কালনা - কি কি দেখবেন ? ১০৮ শিবমন্দির ও অন্যান্য স্থানের ইতিহাস ও বৃত্তান্ত

কালনা তে অনেক প্রাচীন আর ঐতিহাসিক মন্দির থাকার কারনে একে মন্দিরের শহর ও বলা হয়। এখানে অনেক দেখার জায়গা আছে যেমন
১. কালনা ১০৮ শিব মন্দির
২. কালনা রাজবাড়ি
৩. মহিষ মর্দ্দিনী ঘাট
৪. গোপাল মন্দির
৫. সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির
৬. অনন্ত বাসুদেব মন্দির
এছাড়াও আরো কিছু ছোট বড় জায়গা আছে। আসুন জেনে নিই কোন স্থানের কি ইতিহাস ও কীভাবে সেখানে যাবেন ।



১। কালনা ১০৮ শিবমন্দির
যাই হোক কালনা স্টেশনে নেমে টোটো করে সহজেই যেতে পারবেন কালনা ১০৮ শিব মন্দিরে (ভাড়া পরে মাথা পিছু ১০ টাকা)
কালনা ১০৮ শিব মন্দিরের ইতিহাসঃ মহারাজা তেজ চন্দ্র বাহাদুর ১৮০৯ সালে এই ১০৮ শিব মন্দির তৈরি করেন।এই ১০৮ শিব মন্দির এখন আর্চিওলজিক্যাল সার্ভে অফ্ ইন্ডিয়া বা ASI এর অন্তর্ভুক্ত। আর খুব গর্বের সাথে বলতে ইচ্ছা করে এখানে ইতিহাস সুরক্ষিত। খুব ভালো তত্ত্বাবধানে রয়েছে এই ১০৮ টি মন্দির। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে ভাবতেও অবাক লাগে ১৮০৯ সালে কত কম প্রযুক্তি নিয়ে এত সুন্দর কিছু তৈরি করা হয়।
কালনা ১০৮ শিব মন্দিরের আর্কিটেকচারঃ কালনা ১০৮ শিব মন্দিরের আর্কিটেকচার সত্যিই অবাক করে দেয়। দুটো সমকেন্দ্রিক বৃত্তের ওপর তৈরি হয়েছে এই ১০৮ টি শিব মন্দির। ভিতরের বৃত্তে আছে ৩৪ টি আর বাইরের বৃত্তে আছে ৭৪ টি মন্দির। সবকটি মন্দির ই তৈরি হয়েছে আটচালা স্টাইলে। আর প্রতিটি মন্দিরে আছে একটি করে শিব লিঙ্গ। শোনা যায় এই মন্দিরের দেওয়ালে রামায়ন আর মহাভারতের গল্প লেখা আছে।
ভিতরের ৩৪ টি শিব মন্দিরের সব কটি শিব লিঙ্গ সাদা আর বাইরের ৭৪ টি শিব মন্দিরের মধ্যে অর্ধেক মন্দিরে শিব লিঙ্গ কালো । অনেকে এও বলেন এই মন্দিরগুলি জপ মালার প্রতীক হিসাবে তৈরি করা হয়।


