মোমবাতি তৈরির ব্যবসা কিভাবে শুরু করবেন ? কিভাবে বড় করবেন ? জেনে নিন খুঁটিনাটি

অল্প পুঁজিতে ব্যবসা - সাধারন মোমবাতি বা রঙিন  মোমবাতি তৈরি 


মোমবাতি কি কাজে লাগে ? 

যে কোনাে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান থেকে শােকদিবস – সর্বত্র মােমবাতির ব্যবহার হয়। বর্তমানে বিদ্যুতের অভাবে ইলেক্ট্রিসিটির পরিপূরক হিসাবেও ব্যবহার হয় মােমবাতি। সারা বছর চাহিদা থাকলেও সেরা মরসুম: শারদোৎসব ও দীপাবলী। 

মোমবাতি তৈরির ইতিহাস - 

এ রাজ্যে প্রথম মােমবাতি তৈরি হয় নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে ১৮৯২-৯৩ সালে। যেহেতু এইসব অসংগঠিত শিল্পের ইতিহাস রাখার কোনাে পদ্ধতি ছিল না, তাই বিভিন্ন লােকের আত্মজীবনী থেকে খুঁজে পাওয়া যায় এই ছােট শিল্পের ইতিহাস। প্রথমদিকে অবাঙালীরাই এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কলকাতার বড়বাজার, তালতলা, হাটখােলা, শিয়ালদহের ডিমপট্টী – এইসব অঞ্চলে কারখানা গড়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় সরকারের চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় মােমবাতির কাঁচামালের নিয়ন্ত্রিত বাজার প্রথা চালু হওয়ায় উদ্বাস্তু ও বহু বেকার স্ব-উদ্যোগী হতে পারবে এই চিন্তায় জেলা শিল্প কেন্দ্রের মাধ্যমে মােমবাতির ব্যবসায় উৎসাহ দেওয়া হয়। পরে ব্যাপক আকারে মােমবাতি শিল্প ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে মােমবাতি শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্রশিল্প। এই শিল্প ঘিরে প্রচুর তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযােগ আছে। একসময়ে পশ্চিমবঙ্গে ২৩৩৫টি মােমবাতি তৈরির কারখানা ছিল। এর মধ্যে শুধুমাত্র উত্তর ২৪ পরগনায় ছিল ৯২৭টি। আজ গােটা রাজ্য জুড়ে এই শিল্প ছড়িয়ে পড়েছে। তা সত্ত্বেও চাহিদার তুলনায় এখনাে যােগান সীমিত। মহারাজা ক্যান্ডেলের কর্ণধার চিরঞ্জয় চক্রবর্তী ও সংহিতা চক্রবর্তি জানান, মােমবাতি তৈরির কারখানায় কারিগরি ও বিপণন ক্ষেত্রে চাকরির সুযােগ আছে। তেমনি উদ্যোগীরা নিজেরা ব্যবসা করতে পারেন। 

মোমবাতির ব্যবসা দু'ভাবে করা যায় - ট্রেডিং ও উৎপাদন। 

মোমবাতির ট্রেডিং কি ?  

ট্রেডিং মানে পণ্য কেনা বেচার ব্যবসা। মােমবাতি তৈরির কারখানা থেকে কিংবা বড়বাজার থেকে পাইকারি দরে মােমবাতি কিনে স্থানীয় দোকানে বিক্রি করতে পারেন। শুরুতে ৩৫-৪০ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে ব্যবসা আরম্ভ করতে পারেন। ভালাে বরাত পেলে বিনিয়ােগ বাড়াবেন। ট্রেডিং ব্যবসায় ১৫%-২০% লাভ রাখা যায়। 

মোমবাতির উৎপাদনমূলক ব্যবসা কি ?  

মােমবাতি তৈরির কারখানা করতে চাইলে প্রথমে পঞ্চায়েত , মিউনিসিপ্যালিটি বা পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট জেলাশিল্প কেন্দ্রে গিয়ে ক্ষুদ্রশিল্পের জন্য নাম নথিভুক্ত করতে হবে। রাজ্য দূষণ পর্ষদ মােমবাতি তৈরিকে দূষণের বাইরে রেখেছেন। এরপর বৃত্তিকরের জন্য দরখাস্ত করতে হবে। বৃত্তিকর দপ্তর এই শংসাপত্র দেয়। বিক্রয়কর দপ্তর থেকে মূল্যযুক্ত কর নং (VAT No.) নিতে হবে। জাতীয় ক্ষুদ্র শিল্প নিগম থেকে রেজিস্ট্রেশন নিলে কোনাে সরকারি অফিসে বা, আধা সরকারি অফিসে সিকিউরিটি জমা দিতে হবে না। 

বিভিন্ন ধরনের মােমবাতি : 





