কম খরচে ঘুরে আসতে পারবেন নদী সমুদ্রে ঘেরা এমন ৬ টি জায়গা

নদী সমুদ্রে ঘেরা পশ্চিমবঙ্গের ৬ টি ঘোরার জায়গার হালহদিস । কি দেখবেন , কীভাবে যাবেন , কোথায় থাকবেন আসুন জেনে নি  - '


সবুজ দ্বীপ

হুগলী ও বেহুলা নদীর সঙ্গমের চরায় সবুজের ছড়াছড়ি। দ্বীপের মাঝ বরাবর পথের দুপাশে নারকেল গাছের সারি।  ঝাউ, মেহগনি, আকাশমনি, সুপুরি, পাম ইত্যাদি গাছের আধিক্য এই দ্বীপকে আরো সবুজ করে তুলেছে। তাই এই  দ্বীপের নাম- সবুজ দ্বীপ। এই দ্বীপে ১৯৯৩ সালে একটি  
পিকনিক স্পট গড়ে উঠেছে এই দ্বীপে। চারিদিকে জলের  মাঝে জমে ওঠে চড়ুইভাতির আড্ডা। গাছগাছালির ফাঁক-ফোকরে ছাতারে পাখির দল একনাগাড়ে ঝগড়া করে।  পানকৌড়ি নদীর জলে ডুব সাঁতার দেয়। হাজারো পাখির কলকাকলিতে ভরে থাকে সবুজ দ্বীপের আকাশ-বাতাস।  
ভিউ-টাওয়ার থেকে বিহঙ্গদৃষ্টিতে চারপাশটা মন্দ লাগে মা। বাচ্চাদের জন্যও রয়েছে চিলড্রেন্স পার্ক। শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে ঘুরে আসা যেতেই পারে সবুজ দ্বীপে। এখানকার চারিপাশে দেখার জায়গার অভাব নেই।বলাগড় থানার অন্তর্গত গুপ্তিপাড়ায় রথ এবং তার দক্ষিনে  সোমড়ায় সিংহবাহিনী জগদ্ধাত্রী মন্দির (১৭৫৫) দ্রষ্টব্য। পিরামিড আকৃতির পঞ্চরত্ন মন্দির, শ্রীশ্রী মহীবিদ্যা, গড়বেষ্টিত সুখরিয়ার প্রাসাদোপম ভবনটি আজ ধ্বংসস্তূপে পর্যবসিত। টেরাকোটা সমৃদ্ধ বারোচালা ২৫ চুড়োর আনন্দময়ীর মন্দির বেশ ভালো। কাছাকাছি দ্বাদশ  শিব মন্দির, হরসুন্দরী ও নবরত্ন নিস্তারিনী কালীর মন্দির। শ্রীপুরের মিত্র মুস্তাফিদের বাড়িতে আছে আটচালার দুর্গামন্ডপ। চারচালার রাধাওগোবন্দ জীউর মন্দির,দোচালার চন্ডীমন্ডপ ও জোড়া শিবের পঞ্চরত্ন মন্দির। যাওয়াঃ- বলাগড় থানার অন্তর্গত সোমরাবাজারের অদূরে সুখরিয়া গ্রাম সবুজ দ্বীপের ফেরিঘাট। সেখান থেকে লঞ্চ বা ভুটভুটিতে নদী পেরিয়ে সবুজ দ্বীপের আঙ্গিনায়।


