বাঘেদের বাড়ি সুন্দরবন - ভ্রমণ গাইড

সুন্দরবন




দেশের একমাত্র বাদাবন ব্যাঘ্রালয় হল সুন্দরবন। অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিনে বঙ্গোপসাগর লাগোয়া দক্ষিন ২৪ পরগনা জেলায়। এর সামান্য অংশ র‍য়েছে উত্তর ২৪ পরগনাতে। এদেশে সুন্দরবন যতটুকু তা অখন্ড সুন্দরবনের ৪০ শতাংশ মাত্র, বাকি অংশটি রয়েছে বাংলাদেশে।
ভারতের অংশের আয়তন ৪২৬২ বর্গ কিমি.। এর মধ্যে ২৫৮৫ বর্গ কিমি. নিয়ে গঠিত হয় সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ ১৯৭৩ সালে। এর মধ্যে আবার ১৩৩০/১২ বর্গ কিমি. কোর এরিয়া যা ১৯৮৪ সালে জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা পায়।
আরাধ্যা দেবী এখানে বনবিবি। জঙ্গলের রাজা দখিন রায় তথা দক্ষিন রায় আদতে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাংলাদেশে ওটাই-ই শোনা যায়। আরো বহু বনবিবির উপাখ্যানে। গ্রামীন যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হয় পর্যটকরা উদ্যোগ নিলে, হোস্ট-এর তরফ থেকে সন্ধ্যায়।
এই বনে গাছের  মধ্যে হেঁতালের প্রাধ্যান্য। লুকানোর জায়গা হিসেবে বাঘের অত্যন্ত প্রিয়। এছাড়া গরান, গর্জন, গেঁওয়া, পশুর, বাইন প্রভৃতি দেখা যায়। আর আছে সুন্দরী গাছ। কারো কারো মতে এই গাছের অরন্যের নাম সুন্দরবন। আবার অনেকের মতে অরন্যটা সুন্দর বলেই সুন্দরবন বলা হয়।
এছাড়া কেওড়া, কাঁকড়া, খালি, কৃপা, গোলপাতা, বকুল, ধুন্দুল, কালবান গাছও আছে। বাহারি পাতা, ফল ও ফুল, তাদের বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি এই অরন্যে।
পাখির রাজ্যে রয়েছে টিয়া, ময়না, ড্রাঙ্গো, কাঁস্তেচূড়া ও নানা কাক। বক, ছাতার, বুলবুল, বাবুই, বুটিদার ঘুঘু, বামুনে চিল, হাড়গিলা, সাত-আট জাতীয় মাছরাঙ্গা, বাটাম, জাংহিল, টিউবি, পানকৌড়ি, শামুকখোল ও গরার পাখি।
হিন্দু-মুসলিম-খৃষ্টান সব সম্প্রদায়ের আরাধ্য বনবিবি। পেশায় বেশিরভাগ জেলে-মৌলে-দুলে-কাঠুরে ইত্যাদি। জীবন নিয়ে জীবিকার ঝুঁকি। বিপদ থাকে ওৎ পেতে। এখানকার খুবই হিংস্র। সাঁতারু, বুদ্ধিমান, সুন্দর দর্শনধারী। জলে কুমীরও হিংস্র। ডাঙ্গায় বাঘ জলে কুমির- প্রবাদ এখানে অত্যন্ত বাস্তব। সম্প্রতি কুমিরের কোপে বাঘের প্রান হারানোর মতো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সোঁনাগাঁও অঞ্চলে একটা বিধবা পাড়া-র কথা জানা যায়। সেখানে ৪০ জন বিধবার বাস ছিল, যাদের স্বামী জীবিকার জন্য জঙ্গলে গিয়ে ফেরেনি।
এই বনের ভূ-খন্ড মূলতঃ ব-দ্বীপ। কোনোটিতে আছে মনুষ্যবসতি, কোনোটি বসতিহীন। হোগলা-মাতলা, ঠাকুরানি, গোওয়াসাবা, রায়মঙ্গল, ভাঙাদুয়ানি, দুর্গাদুয়ানি, পীরখালি, গাজিখাল, হরিনডাঙ্গা ইত্যাদি নদ-নদী ঘিরে রয়েছে। এখানকার প্রধান ৮টি-মাতলা, ইছামতী, কালিন্দী, রায়মঙল, ঠাকুরানি, সপ্তমুখানি, গোয়াসাবা ও বিদ্যাধরী।
মাছ/কাঁকড়া/মধু সংগ্রহকারীদের কমপক্ষে এক সপ্তাহ ঘর ছাড়া কাটাতে হ্য-ফেরার অনিশ্চিয়তা পদে পদে। এই অরন্যে ২৬ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ, ১৭০ প্রজাতির পাখি, ৫৮ প্রজাতির মাছের দেখা মেলে।
