ওড়িশার কাশ্মীর দারিংবাড়ি, বাঙালীর আবিস্কার

ওড়িশার কাশ্মীর দারিংবাড়ি, বাঙালীর আবিস্কার  


দারিংবাড়ি, নামটা অচেনা লাগছে। লাগবেই তো, এটি একটি হিল স্টেশন বা শৈল শিখর হওয়া সত্ত্বেও এর প্রচার নেই। প্রচার নেই বলেই আমাদের অনেকটা অচেনা। আমাদের পাশের রাজ্য ওড়িশার মধ্যেই এমন একটা শৈলশহর আছে ভাবাই যায় না। মনে পড়ে ২ বছর আগে যখন  খুব ঠাণ্ডা পড়ছিল, সেই সময় হঠাৎ খবরের কাগজে সবাই পড়েছিল ওড়িশাতে বরফ। এই বরফই পড়েছিল দারিংবাড়িতে। একে অনেকে আদর করে ডাকে কাশ্মির অফ দি ইষ্ট। আমরা পুরী যাই, ভুবনেশ্বর যাই, গোপালপুর যাই, তপ্তপানি এমনকি সংলাজোড়ি যাই কিন্তু বেরহামপুর এবং ভুবনেস্বরের থেকে যাওয়া যায়।  তবে সুবিধে বেরহামপুর বা ব্রহ্মপুর থেকে। সোজা পশ্চিম দিকে ঋষিকুইল্যা মোড় হয়ে রাস্তা এগিয়ে গেছে দারিংবাড়ির দিকে। পথে একটি ছোটখাটো নদী ঋষিকুল্লা পেরোতে হয়। অপরদিকে ভুবনেশ্বর থেকে যেতে হলে দূরত্ব অনেকটাই বেশী পড়বে। সড়ক পথ ছাড়া বিকল্প পথ নেই। অর্থাৎ রেলপথ নেই এ পথে। ভুবনেশ্বর থেকে যেতে হলে চেন্নাইগামী জাতীয় সড়ক ধরে ব্রহ্মপুর হয়ে যেতে পারেন অথবা খুরদা থেকে ঋষিকুল্যা হয়ে যেতে পারেন অথবা খুরদা হয়ে নয়াগড়, সেখানে থেকে ঋষিকুল্যা হয়ে দারিংবাড়ি যেতে পারবেন। দারিংবাড়ি বলতে গেলে যাই না। তবে না গিয়ে থাকলে এবার চলুন। মুগ্ধ হবেনই। পূর্বঘাট পর্বতমালার কোলে নিকুম, নিস্তব্ধে আপনার অপেক্ষায় রয়েছে দারিংবাড়ি। দারিংবাড়ি যাবার পথে পড়বে আদিবাসীদের সুন্দর বাড়িঘর, পড়বে চাষের ক্ষেত। যেতে যেতে সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজেকে হারিয়ে দিতে পারবেন এখানে, চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিন মুক্ত বাতাসের। না কোন পলিউশন নেই, নেই কোন উগ্র গন্ধ। আছে শুধু মুগ্ধ করা নির্মল বাতাস, যে বাতাস আমরা কলকাতা শহরে বসে পাই না। যেতে যেতে পড়বে অরন্য, ছোট খাটো ঢিলা। এখানে পৌঁছলে আপনি মনে করবেনই যে এক টুকরো স্বর্গে এসে গেছেন। এমনই মুগ্ধকর প্রাকৃতির দৃশ্য রয়েছে দারিংবাড়ির চারিদিকে। এখানকার জঙ্গলে রায়েছে বড় বড় উইঢিপি। ঠিক এমনই উইঢিপি দেখতে পেয়েছিলাম শান্তিনিকেতনের বল্লভপুর ছোট চিড়িয়াখানায়। সেখানকার শাল গাছের ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে এমনই ঢিপি। এখানে অবশ্য তার চেয়ে বড় বড় উইঢিপি ওড়িশার গঞ্জাম জেলার মধ্যে দারিংবাড়িতে। এখানে দক্ষিন ভারতের সংস্কৃতির ছোঁয়াও লেগেছে। বলতে গেলে ওড়িশার দক্ষিণে এবং পশ্চিম অংশে আন্ধ্র প্রদেশ আর ছত্তিসগড়ের সংস্কৃতির ছোঁয়া ব্যাপকভাবেই রয়েছে। এখানে খাবারেও সেই