ডায়মন্ড হারবার

ডায়মন্ডহারবার থেকেই মূলত গঙ্গার মোহনা শুরু। নদী এখান থেকে চওড়া হতে শুরু করে সঙ্গমের জন্য সাগরে। ডায়মন্ডহারবার রেলস্টেশনের প্রাচীন নাম ছিল হাজিপুর। অতীতের হাজিপুরই আজকের হীরকবন্দর অর্থ্যাৎ ডায়মন্ডহারবার (হার্বার)। হার্বার শব্দের মাণে বন্দর। পোর্তুগীজ হার্মাদ দস্যুদের তাড়িয়ে ব্রিটিশ দখল নেয় অতীত হাজিপুরের। তারা গড়ে তোলে কেল্লা। সে কেল্লা আজ গঙ্গার গ্রাস। পোর্তুগীজ দুর্গও ধ্বংস। বর্তমান যুগের বাতি-ঘরটি আছে দিকভ্রষ্ট জলযানের সঙ্কেত-এর জন্য। তবে দিনে রাতে জ্বলে না তাতে আলো।
বনভোজন মোদীদের প্রচুর সমাগম ঘটে প্রশস্থ নদীতীরের খোলা প্রান্তরে। শীতের আমেজে বড় দিন, ইংরেজী নববর্ষ, নেতাজীর জন্মদিন ও প্রজাতন্ত্র দিবস ও শীতের মরশুমে রবিবারগুলিতে মানুষের ঢল নামে। ট্রেনে-বাসে বহু মানুষের ভীড়। এওলাকা নেয় উৎসবের চেহারা।
গঙ্গার ইলিশ মাছ প্রসিদ্ধ এখানকার মাছ বাজারে। তাই রয়েছে বরফ কল। সড়ক ও রেলে নানা স্থানের যোগাযোগ। নদীতীরের আসনে বিকালে ভ্রমণকারীদের ভীড় উপছে পড়ে। বসার জায়গা মেলা দায়। তবে প্রেমিক-প্রেমিকাদের থেকে স্থানীয় চ্যাঙড়াদের চাঁদা আদায়ের জন্য এলাকা এক সময়ে কলঙ্কিত হয়। বদনাম হয় খানেক। প্রশাসনিক তৎপরতায় এখন অনেকটা সংযত।
যাওয়াঃ- শিয়ালদহ থেকে ই.এম.ইউ ট্রেনে ৬০ কিমি. রেলদূরত্বে এবং শহীদ মিনার থেকে মাত্র ৪৮ কিমি. সড়ক দূরত্বে ডায়মন্ড হারবার শহর। বাস ঘন ঘন, ট্রেন ঘন্টায় ঘন্টায়।

মাছরাঙা দ্বীপ

ইছামতী ও বেতনী নদী এবং তার মাঝে এক চিলতে চর। সযত্নে লালিত বনসৃজনের ফঙ্গে এখন বেশ পরিপাটি। মন জুরানো বাতাস। পঙচায়েত সমিতি শীতের শুরুতেই গড়ে তোলে নানা পিকনিক স্পট। জায়গাটি উওর ২৪ পরগনায়, হাসনাবাদে। এই দ্বীপের নাম মাছরাঙা দ্বীপ। যাওয়াঃ- শিয়ালদহ মেন ও নর্থ স্টেশন থেকে দু’আড়াই ঘন্টা অন্তর হাসনাবাদ লোকাল ট্রেন। দূরত্ব রেলে ৭৫ কিমি.। এছাড়া কলকাতার ধর্মতলা থেকে হাসনাবাদ্গামী বাস রয়েছে। শিয়ালদহ থেকে বনগাঁ শাখায় ২৩ কিমি. দূরে বারাসাত জংশনে নামলে, ওখান থেকেও বেশ কিছু লোকাল ট্রেন যায় হাসনাবাদ। শিয়ালদহের ট্রেন এই বারাসাত ছুঁয়েই চলে। কলকাতা থেকে গারি নিয়ে গেলে চলে আসুন সরাসরি ইছামতির ঘাট। ট্রেনের যাত্রীরা রিকশ বা ভ্যানে আসুন ঘাটে।

মুকুটমনিপুর

কুমারী নদী ও কংসাবতীর সঙ্গম মুকুটমনিপুর যেন প্রকৃত অর্থে নামান্তর। অনুচ্চ পাহাড়ি টিলা যেন সবুজ অরণ্যাণীর ঢেউ। তার একপাশে জলাধারে চন্দ্রশোভিত রজনীতে লক্ষ জোনাক জ্বলা অনুভূতি। নানা পাখ-পাখালি যেমন আছে, তেমনি রঙীন পোষাকের পর্যটকদের আনন্দস্ফূর্তি এখানে তুঙ্গে। ব্যারেজে জলের তোড়ের কলোচ্ছ্বাসের মতো-ই তারা উচ্ছ্বাসিত। এখানে যে না গিয়েছে তাকে বোঝানো সম্ভব নয় কতোটা সুন্দর মুকুটমণিপুর। বনভোজনের একেবারে যেমনি আদর্শ স্থান, তেমনি সপ্তাহান্তিক সফরের জায়গা হিসেবেই তুলনাহীন এখানকার প্রকৃতি।
বনপুকুরিয়া মৃগদাব সবুজ দ্বীপের মতো। নানা গাছে গাছে পূর্ন। বোটে যাতায়াত। শিবালয় ও পরেশনাথ মন্দির ছোট ছোট। শহীদ স্মারক স্তম্ভ। পায়ে পায়ে বা জলবিহারে ও আহারে কাটানোর জায়গা। অদূর ভবিষ্যতে রেল চলে আসবে মুকুটমণিপুরে।
যাওয়াঃ- বাঁকুড়া রেলস্টেশন থেকে গোবিন্দপুর বাসস্ট্যান্ড যেতে গোবিন্দপুর বাসস্ট্যান্ড যেতে বাস ধরুন। এটাই শহর বাসস্ট্যান্ড। ওখান থেকে মুকুটমনিপুরের বাস মেলে। দুর্গাপুরে নেমে বাস ধরলেও সরাসরি মুকুটমনপুর বা বাঁকুড়া থেকে ভাঙা সফরে মুকুটমনিপুর আসা যায়। দুই রেলস্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি গাড়ি নিয়েও আসা যায়। কলকাতার শহীদ মিনার বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস চলে এ পথে। কলকাতা- মুকুটমনিপুর দূরত্ব ২৪৪ কিমি.। দিন ও রাতে বাস চলে CSTC এবং  WBSTC -এর। বাঁকুড়া শহরের আদি বাসস্ট্যান্ড মাচানতলা থেকেও বাস যায়। ৫৬ কিমি. দূরে যেতে সময় লাগে ঘন্টা দেড়/ দুই। খাতরা হয়ে পথ।