২।কালনা রাজবাড়ি
কালনা রাজবাড়ি কালনা ১০৮ শিব মন্দিরের উল্টো দিকেই। এখানে অসাধারণ টেরাকোটার কাজ করা কিছু মন্দির আছে। যা দেখে আপনি অবাক হতে বাধ্য। শোনা যায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই মন্দির গুলি তৈরি হয়, আর ওই সময়টাই ছিল কালনার ইতিহাসের সবথেকে গৌরবের সময়।
কালনা রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে ঢুকে প্রথমেই বাম হাতে পড়বে প্রতাপেশ্বর মন্দির, তারপর বাম হতে রাস মঞ্চ, তারপর সামনে পাঁচিল ঘেরা লালজি মন্দির তারপর ডানদিকে ঘুরলেই বাম হাতে পড়বে আরো একটা ছাদ ওয়ালা স্ট্রাকচার, তারপর এগিয়েই সামনে পঞ্চরত্ন মন্দির, তারপর সামনে এগিয়েই পড়বে দুটো দরজা বাম হাতের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়বে বিজয় বৈদ্যনাথ মন্দির আর ডান হাতে দরজা দিয়ে ঢুকে পড়বে কৃষ্ণ চন্দ্রজি মন্দির। এবার এই সবকটি মন্দিরের সম্মন্ধে জেনে নিন
প্রতাপেশ্বর মন্দিরঃ ১৮৪৯ সালে এই মন্দির তৈরি হয় শিব ঠাকুরের জন্য। একটি ভিতের ওপর বানানো হয় এই মন্দির। আকারে সব থেকে ছোটো হলেও এই মন্দিরের টেরাকোটার কাজ বোধয় সবথেকে সেরা আর তার সাথেই সব থেকে সুন্দর করে সংরক্ষিত। এই মন্দিরের চার দিকের দেয়ালে চোখে পড়ে দুর্দান্ত টেরাকোটার কাজ। দেব, দেবী, মহাকাব্য কিছুই বাদ পড়েনি। এককথায় এই মন্দিরের কারুকার্যের সৌন্দর্য্য বর্ণনাতীত।
রাস মঞ্চঃ প্রতাপেশ্বর মন্দিরের ডান হাতেই পড়বে অস্টভূজাকার রাস মঞ্চ। রাস মঞ্চের ছাদ বোধয় অনেকদিন আগেই ভেঙে গেছে। এখন রাস মঞ্চের বাকি অংশ ২৪ টি পিলারের ওপর দাড়িয়ে আছে।
লালজি মন্দিরঃ রাস মঞ্চ থেকে সামনে এগোলেই একটি দরজা পরে সেটা দিয়ে ভিতরে ঢুকলেই দেখতে পাওয়া যাবে লালাজি মন্দির। এই মন্দিরটি রাধা কৃষ্ণের জন্য বানানো হয়। ১৭৩৯ সালে এই মন্দিরটি তৈরি হয় আর এটিই কালনা রাজবাড়ির প্রাচীনতম মন্দির। ইট দিয়ে তৈরি এই মন্দিরে মোট তিনটি তলা আর ২৫ টি চুড়া আছে।
এছাড়াও মন্দিরের সামনে একটি চার চালা নাট মঞ্চ আছে। এছাড়া এই মন্দিরের গায়ে ও যে টেরাকোটার কাজ আছে তা যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
পঞ্চরত্ন মন্দিরঃ লালাজি মন্দির থেকে বেরিয়েই বাম দিকে গেলে চোখে পড়বে পঞ্চরত্ন মন্দির। এই পাঁচটি আট চালা মন্দির ঊনবিংশ শতাব্দী তে তৈরি হয়। এই সব কটি মন্দির ই বানানো হয় শিব ঠাকুরের জন্য।
কৃষ্ণ চন্দ্রজি মন্দিরঃ পঞ্চরত্ন মন্দির থেকে সামনে এগিয়েই ডান হাতে একটা দরজা পড়ে, সেটা দিয়ে ঢুকলেই দেখা যাবে কৃষ্ণ চন্দ্রজি মন্দির। এই মন্দিরটি তৈরি হয় ১৭৫১-৫৫ সালে। রাধা কৃষ্ণের জন্য বানানো এই কৃষ্ণ চন্দ্রজি মন্দির আরো একটি অসাধারণ ইট দিয়ে তৈরি এই মন্দির।এই মন্দিরেও মোট ২৫ টি চুড়া আছে এছাড়া এই মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি সুদর্শন একচালা।
গোটা বাংলাতে মোট ৫ টি ২৫ চুড়া মন্দির আছে, তারমধ্যে ৩ টি কালনা তে, আবার সেই ৩ টি মন্দিরের মধ্যে ২ টি আছে কালনা রাজবাড়িতে।
বিজয় বৈদ্যনাথ মন্দিরঃ একটি উঁচু ভিতের ওপর বানানো এই ইট দিয়ে তৈরি মন্দির। মন্দিরের সামনে রয়েছে নানা পোড়া মাটির কাজ।

