রমেনের রাগ , লেখকঃ প্রদীপ নারায়ণ চক্রবর্ত্তী

     
 জ্ঞান হওয়া অব্দি রমেন মনে মনে রাগ পুষে রেখেছে বাবা মায়ের ওপর। কেন রাগবে না? আজকাল বাবা মায়েরা কতো ভেবে ভেবে, কতো খুঁজে পেতে ছেলে-মেয়ের নাম রাখেন। যেমন “তালদ্ধজ”, “ইরম্মদ”, ইত্যাদি ইত্যাদি। নাম শুনে লোকে চমকে তাকাবে। কত পারসোনালিটি বেড়ে যায় নামের গুনে। আর ওর নাম, রমে—ন। একটা অত্যন্ত সাধারন, মিন্‌ মিনে নাম। তার ওপোর সেই নামটাকেও ছোট কোরে ডাক-নাম রেখেছেন “রমা”। ছোটবেলায় স্কুল ছুটির পর মা নিতে আসতেন। গেটের বাইরে বাচ্ছাদের নিতে আসা অভিভাবকদের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে হাঁক দিতেন, “রমা, এইদিকে আমি, চলে আয়”। ব্যস্‌, সহপাঠীদের কানে এই নাম যেতেই রমেন একটা মজার খোরাক হয়ে গেল। স্কুলে গেলেই, “এই রমা, ফ্রক পরিস নি কেন” বা “রমা, ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাস” জাতিয় কতগুলি সম্ভাষণ ওর দিকে উড়ে আসত। প্রথম দিকে এই নিয়ে মারপিটও হয়েছে, কিন্তু পরে রমেন ব্যপারটাকে মানিয়ে নিয়েছিল। ওর নাম নিয়ে মজা করবার লোক অনেক, কজনার সঙ্গে লড়বে? এই নামের জন্যেই ও ছোট বয়স থেকেই একটা হীনমন্যতার শীকার হয়ে গিয়েছিল। ওর ধারনা হয়ে গিয়েছিল এই নাম নিয়ে জীবনে খুব বেশি কিছু করা যায় না।
       সহপাঠীদের মধ্যে অভিজিৎ, সিদ্ধার্থ, ফার্স্ট-সেকেন্ড হোত। রমেন খুব মন দিয়ে পড়াশোনা কোরেও ওদের মত অত নম্বর পেত না। তার জন্য ও দায়ী করত নিজের নামকে। রমেন যার নাম তার বুদ্ধি-সুদ্ধি কখনোই খোলতাই হতে পারে না।  
      


(২)

       টেনে-টুনে সেকেন্ড ডিভিসনে বারো ক্লাস পাশ কোরে কমার্স নিয়ে গ্রাজুয়েশন কোরতে পাতি একটা কলেজে ভর্তি হল রমেন। সিদ্ধার্থ জে ই তে দুর্দান্ত রেজাল্ট কোরে আই আই টি কানপুরে ভর্তি হল। অভিজিৎ মেডিকেল ক্লিয়ার কোরে ডাক্তারি পড়তে গেল। আর রমেনের ভাগ্যে পাশকোর্সে কমার্স। সব ওই নামের জন্যে। জন্মানোর সাথে সাথে রমেন নাম রেখে বাবা-মা ওর ভাগ্য শীল কোরে দিয়েছেন।  
       রমেনকে দেখতে বেশ ভালই, কিন্তু কো-এড কলেজে সহ-পাঠীনিদের ও সযত্নে এড়িয়ে চলত। ওর কলেজের বন্ধুরা যখন এক-একটি টেম্পোরারি প্রেমিকা যোগাড় কোরে নিয়েছে, তখন রমেন সেই একা। মেয়েরা কি নামে ডাকবে ওকে, “এই রমেন” বা “রমেন-দা”। ইস্‌, কি বিশ্রী। এবং এই স্বভাবের জন্যেই মেয়ে-মহলে ওর “লাজুক ছেলে” বোলে নাম রটে গিয়েছিল। ওর অভিজ্ঞ বন্ধুরা বোলত, “ওরে, মেয়েরা ছেলেদের মধ্যে ম্যাচো ভাব দেখতে চায়। তোর ওইরকম ম্যাদা মারা ভাব দেখলে ওরা তোর ধারে-কাছে ঘেঁসবে না”। কোনও জবাব দিত না রমেন। কিন্তু মনে মনে বলত, “যার নাম রমেন, ডাক-নাম রমা, সেতো ম্যাদা-মারা হবেই। গোড়ায় গলদ হোয়ে গেছে”।
                   বি কম পাশ কোরেই চাক্‌রির খোঁজে হন্যে হয়ে লেগে পড়ে রমেন। কারণ রমেনের নিজের সম্বন্ধে কোন ভুল ধারনা ছিল না। পাশ কোর্স বি কম পাশ ছেলের উচ্চশীক্ষার পথ এমনিতেই বন্ধ। তার ওপর উচ্চশীক্ষা আজকের দিনে ব্যয় সাপেক্ষ।  বাবা  বছর  খানেক  হল পোস্ট