সুন্দরবনে পর্যটকদের জন্য দর্শনীয় স্থান হল- সাগরদ্বীপ, বকখালি, সুধন্যখালি, নেতিধোপানী, দো-বাঁকি, সুন্দরকাটি, বুড়ির ডাবরি, হলিডে আইল্যান্ড, ভগবৎপুর কুমীর প্রকল্প, সজনেখালি, পাখিরালয় ও ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঞ্চুয়ারি এবং লেথিয়ান আইল্যান্ড ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঞ্চুয়ারি। মোট দ্বীপ ১২০ টি। তারমধ্যে৫৪ টিতে মনুষ্য বসতি। বাঘেদের ঘাঁটি হলো পীরখালির জঙল।
বাঘের সংখ্যা ৩৪১ টি, ২০১০ এর সুমারি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে। এখানকার নদীতে যে জলজ প্রানী রয়েছে তাদের মধ্যে ৬ টি প্রানী স্তন্যপায়ী। ৩ প্রজাতির সরীসৃপ। সর্প রয়েছে ১০ প্রজাতির।
দো-বাঁকি ক্যাম্পে ক্যানোপী ওয়াক কংক্রিটের। তাছাড়া সুধন্যখালি, নেতিধোপানী, সজনেখালি প্রভৃতি স্থানে নজরমিনার আছে। সজনেখালিতে ইনটারপ্রিটেশন সেন্টার পর্যটকদের দেখা অবশ্য কর্তব্য। ক্যানোপী ওয়াক হলো অনেক উঁচু দিয়ে পর্যটকদের হাঁটার ব্যবস্থা, বেশ কিছু দূর পর্যন্ত।
এখানকার বাড়ির ছাদে সরকারি ভর্তুকিতে সৌর বিদ্যুতের প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সারা বছর পর্যটন এওলেও দুর্গাপুজোর পর থেকে মার্চ মনোরম। শীতে সবচেয়ে বেশীমাত্রায় পর্যটন আসেন। ২ বছর অন্তর  ব্যাঘ্র সুমারি হয়। ওই সময়ে সাধারনের প্রবেশাধিকার মেলে না। সেটা ডিসেম্বর-জানুয়ারির কোনো একটা সময়ে ২-৩ সপ্তাহব্যাপী। সম্প্রতি কুমীর সুমারি হল এই প্রথমবার। ২০১২ সালে।
যাওয়াঃ- প. ব. পর্যটন উ. নিগমের স্নদরবন ঘোরানোর নানা প্যাকেজ রেখেছে- নানা খরচের। ১ রাত ২ দিন, বা ২ রাত ৩ দিন। সজনেখালি ট্যুরিস্ট লজে রাত্রিবাস অথবা লঞ্চে রাত্রিবাস। ঘোরানোর স্থানেও অদলবদল কিছু। ট্যুরিস্ট বাসে বিবাদী বাগ কার্যালয় থেকে গদখালি নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে লঞ্চ যোগে। ঘন্টা চারেকের পথ, সবমিলে, যোগাযোগঃ ট্যুরিজম সেন্টার, ৩/২ বিবাদী বাগ কলকাতা- ৭০০০০১। ফোন (০৩৩) ৪৪০১২৬৫৯ বা ২২৪৩৭২৬০।
এরকম প্যাকেজ রয়েছে বেসরকারি ব্যবস্থায়। তার অন্যতম হলো- সুন্দরবন টাইগার সাফারিঃ ৯৮৭৪৪৫৯৬৪৭ / ৪৮ / ৪৯। আরো একটি হল- সুন্দরবন টাইগার ক্যাম্পঃ (০৩৩)২২২৯৮৬০৬। এছাড়া নিজেরা ট্রেনে ক্যানিং গিয়ে সেখান থেকে লঞ্চযোগে যেতে পারেন। ট্রেনে, ক্যানিং। সোনাখালি, গদখালি বাসে বা গাড়িতে। আর দ্বার আছে নানা দিকে সুন্দরবন প্রবেশের। দলবদ্ধভাবে গেলে লঞ্চ ভাড়া নিয়ে খাদ্য-পানীয়-ডেকরেটার ঠিক করে নিতে হয়। নামখানা, রায়দীঘি, হাসনাবাদের দিক থেকেও যাওয়া যায় ভেতরে। নিজের মতো প্রাইভেট লঞ্চ ভাড়া করতে চাইলে আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন, শম্ভুনাথ মান্নাঃ ৯৪৭৪১৫৮০০১, ৯৪৭৪০০৭৫৫০, ০৩২১৮-২৫৫৫৯৮ / ২৫৭৫৯১ নম্বরে।
বাঘেদের বাড়ি সুন্দরবন - ভ্রমণ গাইড বাঘেদের বাড়ি সুন্দরবন - ভ্রমণ গাইড Reviewed by Kona Dey Chakraborty on August 30, 2018 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.