সেলাই মেশিন ও আলকাতরা আবিষ্কারের গল্প

সেলাই মেশিন বা সেলাই কলের আবিষ্কারের ইতিহাসটি এক্কেবারে অন্যরকম -সাহসী চাষির ইচ্ছাশক্তির কথা জেনে নিন ভালো লাগবে ।
picture courtesy - American Historama


সেলাই কল (১৮৫৪)- এলিয়াস হাউস (১৮১৯-১৮৬৭)

সেলাইকল বানানোর ইতিহাস শুরু হয়েছিল  দীর্ঘকাল ধরে। প্রথম সেলাইকল তৈরী করেছিলেন ১৭৯০ সালে ইংল্যান্ডের টমাস সেন্ট। এই কালে অবশ্য কেবল চামড়া সেলাই হত। কাপড় সেলাই করার কল বানালেন ফরাসী দরজী টিমোমনিয়ার। আশিটি কল তৈরী করে তিনি একটি কাপড় সেলাই-এর কারখানাও খুলেছিলেন কিন্তু সাধারণ দরজীরা কলের বাহাদুরীকে মেনে নিতে পারল না। নষ্ট করে দিল তারা কারখানাটাকে। ১৮৩৩ সালে আমেরিকার ওয়াল্টার হান্টও উন্নত ধরনের সেলাইকল তৈরী করলেন। কিন্তু তিনি জনসাধারণকে জানালেন না তাঁর আবিস্কারের কথা। ফলে অজানাই রয়ে গেল তাঁর সেলাই কল।
এর কয়েক বছর পর সেলাইকলের ইতিহাসে সাহসের সাথে এগিয়ে এলেন এক দরিদ্র আমেরিকান কৃষক এলিয়াস হাউi। তিন সন্তানের পিতা এলিয়াসের সংসারে নিত্য অভাব। তাই তাঁর স্ত্রীকেও জামা সেলাই করে টাকা রোজগার করতে হত। গভীর রাত পর্যন্ত স্ত্রী সেলাই করেন। অথচ হাতে পান গুটি কয়েক টাকা। স্ত্রীর পরিশ্রম কমানোর ভাবনা থেকেই সেলাই কল বানাবার চিন্তাটা মাথায় আসে এলিয়াসের। সংসারই চলে না, সেলাইকল বানাবার পয়সা কোথায়। তাই এলিয়াস ছুটে গেলেন বন্ধু জর্জ ফিশারের কাছে।
 ১৮৪৪ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে এলিয়াস সেলাইকল বানাবার চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। প্রায় সবটা বানিয়ে ফেললেও একটা বিষয়ে মুস্কিলে পড়ে গেলেন তিনি। যে সুঁচ দিয়ে সেলাই করা হয় তাঁর পেছনের ফুটোয় সুতো পরিয়ে আমরা সেলাই করি। কিন্তু সুঁচের সুতোটা যদি পিছনে থাকে তবে সেলাইকলে সেলাই হবে কি করে ? কয়েক বছর ধরে তিনি কোনো উপায় বের করতে পারলেন না। একদিন তিনি দেখলেন একটা অদ্ভুত স্বপ্ন।
এক অসভ্যদেশের রাজা এলিয়াসকে বন্দী করে নিয়ে এসে হুকুম করলেন সেলাইকল বানিয়ে দিতে হবে। না হলে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এলিয়াস তো একটুর জন্য সেলাইকলটা পুরোপুরি বানাতে পারছেন না। তাই রাজার আদেশে সেপাই বল্লম নিয়ে মারতে এল তাঁকে। বল্লমটা যখন প্রায় ঠেকে এসেছে তাঁর বুকের কাছে এমন সময় দেখলেন বল্লমের ফলকের মুখে একটা ছোট্ট ফুট। ভয়ে ঘুম ভেঙে গেল তাঁর, তখনি মনে হল যদি সুঁচেরও মুখের কাছে ফুটো করে সুতো পরানো যায় তাহলে কেমন হয় ?
১৮৫৪ সালে এপ্রিল মাসে সেলাইকল পুরোপুরি বানিয়ে নিজের আর বন্ধু ফিশারের জন্য দুটো স্যুট বানিয়ে ফেললেন। এবার তিনি নামলেন প্রচারের কাজে। নানান ঝড়-ঝাপটা  পর আলো দেখলেন। প্রচুর অর্থও রোজগার করতে লাগলেন সেলাইকল থেকে। সেলাইকলের আবিস্কারক হিসাব ছড়িয়ে পড়ল তাঁর নাম।


প্রবাদে বলে বাঙালি নাকি ফ্রি দিলে আলকাতরাও ছাড়ে না । তা ভালো , নষ্ট হওয়ার থেকে ব্যবহার করাকেই আমরা সঠিক মনে করি । আসুন জেনে নি এই আলকাতরার আবিষ্কারের ইতিহাস 