(৩)

অফিসের চাকরি থেকে রিটায়ার কোরেছেন। হাজার দশেক টাকা পেনশন পান। রিটায়ারমেন্টের সময় থোক টাকা যা পেয়েছেন তার খানিকটা পৈতৃক বাড়িটা সারাতে লেগেছে। আর বাকিটা এম আই এস করা আছে। বাবার পেনশনের টাকায় তিনজনের আজকালকার বাজারে খাওয়া পরা চলাই রীতিমত কষ্টকর। তবু ভাগ্য ভাল যে রমেনের দাদুর আমলের তৈরি বাড়িটা আছে। রমেনদের বাড়িটা উল্টডাঙ্গার একটা গলির মধ্যে। একতলা বাড়ি। ভালই হয়েছে, রাস্তার ওপর বাড়ি হলে প্রোমোটারদের অত্যাচারে তিষ্ঠনো যেত না।   
       তাই বাস্তববাদী রমেন চাকরির চেষ্টা আরম্ভ করে এবং ওর কলেজের বন্ধুর কাকার সুপারিশে সল্টলেকের একটা কন্সট্রাকসন কোম্পানির অ্যাকাউন্টস বিভাগে চাকরি পায়। বি কম পড়বার ফাঁকে যুব কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কিছুদিন তালিমও নিয়েছে। ফলে মাসিক সাত হাজার টাকা মাইনেতে রফা হয়। রমেনের পক্ষে যথেষ্ট। ওর বন্ধু সৌমেনের কাছে ও কৃতজ্ঞ। ওই ওর কাকার কাছে তদ্‌বির কোরে রমেনের চাকরিটা পাইয়ে দিয়েছে। ওর কাকা কোম্পানির চিফ্‌ অ্যাকাউন্টেন্টের বন্ধু। নইলে রমেনের মত একটা অনভিজ্ঞ সদ্য গ্রাজুয়েটকে কে চাকরি দেয়!  
                   সেই চাকরিতেই আজ বছর পাঁচেক হল টিকে আছে রমেন। ভদ্র, ন্ম্র ব্যবহারের জন্যেই হোক বা রমেনের কাজ-কর্মে মনোযোগের জন্যেই হোক, চিফ অ্যাকাউন্টেন্ট সাহেব ওকে খুব পছন্দ করেন। ওনারই সুপারিশে এই পাঁচ বছরে রমেনের মাইনে দশ হাজারে এসে ঠেকেছে। সকাল দশটা থেকে অফিস। সাড়ে নটার মধ্যে বাস ধরে উল্টোডাঙ্গা থেকে করুনাময়ীর মোড়ে চলে আসে। ওখান থেকে রমেনের অফিস  পায়ে  হেঁটে