এই গোটা জায়গাটাই এখন আর্চিওলজিক্যাল সার্ভে অফ্ ইন্ডিয়া বা ASI এর অন্তর্ভুক্ত। আর সত্যিই খুব ভালো তত্ত্বাবধানে রাখা আছে । মাঝখানে সুন্দর বাগান বানানো আছে। আমরা এখানে অনেকক্ষণ ছিলাম। এখানে থেকে সময় যে কি করে কেটে যায় বোঝাই যায় না। মাঝে মাঝে ভাবতেও অবাক লাগে এত সুন্দর ঐশ্বর্য্য লুকিয়ে আছে আমাদের বাংলার ইতিহাসে।




৩।মহিষ মর্দ্দিনী ঘাটঃ

কালনা রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা একটি টোটো পাই। চালকের নাম লিটন চক্রবর্ত্তী। তিনি আমাদের বাকি আরো কিছু জায়গা ঘুড়িয়ে দেখান। প্রথমেই আমরা যাই মহিষ মর্দ্দিনী ঘাটে। এখানে হুগলী নদী খুব একটা চওড়া না। শুনলাম শ্রাবন মাসে এখানে খুব ভালো মেলা বসে আর তখন পুতুল খেলাও দেখানো হয়।
৪।গোপালবাড়ি মন্দিরঃ মহিষ মর্দ্দিনী ঘাট থেকে লিটন আমাদের নিয়ে গেলেন গোপালবাড়ি মন্দিরে। এই মন্দিরেও মোট ২৫ টি চুড়া আছে এছাড়া এই মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি সুদর্শন একচালা। আমরা যখন আসি তখন এই মন্দিরে দুর্গা পূজা হচ্ছে। তাই মন্দিরটি খুব ভালো করে ঘোরা হয়নি। শুনলাম এই মন্দিরের গায়েও খুব সুন্দর কারুকার্য করা আছে।



৫।সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরঃ

গোপালবাড়ি মন্দির থেকে বেরোনোর পর লিটন আমাদের নিয়ে যায় সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরে। ৬৮৮ সালে এই মন্দির তৈরি করেন ঋষি আম্বুরিষ। এই মন্দিরকে অম্বিকা কালনা মন্দিরও বলা হয়। এটিই কালনার প্রাচীনতম মন্দির। মন্দিরের মধ্যে সবেকিআনার ছাপ স্পষ্ট। যদিও মন্দিরটি সংস্কার করার কাজ করা হয়েছে।
৬।অনন্ত বাসুদেব মন্দিরঃ
আমাদের হাতের সময় শেষ হয়ে আসছিল। তার মধ্যে শেষ সময় টুকু নিয়ে আমরা গেলাম অনন্ত বাসুদেব মন্দির। প্রায় ২৫০ সাল আগে বর্ধমানের রাজা এই মন্দির তৈরি করেন। প্রায় ৬০ বছর আগে এই মন্দির সংস্কার করা হয়।




লেখাটি সৌমেন্দু ঘোষের লেখা থেকে সাহায্য নিয়ে বানানো হয়েছে ।


কালনা - কি কি দেখবেন ? ১০৮ শিবমন্দির ও অন্যান্য স্থানের ইতিহাস ও বৃত্তান্ত কালনা - কি কি দেখবেন ? ১০৮ শিবমন্দির ও অন্যান্য স্থানের ইতিহাস ও বৃত্তান্ত Reviewed by WisdomApps on জানুয়ারী ১৫, ২০২০ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.