বিনা পুঁজিতে কিভাবে পাউরুটি, কেক ও বিস্কুট তৈরির ব্যবসা করবেন ? জেনে নিন বেকারি ব্যাবসার বিস্তারিত

 পাউরুটি, কেক ও বিস্কুট তৈরির বেকারির ব্যবসা


বেশিরভাগ শহরে এবং অনেক গ্রামেই এখন সকালের প্রথম খাবার পাউরুটি , সাথে হতে পারে মাখন , জ্যাম , ডিম বা অন্য কিছু কিন্ত বাড়িতে বানানো আতার রুটির চাহিদা বাচ্চা বুড়ো এবং ব্যাস্ত গৃহিণীর কাছে ক্রমশই কমছে । এই সময়ে বড় সমস্যা হলো কোয়ালিটি প্রোডাক্টের । এখোনো গ্রামে-শহরে সর্বত্রই পাউরুটির এত ভালাে চাহিদা থাকা সত্বেও কমা মানের প্রোডাক্টেরই রমরমা । তবে এর নিশ্চিত বাজার থাকায় উদ্যমী বেকাররা সামান্য কয়েক লাখ টাকার পুঁজি নিয়ে পাউরুটি তৈরির বেকারি করতে পারেন। স্বয়ংক্রিয় মেশিন বসিয়ে এই কারখানা করলে প্রতিদিন যে পাউরুটি তৈরি হবে, তার বিক্রির বাজার এখনাে শহরতলি ও গ্রামে অফুরন্ত। পাউরুটির পাশাপাশি ডিসেম্বরে কেক ও প্যাটিসের চাহিদা বাড়বে। এছাড়াও প্যাকেট করা বিস্কুট ও ছোট কেকের চাহিদা সারা বছর থাকেই। কম দামে ভালো মানের ফুড প্রোডাক্টের অভাব ভারতে চিরকাল । অল্প লাভ দিয়ে শুরু করে বড় কিছু করতে চাইলে এই ব্যাবসার তুলনা নেই । 

আসুন জেনে নিন বেকারী ব্যাবসার খুঁটিনাটি 


বেকারির ব্যবসার কাঁচামাল কি কি ? 

পাউরুটি তৈরির জন্য দরকার হয় এইসব কাচামাল : ময়দা, ডালডা, খাবার লবণ, চিনি, ইস্ট আর বেকিং পাউডার। তবে শুরুতে বেকিং পাউডার না দিলেও চলে। পাউরুটি তৈরিতে ইস্টের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ইস্ট পাউরুটিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেয়। ইস্টে রঙ সাদা বা, হাল্কা বাদামি। অধিকাংশ বেকারিতে মাখনের বদলে ডালডা দেওয়া হয়। কারণ মাখন ব্যবহারে পড়তায় আসে না। তবে আপনি চাইলে মাখন ব্যাবহার করতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী মার্কেটিং করতে পারেন । এখন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মানুষ একটু পয়সা বেশী দিয়ে ভালো স্বাস্থ্যকর খাবার পছন্দ করে । সঠিক ভাবে বাজারে প্রচার করতে পারলে মাখন দেওয়া পাউরুটির চাহিদা আকাশ ছোয়া হতে দেরি লাগবে না। 


বেকারির ব্যবসার কাঁচামাল কোথায় পাবেন ? 

ওপরের যাবতীয় উপাদান পাবেন স্থানীয় মুদিখানার দোকানে। ইস্ট পাইকারি দরে পাবেন পাবেন কলকাতার ক্যানিং স্ট্রিটের (বড়বাজার) বিভিন্ন দোকানে। এছাড়া অনলাইনে খুঁজে দেখতে পারেন । 

বেকারির ব্যবসার যন্ত্রপাতি কি কি ? 

দরকারি যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের মধ্যে আছে : (১) ভাটি বা বিদ্যুৎচালিত উনুন, (২) ময়দা মাখার মিক্সচার মেশিন, (৩) স্লাইসড পাউরুটির জন্য স্লাইসিং মেশিন, (৪) ময়দা শিফটার মেশিন, (৫) চিনি গুঁড়াে করার গ্রাইন্ডিং মেশিন, (৬) ব্রেড মােল্ডার মেশিন, (৭) কেক করতে চাইলে কেক তৈরির উপযােগী বিদ্যুচ্চালিত ক্রিম ও ডিম মিক্সচার মেশিন, (৮) ওজন অনুযায়ী বিভিন্ন মাপের মােল্ডার বা, ছাঁচ, (৯) ভাটিতে পাউরুটি ঢােকানাের জন্য নানান মাপের ট্রে। 

বেকারির ব্যবসার যন্ত্রপাতি কোথায় পাবেন? 