(৪)
মিনিট পনেরো। অটো পাওয়া যায়। কিন্তু রমেন পায়ে হেঁটেই যায়। যতটা পয়সা বাঁচানো যায়। অফিস যাবার পথে বাঁদিকে পড়ে মধুদার হোটেল। হোটেল মানে বিরাট কিছু না। রাস্তার ধারে একটা বড় ঘরকে পারটিশন দিয়ে খাওয়ার জায়গা, রান্নাঘর আর ক্যাশ কাউন্টার। সকালে চা, টোস্ট, ঘুগনি আর ডিম ভাজা। দুপুরে ভাত, ডাল, মাছের তরকারি। শুক্কুরবার মাংস হয়। বিকেলে চা, টোস্ট, আলুর-দম। রাত্তিরে রুটি, সবজি, আন্ডা-কারি। আশেপাশের অফিসগুলোর দৌলতে মধুদার রোজগার ভালই হয়। বিশেষত কল-সেন্টারের ছেলেগুলোর ঠেক হচ্ছে মধুদার হোটেল। রমেন বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে আসে। মা সকালবেলা বানিয়ে টিফিন ক্যারিয়ারে দিয়ে দেন। রমেন সকাল বা বিকেলের দিকে মধুদার দোকানে যায় চা-বিস্কুট বা কখনো-সখনো ডিম ভাজা খেতে। এই পাঁচ বছরে মধুদার সঙ্গে বেশ ভালই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।  
                   এই রকম গতানুগতিক ভাবেই চলছিল রমেনের জীবন। এর থেকে অন্যরকম কিছু হবে তা রমেন স্বপ্নেও ভাবেনি। যার নাম রমেন তার জীবনে নাটকীয় কিছু হতে পারে কখনও? কিন্তু জীবনে এমন অনেক কিছুই ঘটে, যা আগে থেকে ভাবা যায় না। রমেনের জীবনেও তাই ঘটল। ঘটনাটা একটু খুলেই বলা যাক।
       সময়টা তখন শীতকাল। অন্যান্য দিনের মতোই সন্ধ্যে ছটার সময় দিনের কাজ সেরে, চীফ অ্যাকাউন্টেন্ট পালিত সাহেবের অনুমতি নিয়ে অফিস থেকে বাড়ি ফিরবে বলে বেরোল রমেন। বাইরে তখন বেশ ঘোর ঘোর হয়ে এসেছে।ওর অফিস থেকে একটু দুরেই একটা মস্ত মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং আছে। ওখানে অনেকগুলো কোম্পানির অফিস। ওই  অফিস  আর


(৫)

মধুদার দোকানের মধ্যিখানে ফুটপাথ ঘেঁসে একটা বাইক দাঁড় করানো ছিল। রমেন দেখলো বাইকের কাছে ফুটপাথের ওপর একটা ছেলে, একটা মেয়ের গলার কাছে ছুরি ধরে আছে আর অন্য আরেকটা ছেলে মেয়েটার গাল টিপে ধরে অসভ্যতা করবার চেষ্টা কোরছে। ভয়ে মেয়েটা কোন আওয়াজ কোরতে পারছে না। দেখার সাথে সাথেই রমেন চিৎকার কোরে উঠল, “এই, কি হচ্ছে!”
       ছুরি হাতে ছেলেটা চট্‌ কোরে রমেনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। “মাক্‌ড়া, চুপ্‌-চাপ্‌ কেটে পড়, নইলে চার ফালা কোরে দেব”। তার সাথে আরো কতকগুলো অশ্রাব্য খিস্তি কোরল ছেলেটা।
       এতদিনের মধ্যবিত্ত জীবনের পুঞ্জিভূত সমস্ত অপমান, অবদমন, ওই ছেলেটার গালগাল শুনে যেন ক্রোধের রূপ নিয়ে ফেটে পড়ল রমেনের শরীরে। ভাল কোরে কিছু ভাবার আগেই, “তবে রে শালা!” বোলে রমেন দৌড়ে গিয়ে লাফ দিয়ে পড়ল ছুরি হাতে ছেলেটার ওপোর। সঙ্গে সঙ্গে একটা তীব্র যন্ত্রনা অনুভব কোরল নিজের বাঁ হাতের ওপর-বাহুর কাছে। ছেলেটা আচমকা রমেনের ধাক্কায় ছিটকে পড়ল রাস্তার ওপর। পড়ার ধাক্কায় ততক্ষনে ওর ছুরিটা হস্তচ্যুত হয়েছে। ছুরি খাওয়া হাতের যন্ত্রনা ভুলে রমেন বুকের ওপোর বসে এলোপাতাড়ি ঘুঁসি মারছিল ছেলেটার মুখে। অন্য ছেলেটা মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে বন্ধুকে সাহায্য কোরতে আসছিল। মেয়েটা ছাড়া পেয়ে “বাঁচাও, বাঁচাও” বোলে চিৎকার কোরতে আরম্ভ কোরল। ইতিমধ্যে মধুদা দোকানের মধ্যে থেকে ধস্তাধস্তির আওয়াজ আর মেয়েটার চিৎকার শুনে বাইরে উঁকি মেরেই ব্যাপার বুঝে নিয়েছিল।  ফলে


(৬)