থাবা পড়েছে। অধিবাসিরা মিষ্টি, ভাত খাবার পাশাপাশি খাচ্ছে দক্ষিণী ধোসা, ইডলি, সম্বর। আবার তাদের মধ্যে ভাষার পার্থক্য অনেকটা কমে গেছে। ক্রমে সমতল হারিয়ে যাবে, দেখা যাবে পকদন্ডি পথ। কখনও চড়াই কখনও উতরাই করতে করতে রাস্তা এগিয়ে গেছে দবিংবাড়ির দিকে। যাবার পথেই বন থেকে ঘন বনের মধ্যে প্রবেশ করবেন। চারিদিকে রোমাঞ্চের হাতছানি আপনাকে ডাকবে। দবিংবাড়ি সমতল থেকে উঁচুতে অবস্থিত। ১০০০ মিটার উঁচুতে আবস্থিত। তাই বেশ ঠাণ্ডা থাকে। দারিংবাড়িতে রয়েছে একটি জনপদ, রয়েছে স্থানীয় হাট। সেখানে দাহাতি মানুষের ভিড়। তবে পর্যটকদের ভিড় খুবই কম, হাতে গোনা যায়। কারণ এর পরিচিতি খুব কম, এখনও এখানে অনাবিল আনন্দ রয়েছে। এই দারিং বাড়ির নাম আবার বাঙালীদের দেওয়া। এই দারিংবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডাঃ চক্রবর্তীর নাম। তিনি এখানে এসে প্রকৃতির টানে আর ফিরে যেতে পারেননি শহরে। সঙ্গে দেহাতি মানুষের অফুরন্ত ভালবাসাই তাকে আটকে দিয়েছিল এখানে। এখানকার অনেক কিছুই নিজের হাতে করেছেন তিনি। স্কুল কলেজ থেকে হাসপাতাল তিনিই তৈরি করেছিলেন। পাহাড়ের মাথায় রয়েছে হিলউড। রয়েছে হিলটপ ২ কিমি দূরে। নজর মিনার রয়েছে। গোটা উপত্যকার ছবি দেখা যায়। সূর্যাস্ত দেখা যায় এখান থেকে। পাহাড়, অরন্য, মিলেমিশে রয়েছে দারিংবাড়িতে। পাহাড়ের আনন্দ আনতে এখানে লাগানো হয়েছে পাইন গাছ। তা এখন দূর থেকে দেখা যায়। এখানে আবার রয়েছে কফির বাগান। তবে যেতে হবে কিলোমিটার ছয় এক রাস্তা। আবার প্রচুর গোলমরিচ গাছ ও রয়েছে এখানে। কফি বাগেনে রয়েছে একটি ঝোরা। এখানকার ছানা বরা মিষ্টি বেশ ভালো। এখান থেকে যেতে পারেন মান্দাশোর, সিমনিবাড়ি,বরাবাংকা হয়ে দু কিমি পথ। মান্দাশোরে রয়েছে পাহাড়ের ফাঁকে খাদ। দূরে রয়েছে একটা পাথর, নিজেকে জানান দিচ্ছে যে আমি আছি। পাথরের কিনারায় না গিয়ে নজরমিনারে চলুন। তবে রাস্তা বেশ খারাপ। যেতে কষ্ট হয়। দারিংবাড়ি অনুচ্চ সবুজে ঘেরা চারিদিক। চারিদিকে রয়েছে ছোট ছোট টিলা, সেগুলিও সবুজে মোড়া। প্রচুর পাখি রয়েছে। পাখির কলরবে ঘুম ভাংবে সকালে। বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে দারিংবারিতে, তবে প্রকৃতিকে যারা ভালোবাসে তাদের কাছে ভীষণ প্রিয়। এখানেও খ্রীষ্টান ধর্মমত ছড়িয়ে পড়েছে, রয়েছে গীর্জাও। ওড়িশা রাজ্যের রাজ্যপালের গ্রীষ্মবাস এখানেই অবস্থিত। 
x
ওড়িশার কাশ্মীর দারিংবাড়ি, বাঙালীর আবিস্কার ওড়িশার কাশ্মীর দারিংবাড়ি, বাঙালীর আবিস্কার  Reviewed by Kona Dey Chakraborty on August 25, 2018 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.