সংক্ষেপে জেনে নিন সত্যজিৎ রায়ের জীবনী

 সত্যজিৎ রায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী 

বায়োগ্রাফী অফ সত্যজিৎ রয়


"পথের পাঁচালীর তুল্য ছবি বিশ্বে এ যাবৎ নির্মিত হয়নি।"

সত্যজিৎ রায় যে বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ চিত্রপরিচালকদের একজন, এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ কম। তিনি সামগ্রিকভাবে বাঙ্গালী জাতিকে বিশ্বের দরবারে গৌরবান্বিত করেছেন। ১৯৫৯ খৃষ্টাব্দে দুনিয়ার সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম চিত্রপরিচালক আইজেনস্টাইনের স্ত্রী ও সহকারিণী মেরী সিটন কলকাতায় এসে বলেন, “পথের পাঁচালীর তুল্য ছবি বিশ্বে এ যাবৎ নির্মিত হয়নি। " 

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং কলকাতায় এসে সত্যজিৎ রায়কে তাদের দেশের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করে যান। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে সত্যজিৎ যতবার যতভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন, তার দ্বিতীয় নিদর্শন এ দেশে নেই।

জন্মঃ ১৯২১ খৃষ্টাব্দে ২রা মে সত্যজিৎ রায়ের জন্ম কলকাতার এক সুপরিচিত সাংস্কৃতিক পরিবারে। তার বাবা সুকুমার রায় বাংলা সাহিত্যের এক দিকপাল কবি-লেখক। তাঁর ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশাের রায়চৌধুরিও একজন স্বনামধন্য শিশুসাহিত্যিক। মা সুপ্রভা রায় একজন শিক্ষিকা। সত্যজিৎ মাত্র আড়াই বছর বয়সে পিতৃহারা হন।

পড়াশুনাঃ  সত্যজিৎ রায় ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক।কম বয়সেই ফটোগ্রাফিতে চমৎকার হাত। এর জন্য এক প্রতিযােগিতায় তিনি পুরস্কৃতও হন। শান্তিনিকেতনে তিনি যখন চিত্রশিল্পের ছাত্র, রবীন্দ্রনাথ তখন জীবিত। রবিঠাকুরের স্নেহধন্য হয়েছিলেন তিনি।

চিত্রাঙ্কনে ডিপ্লোমা পাবার পর সত্যজিৎ সে সময়ের বিখ্যাত বাংলা প্রকাশন সংস্থা সিগনেট প্রেসের সঙ্গে যুক্ত হন। সিগনেট থেকে প্রকাশিত প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের গ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকাই তখন তার কাজ। সেই সময় তিনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ পাঠ করেন ও গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তাঁর মনে বাসনা জাগে উপন্যাসটির চলচ্চিত্রায়ন করবার।

১৯৫০ খৃষ্টাব্দে কলকাতায় তার সঙ্গে পরিচয় হয় এখানে আউটডাের শুটিং করতে আসা বিশ্বখ্যাত ফরাসী চিত্রপরিচালক জাঁ রেনােয়ার সঙ্গে । কথা বলে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। 

কাজঃ ১৯৫১ খৃষ্টাব্দে সত্যজিৎ ডি, জে, কিমার কোম্পানিতে আর্ট ডিরেক্টরের চাকরি নেন ও সেই সুবাদে ইংল্যান্ডে যান। বিলেতে গিয়ে প্রচুর বিখ্যাত সিনেমা দেখেন। তাঁর চিত্রপরিচালক হবার স্বপ্ন আরও ঘনীভূত হয়। দেশে ফিরে ‘পথের পাঁচালী’-র সচিত্র চিত্রনাট্য রচনা করেন। কিন্তু সিনেমা বানাতে গেলে যে পরিমাণ টাকার দরকার, সত্যজিতের তা ছিল না। তিনি তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেখা করে নিজের পরিকল্পনার কথা জানান ও সরকারি সাহায্য প্রার্থনা করেন। নব বাংলার রূপকার বিধানচন্দ্র রায় তাকে আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস দেন।

সত্যজিৎ নিজের যতটুকু সম্বল ছিল, সবই ব্যয় করলেন সেই ছবি তৈরি করতে। তারপর এল সরকারি সাহায্য। ১৯৫৫ খৃষ্টাব্দের শেষের দিকে ‘পথের পাঁচালী’ নির্মিত হল। প্রথম প্রদর্শনের পর বাংলার শিক্ষিত জনগােষ্ঠী সত্যজিৎকে বিপুলভাবে অভিনন্দন জানান। ১৯৫৬ খৃষ্টাব্দে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘পথের পাঁচালী’ পুরস্কৃত হয় ‘শ্রেষ্ঠ মানবিক আবেদনসমৃদ্ধ চলচিত্র’ রূপে।শুরু হয়ে গেল সত্যজিৎ রায়ের জয়যাত্রা।

‘পথের পাঁচালী’-র পর একে একে তার পরিচালনায় বেরিয়ে এল ‘অপরাজিত’ ‘অপুর সংসার’ ‘জলসাঘর’ ‘পরশপাথর’ ‘তিন কন্যা’ ‘মহানগর’ ‘অশনি সংকেত’ ‘নায়ক’ ‘অভিযান’ ‘গণশত্রু’ ‘সােনার কেল্লা' , 'শতরঞ্জ কা খিলাড়ি' , 'শাখা-প্রশাখা’ ‘গুপি গায়েন বাঘা বায়েন’ ‘আগন্তুক’-এর মত ছবি। বেশির ভাগ ছবিরই তিনি একাধারে পরিচালক, চিত্র নাট্যকার ও সঙ্গীত পরিচালক। ‘অপরাজিত’ ছবি ভেনিস থেকে নিয়ে এল ‘গােল্ডেন লায়ন' । 

সত্যজিৎ একজন কুশলী সাহিত্যিকও। ফেলুদা’ ও ‘প্রফেসর শঙ্কু' তার সৃষ্টি দুটি অনবদ্য বুদ্ধিদীপ্ত চরিত্র। তাঁর রচিত প্রতিটি গ্রন্থ আজও খুব পাঠকপ্রিয়। সত্যজিৎ রায় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথের ওপর একটি অসাধারণ তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেন—যেখানে ভাষ্যকারের ভূমিকা তিনি স্বয়ং পালন করেন।

তিনি সারা বিশ্ব থেকে এত পুরস্কার পান যে তার তালিকা করতে বসলে অবাক হতে হয়। মৃত্যুর পূর্বে তার সমগ্র কীর্তির জন্য সত্যজিৎকে ‘অস্কার’ পুরস্কারও দেওয়া হয়। ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ভারতরত্ন’ও তিনি লাভ করেন। 

১৯৯২ খৃষ্টাব্দের ২৩শে এপ্রিল বাংলার এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা পরলােকের পথে যাত্রা করেন।


সংক্ষেপে জেনে নিন সত্যজিৎ রায়ের জীবনী সংক্ষেপে জেনে নিন সত্যজিৎ রায়ের জীবনী Reviewed by WisdomApps on অক্টোবর ২২, ২০২১ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.