যে পেল্লায় খুন্তিটা দিয়ে আলুর-দম নাড়ছিল, সেটাকেই মাথার ওপোর তুলে মার-মার কোরে তেড়ে এলো। তার পিছনে কয়লা ভাঁঙা হাতুড়িটা নিয়ে রে-রে কোরে ছুটে এল মধুদার অ্যাসিস্টান্ট পাঁচু। আর তার সাথে সাথে আই-টি সেক্টারের যে ছেলেগুলো মধুদার দোকানে খেতে এসেছিল, তারা “ডাকাত-ডাকাত” কোরে দৌড়ে এল। পরিস্থিতি ঘোরালো দেখে দ্বিতীয় ছেলেটা চট্‌ কোরে বাইকে উঠে মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটাকে চেঁচিয়ে বল্‌ল, “ভাগ ইয়ার, পাকড়ে যায়েঙ্গে”। মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটা সজোরে ঘুঁসি মারল রমেনের বুকে। রমেন ছিটকে পড়ল রাস্তার ওপর। সাথে সাথেই মাটি থেকে উঠে পড়ে ছেলেটা বাইকের পিলিয়নে উঠে পড়ল এক লাফে। নক্ষত্র বেগে বাইকটা শীতের সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল মহিষবাথানের দিকে। সমস্ত ঘটনাটা মিনিট দুই তিনের মধ্যে ঘটে গেল।
                   ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতের ক্ষতটা চেপে ধরে আস্তে আস্তে উঠে বসল রমেন। মেয়েটা দৌড়ে এসে পাশে বসে ওর হাতে হাত রাখল। “একি, আপনার তো চোট লেগেছে, রক্ত পড়ছে!” এই প্রথম স্বেচ্ছায় কোন মেয়ে ওর হাতে হাত রাখল। যন্ত্রনার মধ্যেও একটু সুখের শিহরন খেলে গেল রমেনের শরীরে। ততক্ষনে মধুদা দল-বল নিয়ে এসে পড়েছে। ক্ষতটা জামার ওপর দিয়েই এক পলক দেখে মধুদা বল্‌ল, “এতো ছুরি খেয়েছে! পাঁচু, একটা অটো থামা”। নির্দেশ পেয়েই পাঁচু দৌড়ে গেল রাস্তায়। গোপাল অটো নিয়ে আসছিল। পাঁচুর কাছে ব্যাপার শুনে প্যাসেঞ্জারদের নেবে যেতে বলল। এই অঞ্চলে মধুদাকে সবাই চেনে এবং মানে। মধুদা রমেনকে ধরে ধরে অটোয় তুল্‌ল। মেয়েটাও পাশে এসে বসল।
      

(৭)

       “হোটেলটা সামলা পাঁচু, আমি শ্যামল ডাক্তারের চেম্বারে যাচ্ছি”।  
       “ঠিক আছে মধুদা, আমি সামলে নেব”।
       গোপাল অটো স্টার্ট দিল। শ্যামল ডাক্তারের চেম্বার করুনাময়ীর কাছেই। পথে যেতে যেতে মেয়েটার কাছে সংক্ষেপে ঘটনাটা জেনে নিল মধুদা। মেয়েটার নাম শ্রাবনী। বাড়ি শিলিগুড়ি। বাবা, মা আর ছোট একটা ভাইকে নিয়ে সংসার। বাবা রিটায়ার্ড। পেনশন পান। মা স্কুলের শিক্ষিকা। ছোট ভাই স্কুলে পড়ে। গ্রাজুয়েশনের পরে আজকালকার মেয়েদের মতই নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছে শ্রাবনী। মধুদার হোটেলের আগেই যে অফিস বিল্ডিঙ্গটা রয়েছে, ওখানেই একটা অফিসে রিসেপশনিস্টের কাজ করে। থাকে করুনাময়ীর মোড়ের ট্যাঙ্কটার কাছেই একটা মেয়েদের পিজিতে। বাবা প্রথমে এত দূরে মেয়েকে চাকরি কোরতে দিতে চান্‌নি। কিন্তু মেয়ের জেদের কাছে শেষ অব্দি হার মানতে হয়েছে।   
       গত কয়েকদিন ধরেই ওই ছেলেদুটো বিরক্ত কোরছে। একটা বাঙালি আর অন্যটা অবাঙালি। শ্রাবনী সন্ধ্যে বেলায় অফিস থেকে বেরোলেই বাইকে কোরে পাশে পাশে যেতে যেতে আপত্তিকর মন্তব্য করে। প্রথমে ও অতটা পাত্তা দেয় নি। কিন্তু আজ অবস্থাটা চরমে গিয়েছিল। রাস্তাটা নির্জন দেখে বাইক থেকে নেমে ওর পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল। অবাঙালি ছেলেটা ওর হাত চেপে ধরেছিল। রেগে গিয়ে শ্রাবনী ওর গালে একটা চড় মারে। সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি ছেলেটা ওর পকেট থেকে ছুরি বার কোরে শ্রাবনীর গলার কাছে ধরে। তার পরের ঘটনা তো জানাই আছে।