বিভিন্ন ধরনের মােমবাতি হয়। যেমন জল মােমবাতি, লম্বা চতুষ্কোণ মােমবাতি, নারকোল মালার মােমবাতি,পাস্টিকের পাত্রে মােমবাতি, বালি মােমবাতি, বনজ মােমবাতি, ধাপ মােমবাতি, ফুল মােমবাতি (ভাসমান), ঝাউগাছ মােমবাতি, লম্বা ত্রিকোণ মােমবাতি, ছক্কা মােমবাতি, হৃদয় মােমবাতি ও সাধারণ মােমবাতি। এছাড়াও আছে বাহারি মােমবাতি। ঘরের অন্ধকার দূর করা ছাড়াও ফ্যান্সি বা, ডেকরেটেড বা, বাহারি মােমবাতি আনন্দউৎসবে উপহার কিংবা ঘরের অন্দরমহল সাজাতে শো পিস হিসাবে ব্যবহার হয়। এই ধরনের মােমবাতির আলাে স্নিগ্ধ, নরম ও দূষণমুক্ত। সুগন্ধী জেল মােমবাতি ফ্রিজে রাখলে দুর্গন্ধ চলে যায়। বাহারি মােমবাতি বিভিন্ন আকৃতি ও রং এর হয়। যেমন, বিয়ার রিং, সিলিন্ডার, পেগ গ্লাস, বাটি, প্রদীপ, ভেজিটেবল, হ্যান্ডকেপ, হার্ড জেল ইত্যাদি ১০০-২০০ ধরনের শিল্প নৈপুণ্য মােমবাতিতে ফুটিয়ে তােলা যায়। বাজারে বেশি চাহিদা বিয়ার পেগ, রিং, ল্যান্ডস্ক্যাপ, আইসক্রিম ও ‘হার্ট’ মােমবাতি।

সাধারণ মােমবাতিঃ

 দৈনন্দিন জীবনে যে মােমবাতি ব্যবহার করি সেটাই সাধারণ মােমবাতি। অন্ধকার দূর করতে কালীপুজো বা,দীপাবলীতে বাড়ি সাজাতে বিভিন্ন মাপের লম্বা মােমবাতি ব্যবহৃত হয় । 

সাধারণ মােমবাতি বানানোর প্রয়ােজনীয় সরঞ্জাম কি কি ? 

 ছাঁচ বা, মেশিন, পলতে, বড় কড়াই, ছান্তা,উনােন, ১০ নং বালতি, কঁচি, মগ, মােবিল, তেলের জন্য প্লেট,  ​একটি জুতাের ব্রাশ (৪'' x ৬''), ১টি শক্ত লােহার পাত, প্যাকিং পেপার, লেবেল ও আঠা,দাঁড়িপাল্লা বা, ওজনের যন্ত্র, প্যারাফিন ওয়াক্স, স্টিয়ারিক টাকা অ্যাসিড, মৌমােম, রং ও সুগন্ধী (দরকার হলে)। 

মােমবাতি বানানোর প্রয়ােজনীয় সরঞ্জাম কোথায় কি পাবেন ? 

ছাঁচ তৈরি হয় লােহা বা, অ্যালুমিনিয়ামের। তৈরি ছাঁচ বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। তাছাড়া নিজেও ছাঁচ তৈরি করতে পারেন। উঁচ বা, ডাইস ৩ ধরনের : সরু, মাঝারি ও বড় সাইজের। ডাইস কিনতে পাওয়া যায় কলকাতার আর. এন. মুখার্জী রোড, হাওড়ার বেলেলিয়াস রােড রঙ ও বেলেঘাটার সরকার বাজার, মধ্য কলকাতার মেছুয়া পট্টিতে। কর্মকাররা মােমবাতির জন্য মার্বেল বিশেষ এক ধরনের কঁচি ও ছুরি, ইত্যাদি তৈরি করে। এছাড়া ওপরের অন্যান্য উপাদানগুলি পাবেন বড়বাজার ও চিনা মার্কেটে।। 



মােমবাতি তৈরির পদ্ধতি : 

উনােনে কড়াই বসিয়ে দিয়ে প্যারাফিনের টুকরােগুলি দিয়ে দিতে হবে। প্যারাফিন গরম কড়াইতে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গলতে শুরু করবে। প্যারাফিন গলতে শুরু, করার পর প্যারাফিনের ১০% স্টিয়ারিক অ্যাসিড আর ৫% মৌমােম দিতে হবে। সবগুলি একসঙ্গে গলতে থাকবে। ছাঁচের পর জুতাের ব্রাশ দিয়ে তেল দু’পাশে ঠান্ডা জল ভরে নেওয়ার লাগিয়ে নিতে হবে। তারপর ওপর নিচ করে পলতে লাগাতে হবে ও দুটো পাল্লা এক করে চাবি  বন্ধ করে দিতে হবে। কড়াইতে প্যারাফিন ও সহযােগীরা সম্পূর্ণ গলে গেলে ছাস্তা দিয়ে অবাঞ্ছিত পদার্থগুলি হেঁকে নিতে হবে। অনেক সময় প্যারাফিনের সঙ্গে চটের বস্তার আশ বা, কাগজের টুকরাে কড়াইয়ের মধ্যে চলে যায়। তাই এই সতর্কতা। এবার তরল প্যারাফিনের দ্রবণ ধীরে ধীরে ছাঁচে ঢালতে হবে। ছাঁচ ভর্তি করে দিতে হবে। ৫ মিনিট অপেক্ষা করার পর আবার ঢালতে হবে। কারণ, শক্ত হয়ে জমে যাওয়ার পর মােমবাতির ওপরের লাভ অংশ ফাপা থেকে যায়। তাই দ্বিতীয়বার ঢালতে হয়। ১০ মিনিট অপেক্ষা করলে পুরাে শক্ত হয়ে যাবে। তখন ওপরের পলতে কাচি দিয়ে কেটে মােমবাতির তলা ছুরি দিয়ে হেঁটে সমান করে দিতে হবে। এবার পাল্লা দুটো আলাদা করে দিলে মােমবাতিগুলি বের করতে অসুবিধা হবে না। এরপর মোমবাতির পলতে আধ ইঞ্চি রেখে কেটে দিয়ে গায়ের লেগে থাকা থাকা টুকরাে মােমগুলি পরিষ্কার করে দিতে হবে। এবার মােমবাতিগুলি কাগজে মুড়ে লেবেল লাগিয়ে দিন। বাক্সে ভরে দিলে মােমবাতি বাজারে বিক্রির উপযােগী হবে। 

