সুন্দরবনের ইতিহাস ও সম্পূর্ণ ট্রাভেল গাইড

 সুন্দরবন ঃ 

দক্ষিণ ২৪ পরগনার দক্ষিণ আর উত্তর ২৪ পরগনার দক্ষিণ-পূর্ব অংশ জুড়ে সমুদ্রগামী অসংখ্য নদনদীর মাঝে ছােটো ছােটো দ্বীপ জুড়ে গড়ে ওঠা গভীর অরণ্য সুন্দরবন বলে পরিচিত। সম্ভবত সুন্দরী গাছের প্রাচুর্যের জন্যই নাম হয়েছে সুন্দরবন। সমুদ্রের জোয়ারভাটায় এখানকার জল ও মাটি লবণাক্ত। মূল ভূখণ্ড আর দ্বীপের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য খাল-খড়ি। চারদিকে গভীর জঙ্গল।

সুন্দরবন চিরদিন এইরকম জঙ্গল ছিল না। এখানে চাষবাস হতাে। জনপদের নানান নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। তখন এখানে ছিল মিষ্টি জলের পুকুর । কিন্তু কালক্ৰমে মিষ্টি জলের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। সমুদ্রের নােনা জলে মাটি লবনাক্ত হয়ে ওঠে। এই মাটিতে জন্ম হয় গরান, গেওয়া, ধুন্দল, সঁদুরী, ক্যাওড়া, গর্জন, গােলপাতা গাছ। একে বলা হয় বাদাবন বা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জনশূন্য হয়ে যায় সুন্দরবন অঞ্চল। কিন্তু ইংরেজ রাজত্বে জঙ্গল কেটে ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে ওঠে। তাছাড়া ইংরেজদের অত্যাচারেও মেদিনীপুরের নানা প্রান্ত থেকে এখানকার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসেন বহু মানুষ। ধীরে ধীরে শুরু হয় কৃষিকাজ, মৎস চাষ। প্রকৃতি আর মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে জন্ম নেয় নানান দেবদেবী—বনবিবি, দক্ষিণরায়, কালুরায়, পীরগাজি। 

সুন্দরবনের বিপদসঙ্কুল অরণ্যের মধ্যে রয়েছে নানান প্রজাতির বন্যপ্রাণী। সৌন্দর্যে আর হিংস্রতায় সকলকে ছাপিয়ে গিয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বিশ্বে এর কোনও তুলনা নেই। ২০০১ খ্রিঃ ব্যাঘ্ৰসুমারিতে এখানে বাঘের সংখ্যা ছিল ২৬৩। দেশের আর কোনও অরণ্যে এত বাঘ নেই, এছাড়া এখানে রয়েছে বনবিড়াল, শুয়াের, বাঁদর আর অসংখ্য হরিণ। নদীতে রয়েছে বিশাল আয়তনের সব কুমির। আর গােটা সুন্দরবন জুড়ে পাখির মেলা।  লঞ্চে বিভিন্ন ওয়াচ টাওয়ার যাতায়াতের পথে জলে বা জঙ্গলে বাঘের দর্শন পাওয়া নিতান্তই ভাগ্যের ব্যাপার । বাঘ ঘুরে বেড়ায় জলে জঙ্গলে।

তবে বাধ দেখা না গেলেও দেখা যায় হাজার পানকৌড়ি, মাছরাঙ্গা, বক, কোর্টেবক, শামুকখােল, মাছধরা ঈগল, সাধক, উক। সুন্দরবনের গহন অরণ্যে বাইরের মানুষ প্রবেশ করতে পারে না। সামান্য অসর্তকতা মানে নিশ্চিত মৃত্যু। স্থানীয় মানুষ যারা জঙ্গলে যায় মধু ভাঙতে, কাঠ আনতে, মাছ ধরতে, তাদের বৈচিত্র্যে ভরা জীবন এই সুন্দরবনের আকর্ষণ পর্কযটকদের কাছে কিছু কম নয়। তবে অন্য সব অরণ্য থেকে সুন্দরবন ভ্রমণ একেবারেই স্বতন্ত্র। এখানে জঙ্গলে ঘােরার কোনও সুযোগ নেই। নদীপথে লঞ্চ বা স্টীমারে বসে দর্শন করতে হয় দ্বীপময় সুন্দরবন। ২৫৮৫ বর্গ কিমি অঞ্চল জুড়ে গড়ে ওঠা অরণার মধ্যে রয়েছে ছােটো-বড়ো প্রায় ১০০টি ধাপ। এর মধ্যে প্রায় ৩০টিতে রয়েছে জনবসতি। ১৯৮৪ সালে ঘােষিত জাতীয় উদ্যান সুন্দরবন। 