()

       ডাক্তারবাবু চেম্বারেই ছিলেন। মধুর মুখে সব শুনে আর রমেনের জামাটা খুলে ক্ষতস্থান পরীক্ষা কোরে ডাক্তারবাবু বললেন, “জোর বেঁচে গেছে। আচমকা লাফিয়ে পড়ায় ঠিক মতো ছুরি চালাতে পারে নি। মাস্‌লের কাছে একটু কেটে গেছে। সুপারফিসিয়াল ইঞ্জুরি। আমি প্রেশার ব্যান্ডেজ কোরে দিচ্ছি। তার সঙ্গে ইঞ্জেকশান দিয়ে দিচ্ছি। কতকগুলো ওষুধ লিখে দিচ্ছি। চারদিন খেতে হবে। ভয়ের কিছু নেই। কালকে এসে একবার দেখিয়ে যাবে। তবে মধু, একবার পুলিশকে জানান দরকার ছিল না?”
       “ছাড়ুন তো পুলিশ”। খেঁকিয়ে উঠল মধু। “ওদের আমার জানা আছে। থানার বড়বাবু থেকে আরম্ভ কোরে সবকটাকে আমি চিনি। কিচ্ছু কোরবে না। শুধু শুধু এই ছেলেটা আর মেয়েটাকে হয়রানি করাবে। যা করবার তা আমিই কোরব। আমার এরিয়াতে এসে এত বড় বাঁদরামি?”
       এখানে মধুর একটু পূর্ব পরিচয় দিয়ে রাখা ভাল। এক কালে মধু এই অঞ্চলের নামজাদা মস্তান ছিল। থানা, পুলিশ, শ্রীঘর, সবই ওর ভাল রকম জানা আছে। মধু, ওর মধ্যযৌবনে, ওরই এক প্রতিদ্বন্দ্বী মস্তান খুন হোয়ে যাবার পর, তার প্রেমিকাকে উঠিয়ে নিয়ে আসে। তারপর তাকে বিয়ে করে। সেই মেয়ের প্রভাবই মধুর আজ এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী। ধীরে ধীরে মধু অসামাজিক কাজ থেকে সরে আসতে আরম্ভ করে। তারপর এই হোটেল খুলে বসে। কিন্তু বাঘ কখনও নিরামিষাশী হতে পারে না। তাই আজও পাড়ার ক্লাবে, থানায়, আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতাদের সাথে মধুর বেশ দহরম মহরম আছে। ওকে এই অঞ্চলের লোক রীতিমতো সমীহ কোরে চলে। পরোপকারী বলেও ওর বেশ নাম আছে।


(৯)

       চেম্বার থেকে বেরিয়ে মধু গোপালকে বলল, “গোপাল, তুই আমাকে করুনাময়ীর মোড়ে নামিয়ে দিয়ে শ্রাবনিকে ওর পিজির কাছে ছেড়ে দে। তারপর তুই রমেনভাইকে উল্টোডাঙ্গায় ওর বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিয়ে আয়”।
       “আরে না, না। আমি বাসে কোরে চলে যেতে পারব”। প্রতিবাদ কোরে উঠল রমেন।
       “যা, বলছি তাই কর, পাকামি কোরো না”।
       মধুদার ধমক খেয়ে আর কিছু বলতে সাহস করল না রমেন। মোড়ের মাথায় নামল মধুদা।
       “যেমন তোমরা অফিস যাচ্ছ, তেমনি যাবে, বুজেছ। বোনটি, কোনো ভয় নেই। আর রমেনভাই, একদম চিন্তা কোরো না। আমি যখন এই ব্যাপারে মাথা গলিয়েছি, তখন তোমাদের দিকে চোখ তুলে তাকাবার হিম্মত কোনো মাইকা লালের হবে না”। তারপর রমেনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “সাবাস রে ভাই, মরদ কা বাচ্চার মতো কাজ করেছিস”।
       লজ্জা পেয়ে গেল রমেন। একবার আড়চোখে পাশে বসা শ্রাবনীর দিকে তাকাল। শ্রাবনীও তাকিয়েছিল ওর দিকে। রমেন তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল। আশ্বাস দিয়ে বিদায় নিল মধুদা। একটু এগিয়েই শ্রাবনীর পিজির সামনে অটো দাঁড়াল।
       “আসি গোপালদা। রমেনদা, আমার জন্যে আপনি যা কোরলেন। আপনার ফোন নাম্বারটা একটু দেবেন?”
      


