শৈশবে পিতৃহারা গোপাল হয়ে উঠেছিল ভারতসেরা গবেষক - পড়ুন জীবনী

গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য (জন্ম : ১৮৯৫ খ্রি. , মৃত্যু : ১৯৮১ খ্রি.)

ছোটোবেলা কেটে গিয়েছিল বনেবাদাড়ে। সারাদিন ঘুরে বেড়াতেন সেখানে। দেখতেন কেঁচোদের কীর্তিকলাপ। ভালোবাসতেন কালো মাকড়সার সন্ধানে কোনো এক বৃষ্টি হব হব দুপুরে দূর নির্জন প্রান্তরে ছুটে বেড়াতে।
তিনি কে? চিনতে কি পারছ তাঁকে? তিনি হলেন প্রকৃতিবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ! বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশের ছাড়পত্র ছিলনা তাঁর। শেষ অবধি তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তীর এক মহানায়ক।
জন্ম হয়েছিল তাঁর বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার লনসিং গ্রামে। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের ১লা আগস্ট তারিখে। বাবার নাম অম্বিকাচরন, মায়ের নাম শশিমুখী দেবী।
গোপালচন্দ্রের বাবা অম্বিকাচরণ ব্রাহ্মণ হিসেবে চার বিঘে ব্রহ্মত্র নিষ্কর জমি পেয়েছিলেন। ছিলেন তিনি গ্রামের জমিদার বাড়ির কুলপুরোহিত। যজন, যাজন আর সংস্কৃত চর্চা নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত থাকতেন। এসব থেকে যে সামান্য আয় হত তাতে কোনোরকমে সংসার চলে যেত।
গোপালচন্দ্র তখন পাঁচ বছরের বালক, একদিনের জ্বরে অম্বিকাচরনের অকালমৃত্যু হল। বেচারি গোপালচন্দ্রকে সেই বয়সেই যজমানি করতে হত।
তারই পাশাপাশি তিনি স্কুলের পড়াশোনা চালিয়ে যান। প্রতি বছর ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতেন তিনি। দরিদ্র এবং মেধাবী ছাত্র বলে স্কুল কতৃপক্ষ বিনা বেতনে তাঁকে পড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
ছাত্র গোপালচন্দ্রকে খালবিল অতিক্রম করে স্কুলে যেতে হত। এইভাবে খুব কষ্ট করে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশ করেন। মার্কশিটে দেখা গেল সারা ফরিদপুর জেলায় তিনি পেয়েছেন সবথেকে বেশি নম্বর। লনসিং স্কুলে তিনিই ছিলেন প্রথম বিভাগের একমাত্র ছাত্র।
গ্রামবাসীরা গোপালচন্দ্রের সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন। সেখানে তাঁকে কাপ, মেডেল এবং কিছু অর্থ প্রদান করা হয়।
এবার গোপালচন্দ্র এলেন মহাবিদ্যালয়ের অঙ্গনে। ভর্তি হলেন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে। থাকতে হত তাঁকে কলেজ হোস্টেলে। তখন তিনি দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছেন, চারপাশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে লাগল। এরই মধ্যে যিনি গোপালচন্দ্রের পড়ার খরচ চালাতেন, তিনি টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলেন। তাঁর নিজের পক্ষে হোস্টেলের খরচ চালানো সম্ভব ছিলনা।  অন্যের সাহায্যে এতদিন কোনোরকমে কায়ক্লেশে খরচা চালিয়ে ছিলেন। এবার কলেজের পড়া সাঙ্গ হল। কলেজ ছাড়তে হল, পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্ক চিরদিনের মতো ছিন্ন হয়ে গেল সেদিনের কিশোর গোপালচন্দ্রের।
ময়মনসিংহ থেকে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে এলেন গোপালচন্দ্র। তখন তাঁর বয়স মাত্র উনিশ বছর। তখনকার প্রথা অনুযায়ী ওই বয়সেই গোপালচন্দ্রকে বসতে হল বিয়ের পিঁড়িতে। বিয়ে হল ফরিদপুরের শ্রীনাথ চক্রবর্তীর বড়ো মেয়ে শ্রীমতী লাবণ্যময়ী দেবীর সঙ্গে। তখন কনের বয়স ছিল মাত্র বারো বছর।