বিভিন্ন ওয়াচ টাওয়ারের পাশেই রয়েছে বনবিবি, বনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তিনি বাঘের আক্ৰমণ থেকে মানুষকে রক্ষা করেন। যারা আসলে কাঠ কাটতে, মধু আনতে বা মাছ ধরতে যান সকলেই যাত্রার প্রাক্কালে বনবিবির পূজা করেন। জঙ্গলের মধ্যেও রয়েছে বনবিবির থান। 

সুন্দরবন ভ্রমণ বলতে ক্যানিং সােনাখালি/গদখালি বা গােসাবা থেকে সজনেখালি , নদীর তীরবর্তী অঞ্চল। জায়গার নামের সাথেই জড়িয়ে রয়েছে বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি। রয়েছে ৪০০ বছরের প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসপ। ওয়াচ টাওয়ারের কাছেই রয়েছে । 

মধ্যে প্রতি বছরই কিছু কিছু মানুষ বাঘের হাতে মারা পড়ে। বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ন্যাচারাল হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত। সুন্দরবনের গড় তাপমাত্রা ৩৩-২০° সে। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের গড় ১৯২১ মিমি। সুন্দরবন মাঝে মাঝেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে। এর ফলে কখনাে-সখনাে বেশ কিছু দ্বীপ জলের তলায় হারিয়ে যায় ফলে সমগ্র দ্বীপের মানচিত্রের পরিবর্তন ঘটে। গােমতী আর পিচখালি নদীর সঙ্গমে সুন্দরবনেরই এক অংশ সজনেখালি দ্বীপ। এখানে মানুষজনের বসতি নেই। লজের কাছেই রয়েছে কচ্ছপ পুকুর, কুমির পুকুর, কামট পুকুর। বিকালে খাবার-দেওয়ার সময় সৃষ্টি হয় আকর্ষণীয় দৃশ্য। খাবারের লােভে কুমির পুকুরের পাড়ে মাঝে মাঝেই ভিড় করে হরিণের দল। এছাড়াও সজনেখালি থেকে দেখে নেওয়া যায় প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্র, বনবিবির মন্দির আর মিউজিয়াম। 

এখান থেকে ভটভটিতে যাওয়া যায় পাখিরালয়। জুন থেকে অক্টোবর দ্বীপ জুড়ে পাখির জলসা বসে যায়। রং বেরঙের হাজার হাজার পাখি থাকে জলে, ডাঙায়, গাছে। আর আছে অসংখ্য প্রজাপতি, তারা যেন হাজার রঙের রামধনু। তবে সব কিছুই প্রত্যক্ষ করতে হয় জলযান থেকে।

সজনেখালি থেকে ৪৫ মিনিটের লঞ্চযাত্রায় পৌঁছানাে যায় সুধন্যখালি ওয়াচ টাওয়ার। এখান থেকে দেখা যায় অরণ্যের দৃশ্য। সংলগ্ন মিষ্টি জলে পুকুরে মাঝে মাঝেই দেখা যায় জন্তু জানােয়ারদের। তবে হরিণ, কুমির, বাঁদরের দেখা মিললেও সুন্দরবনে বাঘ দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

সুন্দরবনে অরণ্য ছাড়াও রয়েছে লৌকিক দেবতার আকর্ষণ। সজনেখালি ট্যুরিস্ট লজের নানান অঞ্চলে রয়েছে বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়ের মন্দির, পীরের দরগা।  মিষ্টি জলের পুকুর। বনকর্মীদের বক্তব্য দুপুর বা বিকালের দিকে বাঘ জল খেতে আসে এখানে। এখানে কোর এরিয়া বা বাঘের আবাস। নদীর দু'পাশে মাইলের পর মাইল হেতালের ঝোপ। জোয়ারের সময় জলে ঢাকা পড়ে যায় দ্বীপ। গাছপালা সব অর্ধেক জলের তলায়। সুন্দরবনের এই সব গহন অরণ্যের আলাদা একটা সৌন্দর্য আছে। বাঘের দেখা না মিললেও এই অরণ্যের গা ছমছমে পরিবেশ, প্রকৃতির ব্যাপ্ত নিস্তব্ধতা, বিচিত্র দর্শন গাছপালা, পাখির ডাক, এক অন্য মায়াময় জগৎ সৃষ্টি করে, যা এক পরম পাওয়া, অনন্য অভিজ্ঞতা।