যাবতীয় যন্ত্রপাতি ও ভাটি পাবেন শ্যামবাজারের আর.জি. কর রােডের বিভিন্ন দোকানে। এছাড়াও পাবেন এই ঠিকানায় ওরিয়েন্টাল মেশিনারি, ২৫, আর.এন. মুখার্জি রােড, কলকাতা - ৭০০০০১। ছাঁচ বা, মােল্ড পাবেন গণেশচন্দ্র অ্যাভেনিউ ও দমদমের কৃষ্ণপুর লেনের নানান দোকানে। অনলাইনে বেশ কিছু সাইটে পেয়ে যাবেন । Indiamart এ খুঁজে দেখতে পারেন । 


ভাটি কি ? 

পাউরুটি সেঁকার জন্য ভটি তৈরি করা হয় বিশেষ পদ্ধতিতে। গ্রাম বা, আধা শহরে পাউরুটি, কেক ও প্যাটিস তৈরিতে ছােট ভাটাই যথেষ্ট। এর মাপ হল ৮ ফুট x ১০ ফুট। তাপ ধরে রাখার উপযুক্ত ঝামা ইট দিয়ে তৈরি এটা আসলে বন্ধ কুঠুরি। দুদিকে ঢাল থাকে। ছাদও তৈরি হয় তাপ ধরে রাখার ঝামা ইটে। মাটি থেকে ৪ ফুট উঁচু একটি মাটির বেদির ওপর তৈরি হয় কুঠুরির মেঝে। কুঠুরির উচ্চতা হয় ৫ ফুট। সামনের দিকে ঘুলঘুলির মতাে ফাক দিয়ে পাউরুটি, কেক, প্যাটিস ট্রেতে করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আর এইসব খাদ্যপণ্য তৈরি হলে বের করা হয়। ঘুলঘুলির মতাে ফাঁকা জায়গা টিন বা, অ্যাসবেস্টসের পাল্লা দিয়ে বন্ধ করা যায়। কুঠুরির একটু দূরে পাউরুটি ঢুকিয়ে দেওয়া আর কর্মসৃজন টেনে আনার জন্য তক্তা লাগানাে লম্বা লাঠি ব্যবহার করা হয়। কুঠুরিতে রুটি সেঁকার উপযােগী তাপের জন্য কাঠ ঠেলে দেওয়া হয়। একবার কুঠুরিকে গরম করতে পারলে ৭ দিন গরম থাকে। কুঠুরির ভিতরের ধোঁয়া বাইরে বের করার জন্য ছাদের ওপরে চিমনি বসাতে হয়। 


বেকারির ব্যবসার পাউরুটি তৈরির পদ্ধতি কি ? 

পাউরুটি তৈরির জন্য এইসব উপাদান মেশাতে বেকারিতে হবে এইসব অনুপাতে : ময়দা (২৫ কেজি), ডালডা (২০০ গ্রাম), লবণ পারেন (৪৫০ গ্রাম), জল (১৩.৫ লিটার), ইস্ট(২৫০ গ্রাম), চিনি (৫০০ গ্রাম)। 

প্রথমে গ্রাইন্ডিং মেশিনে চিনি গুঁড়াে করে নিতে হবে। তারপর ওপরের ওইসব উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মাখার পর অন্তত ৩-৪ ঘন্টা ফেলে রাখতে হবে। সময় কমাতে চাইলে ইস্টের পরিমাণ দ্বিগুণ করতে হবে। এরপর মাখা ময়দায় গেঁজা তুলতে হলে মাখা ময়দাকে গােল বলের মতাে করে নিয়ে মসৃণ আর চকচকে পাত্রে ভরে নিতে হবে, যাতে ওই ময়দার বল শুকিয়ে ফেটে না যায়। ময়দাকে গাঁজানাের সময় তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে রাখতে হবে। শীতকালে তাপমাত্রা কমে গেলে গরম করতে হতে পারে। ময়দা গাঁজানাের সময় তার মধ্যে নরমভাব কেমন আছে, তা জানতে আঙুল ঢুকিয়ে দেখতে  পারেন। মাখা ময়দায় যাতে গ্যাস না জমে, সেজন্য গাঁজা তােলার পর পাঞ্চ করতে হয়। ময়দা মাখা, গাঁজা তােলার পর নরম ময়দার এমন মাপের লেচি করতে হবে, যাতে লেচি ছাঁচের শুধুমাত্র অর্ধেক জায়গা জুড়ে থাকে। এবার ছাঁচে বা মােল্ডে লেচি ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ গাঁজা বা রস বেরােলে মুছে দিন। 