(১০)

       চমকে শ্রাবনীর দিকে তাকাল রমেন। হ্যাঁ, ওকেই বোলছে। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। কোনো মেয়ে যে ওর ফোন নাম্বার চাইতে পারে, এটা ও স্বপ্নেও ভাবে নি। তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে নিজের মোবাইল নম্বরটা বলল। নম্বরটা মোবাইলে শেভ কোরে রমেনের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত কোরল শ্রাবনী। রমেনের দিকে একটু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে ফিক্‌ কোরে হেসে ফেলল। তারপর, “চলি রমেনদা” বোলে পিজির দিকে চলে গেল। ওর এই শেষের ভঙ্গীটার কোন মানেই খুঁজে পেল না রমেন। গোপাল অটো ছেড়ে দিল।
                   সারাটা রাস্তা মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতেই কেটে গেল রমেনের। বেশ দেখতে মেয়েটাকে। মাজা মাজা রঙ আর চোখে মুখে একটা চটক আছে। পুরুষের চোখ আর মন, দুইই টানে। একটা হলুদ রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছিল। বেশ মানিয়েছিল। আর ভীষন স্মার্ট মেয়েটা। আজ যা কান্ড ঘটেছিল, তারপর যে কোনো বঙ্গ ললনা কেঁদে কেটে মুর্চ্ছা যেতেন। কিন্তু প্রাথমিক ভয় কাটিয়ে উঠে মেয়েটা বেশ সহজ হয়ে গিয়েছিল। মধুদা, গোপালদার সঙ্গে তো বটেই, ওর সঙ্গেও সাবলিল ভঙ্গীতে কথা বলছিল। রমেনই বরঙ সহজ হতে পারে নি। ওর ব্যবহারেই সেটা বোঝা যাচ্ছিল।
       বাড়ির গলির মুখে নেমে গোপালদাকে ভাড়া দিতে গেল রমেন। গোপালদা কিছুতেই নিল না। বলল, “তুমি আমাদের পাড়ার ইজ্জত বাঁচিয়েছ ভাই। তোমার কাছ থেকে আজ ভাড়া নিতে পারব না”।
      


(১১)

       বাড়ি ফিরে এক কাঁড়ি মিথ্যে কথা বলতে হল রমেনকে। ওর ধূলোমাখা, ব্যান্ডেজ করা চেহারা দেখে বাবা, মা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন। রমেন বলল রাস্তায় অটোর ধাক্কা খেয়ে ভাঙা কাঁচের ওপর পড়ে গিয়েই এই বিপত্তি। ডাক্তার বলেছেন ভয়ের কিছু নেই। আসল ঘটনা বাবা মা জানলে বাড়িতে কুরুক্ষেত্র আরম্ভ হয়ে যেত। রমেন কেন দুঃসাহস দেখাতে গেছে সেই কৈফিয়ৎ দিতে দিতে পাগল হয়ে যেত। জামা কাপড় ছেড়ে, মুখ হাত ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে, মায়ের দেওয়া এক বাটি চিঁড়েভাজা আর চা খেয়ে রমেন মোবাইলটা নিয়ে চাদর গায়ে জড়িয়ে একতলার ছাদে উঠল। এটা ওর অনেক দিনের অভ্যেস। দিনের শেষে অফিস থেকে ফিরে খানিক্ষন ছাদে এসে বসা। আরাম কোরে নিজের পছন্দের জায়গাটায় বসল রমেন। এখান থেকে গলির মোড়ের লোকজন, যানবাহন চলাচলের খানিকটা আভাস পাওয়া যায়। মাথা থেকে চাদরটা মুড়ি দিয়ে নিল রমেন। বেশ হীম পড়ছে। আজ ওর মনটা ভীষন খুশি। এতদিনে একটা কাজের মত কাজ কোরতে পেরেছে। যদিও ও নিজেই এখনো বুঝতে পারছে না, কি কোরে ওই ছুরি হাতে ছেলেটার ওপর সাহস কোরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শ্রাবনীর হাতের স্পর্শটা এখনও যেন অনুভব কোরতে পারছে নিজের হাতের ওপর। আর ওর মুখে ওই রমেনদা ডাকটা? ওই ডাকের পর থেকেই নিজের নামটাকে আর বিচ্ছিরি মনে হচ্ছে না।আজ নিজেকে বেশ হিরো বলে মনে হচ্ছে। শুধু একটাই কাঁটা মনের মধ্যে খচ্‌খচ্‌ কোরছে। বিদায়ের আগে ওর দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে ওরকম ফিক কোরে হাসল কেন শ্রাবনী? চিন্তা কোরতে কোরতে অন্যমনস্ক ভাবে নিজের মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে  ছিল
   