বুড়িরডাবরি ওয়াচ টাওয়ারটি সজনেখালি থেকে বেশ কিছুটা দূরে বলেই পর্যটকের আনাগােনা বেশ কম। তবে রায়মঙ্গল ভিউ পয়েন্টটি বেশ জনপ্রিয়। রায়মঙ্গল নদীর ওপারে বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকাও দৃশ্যমান এখানে থেকে। 

দোবাকি ওয়াচ টাওয়ারের প্রধান আকর্ষণ ক্যানােপি ওয়াক। মাটি থেকে প্রায় ২০ ফুট উপরে আধ কিমির বেশি হাঁটা পথে উপর থেকেই দেখা যায় হরিণের দলের ছােটাছুটি, রয়েছে মিষ্টি জলের পুকুরও। বসিরহাট রেঞ্জের ঝঙ্গাখালি ওয়াচটাওয়ার-এ পর্যটক সমাগম বেশ কম। তবে বনকর্মীদের মতে বাঘ দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এখানে রয়েছে বনবিবির মন্দির ও মিষ্টি জলের পুকুর। ৫০মিটার উঁচু বনিক্যাম্প ওয়াচটাওয়ারটি সুন্দরবনের উচ্চতম, সম্ভবত সুন্দরতমও। সজনেখালি থেকে প্রায় ৬ ঘন্টার লঞ্চযাত্রায় পৌঁছানাে যায় বনিক্যাম্প। বিদ্যুৎ না থাকলেও রয়েছে থাকার ব্যবস্থা।

সুন্দরবন ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ভগবতপুর কুমির প্রকল্প। নােনা জলের কুমির প্রজননের উদ্দেশ্যে ১৯৭০ সালে চালু হয় এই প্রকল্প। নামখানা থেকে জলপথে প্রায় আড়াই ঘন্টার দূরত্বে লােথিয়ান দ্বীপের কাছে সপ্তমুখী নদীর মােহনায় এই কুমির প্রকল্প। 

নামখানা থেকে ফেরি লঞ্চে ২০ কিমি দূরে ললাথিয়ান দ্বীপের ভাগবতপুরে গড়ে উঠেছে কুমির প্রকল্প। এখানে কুমিরের ডিম ফুটে বাচ্চা হচ্ছে। ৩ বছর পর্যন্ত কুমিরদের এখানে রাখা হয়। এখানে দেখা যায় কোমর জলে নেমে চিংড়ির পােনা ধরছে ছেলে-মেয়েরা। বিশাল বাদাবন, বৈচিত্র্যময় খাড়ি, নদী, তার জোয়ার-ভাটা, হিংস্র শ্বাপদ প্রতিকূল প্রকৃতির মাঝে মানুষের নিরন্তন জীবন সংগ্রাম ও গ্রাম্য লােকসংস্কৃতি সুন্দরবনকে যথার্থ অর্থেই সুন্দর করেছে।

সুন্দরবন ভ্রমণের সবচেয়ে ভাল সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। এই সময় নদী অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকে । 


বিঃ দ্রঃ মাত্র ২ দিন ১ রাতে খুব মজা করে সুন্দরবন ঘুরে আসতে পারবেন । সুন্দরবন ভ্রমনের এই ভিডিওটি থেকে আরো বিস্তারিত তথ্য পেয়ে যাবেন ভিডিওটি দেখতে - এখানে ক্লিক করুন 








সুন্দরবনের ইতিহাস ও সম্পূর্ণ ট্রাভেল গাইড সুন্দরবনের ইতিহাস ও সম্পূর্ণ ট্রাভেল গাইড Reviewed by WisdomApps on আগস্ট ২৩, ২০২০ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.