সাংসারিক অবস্থার কথা ভেবে তাকে স্কুলের শিক্ষকতার কাজে যোগ দিতে হয়েছিল। লোনসিং গ্রামের স্কুলে তিনি চারবছর ধরে ভূগোল পড়িয়েছিলেন। শুধুমাত্র ছাত্রদের পরিয়েই তিনি খুশি থকেতেন না। সময় পেলেই আবার শুরু করতেন তাঁর প্রকৃতিচর্চা। বনবাদার, ঝোপজঙ্গলের পরিত্যক্ত স্থানে ঘুরে বেড়াতেন। কীটপতঙ্গের ওপর ছিল তাঁর বিশেষ আকর্ষণ। তারা কি খায়, কোথায় যায়, কেমনভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করে, তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন। স্কুলের বাগানে ছাত্রদের নিয়ে পরীক্ষা করতেন। কৃত্রিম উপায়ে কিভাবে পরাগসংযোগ ঘটানো যেতে পারে তার চেষ্টা করতেন। কলম করে একই গাছে দু-তিন রকমের ফুল ফোটানো ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয় শখ।
সমাজসেবার কাজেও যোগ দিলেন সদ্য তরুণ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য। সে সময়ে বাংলার গ্রামগুলির অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। সমাজে ছিল নানা ধরনের কুসংস্কার। গ্রামে তথাকথিত নিচু শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি 'কমলকুঠি' নামে একটি সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে বিনা বেতনে পড়ানো হত। গ্রামের মেয়েদের হাতের কাজ শেখানো হত। প্রত্যেক শনিবার নমঃশূদ্রের বৈঠক বসত। গোপালচন্দ্র সেখানে নিয়মিতভাবে উপস্থিত হতেন। নানাধরনের আলোচনায় অংশ নিতেন। ওই বয়সেই তিনি এমন ধরনের জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিতেন যা শুনে প্রবীণ প্রাজ্ঞ মানুষরা পর্যন্ত অবাক হয়ে যেতেন।
তখন গ্রামের জমিদার বাড়িতে দুর্গা পুজো হত। গরিব লোকেরা সেখানে যোগ দিতে পারতেন না। এজন্য তাদের মনের ভেতরে ক্ষোভ জন্মেছিল। গোপালচন্দ্র নিচু সম্প্রদায়ের লোকদের বোঝালেন, দুর্গা পুজোয় তাদেরও সমানভাবে অংশ নেওয়ার অধিকার আছে। তারা ইচ্ছে করলে গ্রামের কালিতলাতে আলাদা করে পুজো করতে পারে।
এভাবে সেই বয়সেই তিনি অসাধারন সংগঠনী শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে এই বিষয়ে বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি। কেন-না তারপর তাকে বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে যোগদানের জন্যে কলকাতায় চলে আসতে হয়। জীবনটা অন্য প্রবাহে বইতে থাকে।
পরবর্তীকালে নানা জায়গা থেকে সম্মান এবং পদক পেয়েছিলেন গোপালচন্দ্র। বসুবিজ্ঞান মন্দির তাকে 'বিবিড' মেডেল দিয়েছিল। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ তাঁকে দিয়েছিলে 'সত্যেন্দ্রনাথ বসু পদক'।
ভারী সুন্দর প্রবন্ধ লিখতে পারতেন তিনি। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলিকে সহজবোধ্য করে তুলে ধরতেন। তাঁর লেখা 'বাংলার কীটপতঙ্গ' বইটি সাহিত্য বিজ্ঞানে রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ৮ই এপ্রিল তারিখে প্রকৃতিবিজ্ঞনী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য লোকান্তরিত হন।

শৈশবে পিতৃহারা গোপাল হয়ে উঠেছিল ভারতসেরা গবেষক - পড়ুন জীবনী শৈশবে পিতৃহারা গোপাল হয়ে উঠেছিল ভারতসেরা গবেষক - পড়ুন জীবনী Reviewed by Kona Dey Chakraborty on October 09, 2018 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.