
আমরা জানি, ডেভি আর ফ্যারাডের সাক্ষাৎকার বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ন ঘটনা। একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী, আর অন্যজন বইয়ের দোকানের স্বল্পশিক্ষিত কর্মচারী। দুজনের মধ্যে মনের মিল হবে কেমন করে? কিন্তু বিধাতার বোধহয় অন্যরকম অভিপ্রায় ছিল। তাই দেখা গেল, প্রথম সেই সাক্ষাৎকারেই ডেভি অবাক হয়ে গেছেন। ডেভি ভাবতে পারেননি যে, ফ্যারাডের মতো অর্ধশিক্ষিত মানুষ বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলিকে এইভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি আন্তরিকভাবে মাইকেল ফ্যারাডের সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন। তিনি, তাঁর জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। সদ্য তরুণ মাইকেল ফ্যারাডে সেদিন তাঁর স্বপ্ন সফল করেছিলেন।
ডেভি তাঁকে সহকারীর পদে গ্রহণ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, মাইকেল ফ্যারাডের প্রতিভা যাতে অকালে ঝরে না যায়, তারজন্য সবরকম চেষ্টা করেছিলেন ডেভি। শুরু হল মাইকেল ফ্যারাডের নতুন জীবন। রসায়ন বিজ্ঞান নিয়ে ডেভির সঙ্গে গবেষণা করতে শুরু করলেন তিনি।
কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আলাদাভাবে গবেষণা শুরু করেছিলেন। তখন অবশ্য তিনি এক প্রাজ্ঞ যুবকে পরিনত হয়েছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নিরলস গবেষণার মধ্যে মগ্ন ছিলেন এই মহাবিজ্ঞানী। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ই আগস্ট তাঁর জীবনাবসান হয়। আজও মাইকেল ফ্যারাডে আমাদের কাছে এক জীবন্ত বিস্ময়। জীবদ্দশাতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তির মহানায়ক - এসো, আমরা তাঁর উদ্দেশ্যে একটি সশ্রদ্ধ প্রনাম নিবেদন করি।

বইয়ের দোকানের কর্মচারী থেকে - পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানীঃ মাইকেল ফ্যারাডে বইয়ের দোকানের কর্মচারী থেকে - পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানীঃ মাইকেল ফ্যারাডে Reviewed by Kona Dey Chakraborty on September 23, 2018 Rating: 5
Powered by Blogger.