বড়ন্তি

“ এক যে আছে গ্রাম / বড়ন্তি তার নাম / তখন রূপটি খোলে তার।”
কোথায় সে গ্রাম? আছে আছে। পুরুলিয়ার সঙ্গে বর্ধমানের যেখানে মেলামেশি, আমাদেরই রাঢ়বঙ্গে। বড়ন্তি অবশ্য পুরুলিয়াতেই। কচরমচর শব্দ তুলে যেথায় বাঁধের পথে চলে মহিষের গাড়ি।
এখানে রয়েছে আদিবাসী গ্রাম, জমিজিরেত খেতি, ছোটোখাট টিলা, গবাদি পশুদের বিচরন আর রয়েছে জলাশয়। জলাশয়টি রামচন্দ্রপুর ঝিল বা মুরাডি ড্যাম নামেও পরিচিত। নানা পাখি আসে পরিযায়ী হিসেবে শীতের দিনে। শান্ত-নির্জন-নির্বিরোধ গ্রামে দু একটি রাত্রি অবসর যাপনের আদর্শ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। মানুষ খোঁজ করে আসে-ফিরে যায় শান্তি নিয়ে।
এছাড়াও হাতে কিছুটা সময় থাকলে ঘুড়ে আসা যেতে পারে মাইথন, পাঞ্চেত বা গড় পঞ্চকোট। কিছুটা দূরেই রয়েছে চন্ডী মন্দির মাথায় নিয়ে জয়চন্ডীপাহাড়, তসর শিল্পস্থান রঘুনাথপুর, বিহারীনাথ মাত্র ১৫ কিমি. শুশুনিয়া ৩০ কিমি.।
যাওয়াঃ- নিকটবর্তী স্টেশন হলো মুরাডি ও মধুকুন্ডা। আসানসোল-আদরা শাখায়। তাই গাড়ি নেওয়া যেতে পারে আসানসোল বা আদরা থেকে। ঘন্টা খানেকের কম-বেশি পথ উভয়স্থান থেকে। মধুকুন্ডা ও মুরান্ডি থেকে রিকশ মেলে ৬০ টাকা ভাড়ায়। পথ ৬/৭ কিমি. হবে। ভালো নয় তেমন। ইদানিং দু’একটা অটো হয়েছে। আসা যায় কুলটি ও বরাকর থেকে। বরাকরে গাড়ি অটো মিলবে। কুলটিতে ফোন করতে হয় সঞ্জয় সিংহকে। ফোন নংঃ ৯১২৬৯৩৩৩৬৩। কুলটি-বড়ন্তি সড়ক দূরত্ব ৩২ কিমি. মাত্র। ৫০০-৬০০ টাকা কেবল ড্রপিং।

