লেখক , শিক্ষাবিদ , শিক্ষাদর্পণ পত্রিকার সম্পাদক ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের বানী


* পরীক্ষাবিধান ব্যতিরেকে বিজ্ঞানের শিক্ষা বিড়ম্বনা মাত্র। শিক্ষার অবস্থা এইরূপ হওয়াতে অধীত ইউরােপীয় বিজ্ঞানের সূত্রগুলি বার্ষিক পরীক্ষার সময় কণ্ঠস্থ থাকিতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক অন্তদৃষ্টি জন্মিতে পারে না।

*  ভারতবর্ষীয়দিগের মধ্যে যে স্বভাবসিদ্ধ জাতীয় ভাব আছে, তাহার অনুশীলন এবং সম্বর্ধন চেষ্টা ভারতবর্ষীয় মাত্রেরই অবশ্য কর্তব্যকর্ম।

* ভারতবাসীর যত প্রকার ত্রুটি দেখিতে পাওয়া যায়, সকলগুলিই সম্মিলন প্রবণতার ন্যূনতা হইতে সস্তৃত। ভারতবাসী রত্নপ্রসবা ভারতের ক্রোড়ে থাকিয়াও দরিদ্র। ভারতবাসী শ্রমশীল হইয়াও উদরান্নে বঞ্চিত। ভারতবাসী বুদ্ধিমান হইয়াও অন্যের পরিচালনা অপেক্ষী। ভারতবাসীর মৃত্যুভয় স্বল্প হইলেও তিনি ভীরু বলিয়া প্রসিদ্ধ। এই সকল এবং অপরাপর সকল দোষের একমাত্র মূল, সম্মিলনে অক্ষমতা।

* ভারতবাসীর চলিত ভাষাগুলির মধ্যে হিন্দি হিন্দুস্থানীই প্রধান এবং মুসলমানদিগের কল্যাণে উহা সমস্ত মহাদেশব্যাপক; অতএব অনুমান করা যাইতে পারে যে উহাকে অবলম্বন করিয়াই কোনাে দূরবর্তী ভবিষ্যৎকালে সমস্ত ভারতবর্ষের ভাষা সম্মিলিত থাকিবে।

* মনুষ্য শিশুর পক্ষে পিতামাতাও যাহা, মনুষ্য সমাজের পক্ষে ধর্ম এবং ভাযাও তাহা, ধর্ম সমাজের পিতা, ধর্ম হইতে সমাজের জন্ম ও রক্ষা, আর ভাষা সমাজের মাতা, ভাষা হইতে সমাজের স্থিতি এবং পুষ্টি হয়। ধন বল, দলবন্ধন বল, বাণিজ্য বল, আর রাজনৈতিক স্বাধীনতা বল, সকল দিয়াও সমাজ বাঁচিয়া থাকিতে পারে; কিন্তু যে সকল লােকের ধর্ম এবং ভাষা গিয়াছে, সে সকল লােকের স্বতন্ত্র সমাজ আছে, এমন কথা বলা যায় না।

* অনুকরণ বাহ্য, উদ্ভাবন আভ্যন্তরিক। অনুকরণে ভেদবুদ্ধির প্রাবল্য, উদ্ভাবনে একত্ব এবং তদাত্মতা। এইজন্যই যিনি অনুকরণ করিতে পারেন, তিনি প্রায়ই উদ্ভাবন করিতে অসমর্থ হয়েন। 

* স্থূল কথা এবং সূক্ষ্ম কথাও এই যে শাসনের প্রয়ােজন কখনােই যাইতে পারে না, তবে শাসন কঠোর না হইয়া অর্থাৎ দণ্ডমূলক না হইয়া অধিক পরিমাণেই শিক্ষা এবং উপদেশমূলক হইতে পারে। আর সমাজ হইতে বৈষম্য যাইতে পারে না, কিন্তু উহার অনেকটা ন্যূনতা হইতে পারে। সূতরাং ইউরােপীয় সমাজ-বিপ্লাবকবর্গের ধ্বনিত স্বাধীনতার পরিবর্তে শাস্ত্রাধীনতার’ এবং সাম্যের পরিবর্তে ন্যায়ানুগামিতার’ এবং ভ্রাতৃত্বের পরিবর্তে ভক্তি, প্রেম এবং দয়া’র ধ্বনি উথিত হইলেই ভালাে হয়।

* যে শক্তির প্রভাবে সমাজান্তৰ্গত পরিবারসমূহ পরস্পর সহানুভূতিসম্পন্ন এবং কিয়ৎপরিমাণে এক প্রাকৃতিক এবং একাকার হইয়া যায় তাহার নাম সামাজিকতা।