মােমবাতি তৈরির ব্যবসায় বিনিয়ােগ কেমন  ও লাভ কেমন ? 

একটি মােমবাতি তৈরির কারখানা  বিনিয়ােগ করতে হবে অন্তত ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। পণ্য বিপণনে লাভ থাকে ১৫% = ২০% |



ফ্যান্সি মােমবাতি কি ? 

সাধারণ ফ্যান্সি বা, বাহারি মােমবাতি তৈরি ও সরল পদ্ধতিতে ঘরে বসে মােমবাতি করা যায়। এগুলিকে জেল মােমবাতি বলে । এই মোমবাতি তৈরি করতে লাগে জেল ওয়াক্স, পলতে স্টান্ড (পলতে ধরার জন্য), প্যারাফিন, রঙ (ওয়েল সলিউবল), সুগন্ধী। (গােলাপ, জুই, চন্দন), সাজানাের জিনিস (পুঁতি, রাংতা, কাচের মার্বেল, কাপড়, সুতাে, গহনা গিয়ে ইত্যাদি) দু'ধরনের হয়। বিদেশি ও চায়না। বিদেশি প্যারাফিন দিয়ে উন্নত মাপের মােমবাতি হয়। যাবতীয় উপাদান কিনতে পাওয়া যায় বড়বাজারে। 


ফ্যান্সি মােমবাতি বানানোর সরঞ্জাম : 

সরঞ্জামের মধ্যে লাগে মােম গলানাের জন্য পাত্র, গ্যাস থাকলে ওভেন ও বিভিন্ন আকৃতির সুদৃশ্য কাচের পাত্র। 

ফ্যান্সি মােমবাতি বানানোর পদ্ধতি : 

রােজিন ও মিনারেল অয়েলের সংমিশ্রণে তৈরি হয় মােমবাতি তৈরি করতে চান সেই জেল, মােমবাতি। যে ধরনের অনুযায়ী কাচের পাত্রে পছ সই ওভনে জেল ওয়াক্স গলাতে পেইন্টিং করে নিতে হবে। এবার ওভনে জেল ওয়াক্স গলাতে হবে। গলানাের সময় নির্দিষ্ট | অনুপাতে রং মিশিয়ে তারপর | নির্দিষ্ট কাচের পাত্রে ঢালুন। এরপর পলতে পরিয়ে ২০-২৫ মিনিট রেখে দিন। ব্যাস জেল মােমবাতি তৈরি। এবার আকর্ষণীয় প্যাকেজিং করে নিন। সাধারণ মােমবাতির সঙ্গে বাহারি মােমবাতির তফাৎ একটাই, এই ধরনের মােমবাতি তৈরির জন্য ছাঁচের দরকার হয় না। নির্দিষ্ট জায়গা বা, ঘর লাগে না। 

ফ্যান্সি মােমবাতি ব্যাবসায় বিনিয়ােগ কত ? লাভ কেমন ? 

২৫-৩০ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করতে পারেন। বিক্রি করে আইটেম পিছু ৫%-১০% পর্যন্ত লাভ রাখা যায়।


মােমবাতি ব্যাবসায় কীভাবে বিপণন শুরু করবেন ? 

শুরুতে সেনা পরিচিত বন্ধু, আত্মীয়দের মধ্যে বিক্রি করুন। তারপর দোকানে ১২ দোকানে যােগাযােগ করুন। ব্যাঙ্ক বিপণনের জন্য জেলাভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় গিফট শপ, পিরাণি মলগুলিতে ফ্যান্সি মােমবাতি বিক্রি করতে পারেন।

মোমবাতি তৈরির ব্যবসা কিভাবে শুরু করবেন ? কিভাবে বড় করবেন ? জেনে নিন খুঁটিনাটি মোমবাতি তৈরির ব্যবসা কিভাবে শুরু করবেন ? কিভাবে বড় করবেন ? জেনে নিন খুঁটিনাটি Reviewed by WisdomApps on নভেম্বর ২৪, ২০২১ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.