আলকাতরা - উইলিয়াম হেনরী পার্কিনস (১৮৩৮)


খনি থেকে উত্তোলিত কয়লাকে জ্বালানীর কাজে লাগাতে গেলে কয়লাকে পুড়িয়ে নিতে হয়। পোড়ানোর সময় উৎপন্ন হয় প্রচুর গ্যাস। ১৬৬০ সালে জন ক্লেট্যান ও রবার্ট বয়েল ঐ গ্যাসের পরিচয় জানার জন্য গ্যাসটিকে নলের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করিয়ে ঠাণ্ডা করলেন। তাঁরা দেখলেন নলের গায়ে জমছে কুচকুচে কালো দুর্গন্ধযুক্ত  একটি তরল পদার্থ। কিন্তু পদার্থটি যে কি তার সন্ধান তাঁরা পেলেন না। 
এরপর দীর্ঘ কয়েক শতক কেটে গেছে।লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ সায়েন্সের কৃতী ছাত্র উইলিয়াম হেনরী পার্কিনস নতুন পদার্থটির প্রকৃত পরিচয় দিলেন। তরল পদার্থটির নাম দিলেন আলকাতরা। 
আলকাতরা উৎপন্ন করতে গেলে অগ্নিসহ মাটি দিয়ে তৈরী কতকগুলো আবদ্ধ বকযন্ত্রে বায়ুহীন পরিবেশে বিটুমিনাস কয়লাগুঁড়কে প্রডিউসার গ্যাসের সাহায্যে ১০০০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। উত্তপ্ত কয়লার উদ্বায়ী ও অনুদ্বায়ী দুটি অংশ আলাদা করে নিয়ে উদ্বায়ী গ্যাসীয় পদার্থগুলি বাঁকানো লোহার নলের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করিয়ে তারপর একটি ঠাণ্ডা জলের পাত্রে লোহার নলটিকে রাখা হয়। ঠাণ্ডার সংস্পর্শে এসে গ্যাস থেকে আলকাতরা বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি আলাদা পাত্রে জমা হতে থাকে।
পার্কনসের গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা আলকাতরা নিয়ে গবেষণা চালাতে থাকেন, গবেষণার ফলে জানা যায় আলকাতরায় যেসব পদার্থ মিশ্রিত আছে তাদের স্ফুটনাঙ্ক বিভিন্ন। ১৭০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড উষ্ণতায় আলকাতরা পাতিত করে পাওয়া যায় লঘু তেল। এই লঘু তেলের মধ্যে থেকে পাওয়া যায় বেঞ্জিন, টাইলুন ও জাইলিন। ১৭০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড থেকে ২৩০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড উষ্ণতায় পাতিত করলে পাওয়া যায় মধ্যম তেল। যার থেকে পাওয়া যায় কার্বলিক অ্যাসিড ও ন্যাপথলিন। ২৩০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড থেকে ২৭০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড উষ্ণতায় পাতিত করলে পাওয়া যায় ভারী তেল বা ক্রিয়াজোট তেল। যার থেকে পাওয়া যায় কেসলস। 
  ২৭০ থেকে ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড ৩৬০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড উষ্ণতায় পাতিত করলে পাওয়া যায় সবুজ তেল বা অ্যান্থ্রাসিন তেল। এর থেকে পাওয়া যায় অ্যান্থ্রাসিন ও ফেনানথ্রিন। অবশেষে বাকি যা পড়ে থাকে তা হল পিচ। আলকাতরায় কার্বন পারমানুগুল বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মিশে থাকে বলে আলকাতরার রঙ কুচকুচে কালো। 
বেঞ্জিন, টাইলুন প্রভৃতি বস্তুকে মোটরগাড়ির জ্বালানী রুপে, ড্রাইওইয়াসে, ওষুধ এবং বিস্ফোরক তৈরীতে ব্যবহার করা হয়। টাইলুন থেকে আবার স্যাকারিন পাওয়া যায়। কার্বোলিক অ্যাসিড ও ন্যপথলিন ব্যবহৃত হয় ওষুধ ও বিস্ফোরক তৈরীতে এবং প্লাস্টিক শিল্পে। রঞ্জক হিসেবে। কাঠ সংরক্ষণের কাজে, পিচ্ছিল কারক তেল তৈরীতে ক্রিয়জেট তেল ও অ্যান্থ্রাসিন  বা সবুজ তেল ব্যাবহার করা হয়। পিচ ব্যবহৃত হয় রাস্তা তৈরীর কাজে, পোকামাকড়ের হাত থেকে কাঠকে সুরক্ষা দেবার জন্য এবং লোহায়  মরিচা রোধ করার  কাজে।   

সেলাই মেশিন ও আলকাতরা আবিষ্কারের গল্প সেলাই মেশিন ও আলকাতরা আবিষ্কারের গল্প Reviewed by Kona Dey Chakraborty on September 14, 2018 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.