* সর্বেশ্বর মতবাদে ঈশ্বর প্রত্যক্ষাদি সকল প্রমাণের দ্বারাই সুসিদ্ধ, যখন দেখা যাইতেছে, যে কারণের অনুসন্ধানে মনুষ্যমন চির জাগরূক, যখন দেখা যাইতেছে যে মনুষ্য সমাজের প্রতি সহানুভূতিমূলক যে ধর্ম তাহারও অতিব্যাপক পদার্থ, যাহা বিশ্বজ্ঞান এবং বিশ্বপ্রীতি এবং বিশ্বসৌন্দর্য প্রভৃতি অত্যুদার ভাবসকল মনুষ্যহৃদয়ে অধিষ্ঠিত, এবং যখন দেখা যাইতেছে যে সর্বজ্ঞত্ব, সর্বব্যাপকত্ব, সর্বশক্তিমত্তা, অপাপবিদ্ধত্ব প্রভৃতি গুণক্ষণে লক্ষিত মনুষ্যের উপাস্য বস্তু সর্বময় রূপেই বিদ্যমান, তখন পরস্পর হিংসাবিদ্বেষ-বিদূষিতাঙ্গ, আংশিক এবং কাল্পনিক একটি নারদের পূজায় মানববুদ্ধি এবং মানবহৃদয়ের তৃপ্ত হইবার সম্ভাবনা কোথা? আমার বােধ হয় যে, সর্বেশ্বরবাদই পৃথিবীতে ক্রমশ বিস্তৃত হইবে।

* জগতের কোথাও সাম্য নাই। গাছের একই ডালের দুইটি পাতাও পরস্পর সমান হয় না। একটি বালুকারেণুও অপর কোনাে বালুকারেণুর সমান নয়। একটি বৃষ্টিবিন্দুও অপর বৃষ্টিবিন্দুর সমান নহে। জগতে সাদৃশ্য আছে, সাম্য নাই। 

* শাস্ত্রের অভিপ্রায়, মানুষ আপন উদ্দেশ্যের স্থিরতা, মনােযােগের ঐকান্তিকতা, চিত্তের প্রশস্ততা, এবং শরীরেই পটুতা সম্বর্ধন সহকারে সকল কাজ করেনা।

* সাম্যবাদ হইতে সমাজের মধ্যে এক প্রকারের অসন্তোষ এবং অসুখের কারণ উপস্থিত হয়। মুখে যিনি যাহা বলুন, সামান্যতম মানুষ মানুষের অপেক্ষা বড় হইতে চায়। অতএব একপক্ষে সাম্যধর্ম পালন, পক্ষান্তরে অন্য মানুষ অপেক্ষা বড় হইবার প্রয়াস, এই দুয়ের সামঞ্জস্য ঘটিয়া উঠে না।

* মনােবৃত্তি মাত্রেরই কারণ শক্তির নাম স্মৃতি—অর্থাৎ স্মৃতিকে অবলম্বন করিয়াই সকল মনােবৃত্তি কার্যকারিণী হয়। 

* মনিব ধনশালী বলিয়া মানুষ, আর চাকর ধনহীন বলিয়া পশু হইতে পারে না। এমন স্থলে চাকর পশু হইলে মনিবও পশু হইবেন। 

* কুটুম্বকে অর্থলােভী জ্ঞান করিও না। তিনি তােমার গৌরবে আপনি গৌরবান্বিত হইতে চাহেন। 

* কন্যা অতি অল্প বয়সেই অন্যের যত্ন করিতে পারে। ফলকথা কন্যাসন্তানের অপেক্ষা পুত্রসন্তানের একটু বেশি যত্ন লইলেই যে উহাদের মধ্যে সাম্যভাব উদ্রেকের বিশেষ ব্যাঘাত হয় তাহা নহে। এ যাহারা ধর্ম শিক্ষা দিবেন, তাহারই সকল শিখাইবেন ইহাই স্বভাবসিদ্ধ পদ্ধতি। পূর্বকালে ভারতবর্ষে ঐ পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, ব্রাহ্মণেরাই ধর্ম, বিজ্ঞান, শিল্প প্রভৃতি যাবতীয় বিষয়ের শিক্ষা প্রদান করিতেন। মুসলমানদিগের মধ্যে মুল্লা বা যাজকের দলই প্রধানত শিক্ষকতা কার্য করিয়া থাকেন। বৌদ্ধ জাতীয়দিগেরও ঐ রীতি। অতএব যাহা পূর্বে ছিল এখনও আছে, তাহা পরেও থাকিবার সম্ভাবনা।


লেখক , শিক্ষাবিদ , শিক্ষাদর্পণ পত্রিকার সম্পাদক ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের বানী লেখক , শিক্ষাবিদ , শিক্ষাদর্পণ পত্রিকার সম্পাদক  ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের বানী Reviewed by WisdomApps on ডিসেম্বর ০৩, ২০২১ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.