(১২)

রমেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত কথাটা মাথায় এল। ইস্‌, ছি, ছি, ছি। এটা ও কি কোরে ফেলেছে? কথাটা কেন তখনই মাথায় আসে নি? মেয়ে হয়ে শ্রাবনী যেচে ওর ফোন নাম্বারটা চাইল, আর ও কিনা ফোন নাম্বারটা দিয়ে চুপ্‌চাপ্‌ বসে রইল? ভদ্রতার খাতিরেও ওর উচিৎ ছিল শ্রাবনীর ফোন নাম্বারটা চাওয়া। এর পরেও ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে হাসবে না মেয়েটা? কি ভাবল ওকে, প্রথম শ্রেনীর ক্যাবলাকান্ত? যতটা হিরো হয়েছিল শ্রাবনীর চোখে ততটাই জিরো হয়ে গেল। হাত দিয়ে নিজের মাথার চুল খামচে ধরল রমেন। নিজের নামের ওপর রাগটা আবার দ্বিগুন হয়ে ফিরে এল। আর কি ওর সঙ্গে দেখা কোরবে শ্রাবনী? কেন কোরবে? ওর মত একটা আনস্মার্ট ছেলের সঙ্গে শ্রাবনীর মত স্মার্ট মেয়েরা সম্পর্ক রাখে না।
       মোবাইলটা হঠাৎ সরব হয়ে উঠল রমেনের হাতে। অপরিচিত নম্বর। হয় মোবাইল কোম্পানি, নয় অন্য কোন কোম্পানির অ্যাড্‌। অনিচ্ছা সত্বেও ফোন ধরে বিরক্ত গলায় বলল, “হ্যালো”।
       ওপাশ থেকে মিস্টি মেয়েলি গলায় আওয়াজ এলো, “হ্যালো রমেনদা, আমি শ্রাবনী। কেমন আছেন?”
       চমকে গিয়ে হাত থেকে মোবাইল পড়ে যাচ্ছিল আর একটু হলে।
       “হ্যালো শ্রাবনী, আমি ভাল আছি”।
       “হাতের ব্যাথা কি বেড়েছে?”
       “আরে না না। ডাক্তারবাবুর ওষুধ খেয়ে বেশ ভালই আছি। চিন্তার কিচ্ছু নেই”।
       “যাক্‌, নিশ্চিন্ত হলাম। কি কোরছিলেন?”
       “এইইই, ছাতে বসে আছি”।

(১৩)

       “ছাতে, এই ঠান্ডার রাতে? অসুখে পড়বেন তো?”
       “না না, কিছু হবে না। অনেক দিনের অভ্যেস”।
       “হোক অভ্যেস, আজ আপনার শরীরের ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। আর ঠান্ডা খেতে হবে না, ঘরে শুয়ে রেস্ট করুন, বুঝলেন?”
       এই তো কঘন্টার আলাপ। এর মধ্যেই মেয়েটা কিরকম শাসন কোরছে। রমেনের বড় ভাল লাগছে ওর গলায় ওই হুকুমের সুরটা শুনতে। নিজেকে প্রস্তুত কোরে নিল রমেন। কথাটা বলতেই হবে।
       “ঠিক আছে, ঘরে যাচ্ছি রেস্ট কোরতে, কিন্তু তার আগে একটা কথা জিজ্ঞেস করব, সত্যি জবাব দেবেন?”
       “কি কথা?”, বিস্ময়ের সুর ভেসে এল ওপ্রান্ত থেকে”।
       “আপনি আমাকে খুব অসভ্য মনে কোরেছেন, না? আপনি আমার ফোন নম্বর নিলেন, অথচ আমি একবারও আপনার নম্বরটা চাইলাম না। খুব বাজে ব্যবহার কোরেছি আপনার সঙ্গে। সেই জন্যেই আপনি যাবার আগে আমার দিকে ওই ভাবে তাকিয়ে হেসে চলে গেলেন, না? কিন্তু, বিশ্বাস করুন”---
       “এই যে মশাই,” কথার মধ্যিখানেই ওকে বাধা দিল শ্রাবনী। “আপনারা, পুরুষরা মেয়েদের মনের সব কথা জানেন, এই রকম অহঙ্কার রাখেন কেন বলুন তো? কতটুকু জানেন আমরা কি পছন্দ করি বা না করি? শুধু নিজেদের মনগড়া আইডিয়া নিয়ে বসে থাকেন। শুনুন, আমরা যেমন যে ছেলে একটা অপরিচিত মেয়ের  সম্মান  বাঁচাতে  ছুরির  মুখে