দীঘা

যেখানে অসীম নীলাকাশ আর সীমাহীন জলধী, সে জায়গাই তো পশ্চিমবঙ্গের সেরা সাগরতট দীঘা। সামুদ্রিক ঝড়ের প্রকোপে মাঝে মাঝে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মায়াবী দীঘা উত্তাল, গমগমে সৈকত উপছানো ঝাউবন। বছরের প্রতিটা সময়ই সমুদ্রের ঘোলা জলের ঢেউ-এর মত মানুষের ঢেউ উপচে পড়ে এখানকার সৈকতে।
রোদ-বৃষ্টি-মেঘ-ঝোড়ো বাতাস দীঘায় ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আসে। সূর্যোদয় প্রত্যক্ষকরন, সাগর স্নান বা ঢেউ গোনা অলস জীবন কাটানোর সেরা অবলম্বন দীঘা। আড্ডা দিতে দিতে অস্থায়ী খুদে খুদে দোকানগুলির মুখচার লোভনীয় মাছের নানা পদের স্বাদ নেওয়া যেতে পারে। সামুদ্রিক ঝিনুক, শঙ্খ জাতীয় নানা দোকান-পাট, খেলনা ও তৈজস পত্রাদি, অলংকারের বা উপহারের দোকান-পাট প্রচুর।
ওয়ারেন হেস্টিংস সাহেব দীঘার আবিষ্কারক এবং বিধান রায় দীঘার রূপকার। পূর্নিমা ও অমাবস্যার সময় ভয়াবহ রূপ নেয় দীঘার সমুদ্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকে দীঘা চলে যাবে সমুদ্রের গ্রাসে। DDA অর্থাৎ দীঘা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি এখানকার সৈকত বাঁচাতে পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে।
দীঘার স্থানীয় রিকশ, ভ্যান, গাড়ি নিয়ে ঘুরে নেওয়া যেতে পারে স্নেক পার্ক, অমরাবতী পার্ক, মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম ও সায়েন্স সেন্টার। স্নেকপার্ক-এর অপর নাম Wonder Land। টয়ট্রেন আছে। হাতে সময় থাকলে বাসে চড়ে একদিন এ রাজ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে পায়ে পায়ে প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার স্পর্শ নেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও ঘুরে আসা যেতে পারে চন্দনেশ্বর শিবালয় ও ওড়িশার সৈকত তালসারিতে। তালসারির মাঝামাঝি ওড়িশার নিরালা সৈকত হল উদয়পুর-দত্তপুর। থাকার জায়গা নেই সেখানে। দু’এক ঘন্টা দেখে চলে আসতে হয়। বাংলো আছে ওড়িশা সরকারের। কিছুক্ষনের জন্য লালা কাঁকড়া দেখা পারে। অনুমতি সাপেক্ষে তাঁবু বাসের সুবিধা রয়েছে।
যাওয়াঃ- কলকাতা থেকে সড়ক পথে দীঘা মাত্র ১৮৩ কিমি.। কলকাতার নানা স্থান ও হাওড়া/ শালিমার থেকে ট্রেন আসতোই; এখন উওরবঙ্গ থেকেও দীঘার ট্রেন চলছে। দীঘা থেকে ওড়িশার পূরী পর্যন্ত রেল লাইনের পরিকল্পনা আছে। তখন দেশে নানা প্রান্তের সঙ্গে সরাসরি রেলপথে যুক্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে দীঘার। এখন চাঁদিপুরের সঙ্গে সড়কপথে বাস চলে নিয়মিত। শালিমার থেকে ছাড়া ট্রেন ধরতে সাঁতরাগাছি আসার জন্য, হাওড়ার সংযোগ মেলে, লোকাল ট্রেনে যাতায়াতের পথে (১৫/২০ মি. এর ব্যাপারে)। সাঁতরাগাছি যাতায়াতে ট্যাক্সিও ধরা যায়। ইদানিং হাওড়া থেকে ছাড়ছে দীঘার ট্রেন। শালিমার ও হাওড়ার পথ সাঁতরাগাছিতে সংযুক্ত তথা বিভাজিত অর্থ্যাৎ জংশন।
কলকাতার বেশিরভাগ বাস ছাড়ে ধর্মতলা থেকে। এছাড়া শহীদ মিন্স্র, উল্টোডাঙ্গা, গড়িয়া, ডানলপ, দমদমসহ নানা স্থানের বাস। হাওড়া স্টেশনের পাশ থেকে দীঘাগামী বাস পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগম তাদের ট্যুরিস্ট বাস চালায় বিবাদী বাগ কার্যালয়ের সামনে থেকে। সময় নেয় ৫ ঘন্টা। মেচেদা রেলস্টেশন ও খড়গপুর রেলস্টেশন গিয়ে ভাঙ্গা সফরেও দীঘার বাস ধরা যায়, যাদের যেমন সুবিধা।


লেখাটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন - 
কম খরচে ঘুরে আসতে পারবেন নদী সমুদ্রে ঘেরা এমন ৬ টি জায়গা কম খরচে ঘুরে আসতে পারবেন  নদী সমুদ্রে ঘেরা এমন ৬ টি জায়গা Reviewed by Kona Dey Chakraborty on September 07, 2018 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.