গাউট অর্থাৎ বাত কী?
ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ শরীরে বেড়ে গেলে তা শরীরের নানা জায়গায় গিয়ে জমা হয়। সব থেকে বেশি জমা হয় শরীরের জয়েন্টে। তখন জয়েন্টগুলোতেও এক ধরনের ইনফ্লামেশন হয় বা ফুলে যায়। এটা সব থেকে বেশি হয় আমাদের পায়ের বুড়ো আঙুলে। এছাড়া হাঁটু, গোড়ালি বা শরীরের অন্য নানা জয়েন্টেও হতে পারে। খুব বেশি জমা হলে ওইখানে ব্যাথা হয়, লাল হয়ে যায় এবং ফুলে যায়। একে বলে অ্যাকিউট গাউটি আর্থ্রাইটিস।
ইউরিক অ্যাসিড বাড়ে কেন?
ইউরিক অ্যাসিড আমাদের সবার শরীরেই থাকে। এর দুই তৃতীয়াংশ তৈরি হয় শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়। আর এক তৃতীয়াংশের উৎস হল খাদ্য। আমরা যে ধরনের খাবার খাই তার থেকেও শরীরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড ঢুকতে পারে। যেমন বেশি হচ্ছে বিয়ার, অ্যালকোহল থেকে প্রচুর ইউরিক অ্যাসিড তৈরি হয় শরীরে। আবার যে কোনও ধরনের মাংস, বিশেষ করে অর্গান মিট বা শরীরের যন্ত্রাংশের মাংশ যেমন মেটে, সি-ফুড, শেল-ফিশ যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, নান ধরনের বিনস থেকেও শরীরে তৈরি হয় ইউরিক অ্যাসিড। আরেকটা কারণ হল শরীরের ভিতরেই অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড তৈরি হওয়া। লিউকোমিয়াজাতীয় ক্যানসারের মতো কিছু রোগে এই রকম হতে পারে। দেখুন, আমাদের শরীর থেকে ইউরিক অ্যাসিড প্রস্রাবের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যায়। এখন কিডনিতে কোনও সমস্যা হলে আমাদের শরীর থেকে অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ব্যহত হতে পারে। অনেক সময় উপোস করা কিমবা খুব তাড়াতাড়ি ওজন কমালেও ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যায়। এছাড়াও একটা বিরল সম্ভাবনা হল, বংশানুক্রমিকভাবে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়া। এটাকে বলা হয় লেশ-নিহ্যান সিনড্রোম। অনেক সময় কিছু কিছু ওষুধের জন্যও ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যেতে পারে।
গাউট কি বাত?
সাধারণ বাত বলতে বোঝা হয় আর্থারাইটিস। এর মধ্যে সব থেকে বেশি হয় অস্কিওআর্থ্রাইটিস। এটা সাধারণত শরীরের ওজন বহনকারী জয়েন্টগুলোতে হয় যেমন হাঁটু গোড়ালি এইসব জায়গায়।কারও কারও ক্ষেত্রে কনুই, কাঁধ এবং কমরেও হতে পারে। এর বাইরেও ছোটবেলায় কোনও জয়েন্টে আঘাত লেগেছে, সেটা থেকেও বাত হতে পারে। এটা এক ধরনের অষ্টিওআর্থ্রাইটিস। কিন্তু এটাকে বলা হয় পোস্ট ট্রমাটিক আর্থ্রাইটিস। এইগুলো হল নানা ধরনের বাত। এছাড়াও এক ধরনের বংশানুক্রমিক অর্থোপ্যাথি আছে। এই ধরনের বাত শরীরের নানা জয়েন্টে অ্যাটাক করতে পারে যেমন হাতে, মেরুদণ্ডে। এইগুলোর মধ্যে সব থেকে কমন হল রিউম্যাটইয়েড আর্থ্রাইটিস, অ্যাঙ্কোলাইজিং স্পন্ডিলাইটিস এর বাইরেও একরকম আর্থ্রাইটিস আছে যাকে আমরা বলি ক্রিস্টাল আর্থোপ্যাথি। ইউরিক অ্যাসিড থেকে গাউট হওয়াটা এই ধরনের। এই রোগে ইউরিক অ্যাসিডের ক্রিস্টাল জয়েন্টে গিয়ে জমা হয়। এই ধরনের আর্থ্রাইটিস ইউরিক অ্যাসিডের জন্য হতে পারে। সেই অর্থে গাউটটা হল ক্রিস্টাল অর্থোপ্যাথির একটা দিক।
গাউট-এর চিকিৎসা কীভাবে হয়?
গাউট হলে প্রথমেই দেখতে হবে ইউরিক অ্যাসিড শরীরে বাড়ছে কেন। যদি ক্যানসার বা এই জাতীয় কারণে হয় তবে তাঁর চিকিৎসা করতে হবে। যদি শরীর থেকে ইউরিক অ্যাসিড বার করতে কিডনির সমস্যা হয় তাহলে কিডনির চিকিৎসা করাতে হবে। যদি কোনও ওষুধ থেকে হয়, তাহলে সেই ওষুধগুলোকে বদলে দেওয়া বা বন্ধ করতে হবে। যদি খাবার থেকে হয়, তাহলে অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড আছে এমন খাবার খাওয়া বন্ধ করা। এর সঙ্গে সবথেকে উপকারী হল জীবনযাত্রার পরিবর্তন জরুরি।
কী ধরনের জটিলতা হতে পারে?