(১৪)

ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাকে পছন্দ করি, তেমনিই পছন্দ করি সেই ছেলেকে যে মেয়েদের সাহায্য করার বিনিময়ে কোন অ্যাড্‌ভান্টেজ নিতে চায় না। আপনি সভ্য, ভদ্র, নম্র ছেলে আর মেয়েদের সামনে একটু লাজুক। ওটা আমরা বুঝি। অন্য কারো কথা জানিনা, আমি অন্তত সেটাই পছন্দ কোরি। ওপোর-চালাক ছেলেদের আমি একদম দেখতে পারিনা। আপনার মত লাজুক ছেলে আজকাল তো আর বিশেষ দেখা যায় না। তাই আপনার লাজুক ভাব দেখে আমি হেসে ফেলেছিলাম। সেইজন্যে আপনি ব্যথা পেয়েছেন, রাগ কোরেছেন আমার ওপর? প্লিজ রাগ কোরবেন না, আমি ক্ষমা চাইছি”।
       “আরে ছি ছি, কি বোলছেন? আমি একদম রাগ করি নি”। উৎকন্ঠিত গলায় উত্তর দেয় রমেন।
       “ঠিক তো, রাগ করেন নি তো? বেশ, তাহলে লক্ষী ছেলের মত এবার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আর হ্যাঁ, কাল সাড়ে-নটার সময় করুনাময়ীর মোড়ে আসছেন তো? একসঙ্গে দুজনে অফিস যাব”।
       “আপনি আমার সঙ্গে যাবেন?”
       “হ্যাঁ, আজকের ঘটনার পরে আমার খুব ভয় ধরে গ্যাছে। ভেবেছি, যখন দুজনেরই অফিস একই সময়ে তখন যাওয়া আসাটা একসঙ্গেই করব। আপনার আপত্তি নেই তো?”
       “আপত্তি? কি বোলছেন? আমি একদম রাজি”।
       ওপার থেকে হাসির আওয়াজ ভেসে এল। “বেশ, তাহলে ওই কথাই রইল। শুভরাত্রি রমেনদা। আর হ্যাঁ, এবার আমার ফোন নম্বরটা সেভ কোরতে ভুলবেন না যেন। তাহলে কিন্তু আমি খুব রাগ কোরব”। আবার একঝলক হাসি ভেসে এল। ফোনটা ডিস্কানেক্ট হল।

(১৫)

       রমেন খানিকক্ষন ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুখ তুলে তাকাল শীতের ঝকঝকে তারাভরা আকাশটার দিকে। আনন্দে ওর চোখে জল এসে গেছে। এতদিনের অপমান, অবদমন, যেটা চাপা রাগ হয়ে আগুনের মত ওর ভেতরে জ্বলতো, তার ওপর শ্রাবন ধারার শীতলতা নিয়ে ঝরে পড়ছে শ্রাবনী। 

প্রদীপ নারায়ণ চক্রবর্ত্তী।
কাজিডাঙ্গা, পোঃ – দেবানন্দপুর, জিলা – হুগলি, পিন্‌ - ৭১২১২৩
ই-মেল – pradeepchkrbrty@yahoo.co.in
রমেনের রাগ , লেখকঃ প্রদীপ নারায়ণ চক্রবর্ত্তী রমেনের রাগ , লেখকঃ প্রদীপ নারায়ণ চক্রবর্ত্তী Reviewed by WisdomApps on April 04, 2019 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.