রুটির মাপ অনুযায়ী ছাঁচও হয় বিভিন্ন মাপের। গভীরতা যেমন, ১০০ গ্রাম ২০০ গ্রাম ও ৪০০ গ্রাম। গােলরুটির জন্য লাগে যন্ত্রের গােলাকার ছাঁচ। সেকার জন্য তাপমাত্রা লাগে ১৯৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা, ৩৮৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। কিছুদিন সেঁকার পর এই তাপমাত্রা সম্পর্কে আন্দাজ এসে যায়। তবে তাপ ওঠাতে হলে গরম ভাটিতে কাঠ গুজতে পারেন আর তাপ কমাতে চাইলে কলাগাছের কাণ্ড ঢােকাতে পারেন। কোয়ার্টার পােশাক অর্থাৎ ১০০ গ্রাম ওজনের পাউরুটি সেঁকে খাওয়ার উপযুক্ত হতে সময় লাগে ৫-৬ মিনিট। ২০০ থেকে ৪০০ গ্রামের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ মিনিট। যখন পাউরুটি ছাঁচের মধ্যে কুঁচকে যাবে ও হাল্কা কালচে লাল রা, বাদামি হবে তখন বুঝতে হবে পাউরুটি তৈরি হয়েছে। 

পাউরুটি তৈরি হয়ে গেলে ছাঁচ ভরতি ট্রে নিয়ে এনে ঠান্ডা করতে হবে। রুটি ঠান্ডা হয়ে গেলে স্লাইসিং মেশিনে স্লাইস করে কেটে প্যাকেটে ভরতে হবে। ক্রেতাদের নজর টানতে হলে কিন্তু প্যাকেজিং ভালাে হওয়া  চাই। বেশি লাভ রাখতে চাইলে পাউরুটির পাশাপাশি কেক ওবিস্কুট তৈরি করতে হবে। 


বেকারি ব্যাবসার জন্য কোথায় টাকা পাবেন ? 

সব মেশিন , জায়গা , পারমিশন , কাঁচামাল দিয়ে মোটামুটি ৬ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকার বাজেট ধরে নেওয়া যেতে পারে । কিন্ত এত টাকা একজন সাধারন ঘরের বেকার ছেলে বা মেয়ে পাবে কোথায় ? এই কারনে বেকার  ছেলেমেয়েরা পাউরুটি তৈরির বেকারি করতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী  কর্মসৃজন প্রকল্প বা, ‘বিবেকানন্দ বাংলা স্বনির্ভর কর্মসংস্থান প্রকল্প’  থেকে ঋণ পেতে পারেন। 


বেকারি ব্যাবসার জন্য ট্রেনিং কোথায় পাবো ? 

দেখুন আপনি প্রাথমিক ধারনা ইন্টারনেটে অনেক ভিডিও দেখে পেতে পারবেন । কিন্ত প্র্যাক্টিক্যাল কাজ করতে চাইলে পাউরুটি তৈরির পদ্ধতি  ও প্রকরণ জানতে পরিচিত কোনাে বেকারিতে গিয়ে কথা বলতে পারেন। কম্পিটিশন কম থাকায় অনেকেই খোলা মনে পাউরুটি তৈরির পদ্ধতি দেখিয়ে দেবেন । যদি তেমন যোগাযোগ না পান তাহলে এ ব্যাপারে কর্মকেন্দ্র পরামর্শ পেতে যাদবপুর আনন্দপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনােলজি বিভাগের ডেভেলপমেন্ট সেলে (EDP) যােগাযােগ করতে পারেন। প্রকল্প তৈরি ও আর্থিক অনুদান ইত্যাদি জানতে হলে যােগাযােগ করতে হবে সল্ট লেকের ময়ূখ ভবনে রাজ্য সরকারের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দফতরে।


আপনি নিজে কাজটি করতে না চাইলে কোনো বেকার ভাই বোনের সাথে লেখাটি শেয়ার করে তাঁদের উতসাহিত করতে পারেন । 

বিনা পুঁজিতে কিভাবে পাউরুটি, কেক ও বিস্কুট তৈরির ব্যবসা করবেন ? জেনে নিন বেকারি ব্যাবসার বিস্তারিত বিনা পুঁজিতে কিভাবে পাউরুটি, কেক ও বিস্কুট তৈরির ব্যবসা  করবেন ? জেনে নিন বেকারি ব্যাবসার বিস্তারিত Reviewed by WisdomApps on নভেম্বর ১৩, ২০২১ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.