নানা জয়েন্টে গাউট হলে হাঁটাচলার কাজকর্মে অসুবিধা হতে পারে। সফট টিস্যুতে ইউরিক অ্যাসিড জমলে সেইখানেও ব্যাথা হয়।
গাউটের চিকিৎসার কেমন সময় লাগে?
যাদের একবার গাউট হয়েছে, তাঁদের বারবার গাউট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যখন খুব জটিল সমস্যা হয় তখন পা-টাকে উঠিয়ে রাখতে হবে। বরফ দিতে হয়। ব্যাথার ওষুধ খেতে বলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধে ব্যাথা কমে না। তখন স্টেরয়েড দিতে হতে পারে। যখন এই অ্যাকিউট অ্যাটাকটা কমে যায়, তখন দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা শুরু করতে হয়।
বাত সারাতে অপারেশন
বিরাশি বছর বয়সি বিমানবাবুর কথা দিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক। অনেকদিন ধরে তিনি হাঁটুর সমস্যায় ভুগছেন। তার ওপর আবার কার্ডিয়াক, নিউরোলজিক্যাল সমস্যাও রয়েছে তাঁর। খুব পজিটিভ মানুষ হলেও হাঁটুর অপারেশন করাতে ভয় পাচ্ছেন। কীসের ভয়? উত্তরে তিনি বললেন,'দেখলেন না প্রাক্তন এক প্রধানমন্ত্রীর এই অপারেশন করে কী হয়েছিল? তিনি নাকি লন্ডনে গিয়ে অপারেশন করেছিলেন। তাতেও দেখুন..." ভদ্রলোককে বুঝিয়ে বললাম, 'আপনি কিছুই খবর রাখেন না। তাই এরকম নেগেটিভ কথা বলছেন। আসলে আমাদের দেশের বহু মানুষেরই এটা ধারণা যে বিদেশে গিয়ে অপারেশন করিয়েও আমাদের দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নি-রিপ্লেসমেন্ট সাকসেসফুল হয়নি। প্রথমত, বিদেশে গিয়ে তিনি অপারেশন করাননি। তখনকার বম্বে আর আজকের মুম্বাইয়ের চিকিৎসক সি.এস. রানাওয়াতের নেতৃত্বে ডাক্তারদের এক বিশেষ মেডিক্যাল টিম ওই অপারেশন করেছিলেন। আর যারা বলেন যে ওঁর অপারেশন সাকসেসফুল হয়নি তাঁরা কি করে জানলেন সেটা। ওই যে ভুত দেখা মানুষকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি যেমন বলেন, ওই অমুকে দেখেছেন। ব্যাপারটা এমনই।
আসলে বাস্তবতা অন্য। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নি রিপ্লেসমেন্ট শুধু সাকসেসফুল হয়েছিল তাই-ই নয়, তিনি যথেষ্ঠ সুস্থ হয়েওছিলেন। তাহলে এমন গুজব কেন? অপারেশনের পর তো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ওবামা সাহেবের মতো গটগট হরে হাঁটছেন না। এবার এই বিষয়েই একটু বিস্তারিত আলোকপাত করা যাক।
এক্সারসাইজ প্রয়োজন
একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, কঙ্কাল কিন্তু হাঁটতে পারে না।
হাঁটার জন্য যে শক্তি দরকার তা আসে মাংসপেশি থেকে। অর্থাৎ যতক্ষন না পর্যন্ত মাসল পাওয়ার সঠিকভাবে ব্যালান্সড হবে ততক্ষণ পর্যন্ত হাঁটু বা হিপের এক্স-রে যতই সুন্দর হোক না কেন সঠিকভাবে এবং সাবলীলভাবে হাঁটার ক্ষমতা অপূর্ণ থেকে যাবে। নি-রিপ্লেসমেন্ট করার আগে রোগীকে বেশ কিছু এক্সারসাইজ দেওয়া হয়। সেই এক্সারসাইজ প্রতিদিন নিয়ম মেনে করতেই হবে। যতই কষ্ট হোক না কেন এই এক্সারসাইজ করতে হবে। আবার অপারেশনের পরেও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে কিছু ব্যায়াম করতে হয়। আমার বিশ্বাস, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে যতটা এক্সারসাইজ প্রোগ্রাম করানো দরকার ছিল ততটা বাস্তবে রুপায়িত করা সম্ভব হয়নি। যাই হোক, আমার ধারণা সঠিক নাও হতে পারে।
নি-রিপ্লেসমেন্ট আসলে কী?
প্রথমেই কোর ম্যাটারে আসা যাক। 'হাঁটু পালটানো'-র অপারেশনকে সাধারণত টোটাল নি-রিপ্লেসমেন্ট বলা হয়। সত্যিটা হল, টোটাল নি-রিপ্লেসমেন্ট করা যায় না। তাহলে রোগী আর হাঁটতে পারবেন না। কারণ হাঁটু মানে কিন্তু দুটো বোনের মাথা আর সামনে একটা মালাইচাকি নয়। অর্থাৎ যেটুকু কঙ্কালের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। হাঁটুকে পূর্ণ রুপ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সফট টিস্যু থাকে। যেমন-সাইনুভিয়াল ক্যাপসুল, লিগামেন্টস, টেনডনস। ফ্যাট আর চামড়া তো বাদই দিলাম। আসলে অপারেশনের মাধ্যমে ব্যালেন্সিং করা পুরো বিষয়টা।
